বিএসসির সেই দুই জাহাজ

শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে যাচ্ছে জ্যোতি-সৌরভ

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৪, ১২:৫৮ এএম

অবশেষে ৩৭ বছরের পুরনো ‘বাংলার জ্যোতি’ ও ‘বাংলার সৌরভ’ যাচ্ছে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে। সেখানে জাহাজ দুটিকে কেটে স্ক্র্যাপ লোহা হিসেবে বিক্রি করা হবে। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে দেশীয় ও দেশের বাইরের কোম্পানিগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ দরদাতা পাবে জাহাজ দুটি কাটার দায়িত্ব। এখন অপেক্ষা শুধু দরপত্র আহ্বানের।

১৯৮৮ সালে তৈরি হওয়া বাংলার জ্যোতি এবং বাংলার সৌরভ জাহাজের প্রতিটির ওজন ৩ হাজার ৭৮৭ টন। বর্তমানে পুরাতন জাহাজ কেনার ক্ষেত্রে ইয়ার্ডপর্যায়ে প্রতি টন স্ক্র্যাপ লোহার দর প্রায় ৫১ হাজার টাকা। সে হিসেবে দুটি জাহাজ থেকে প্রায় ৪০ কোটি টাকা পেতে পারে জাহাজের মালিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন।

 এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্ক্র্যাপ লোহা হিসেবে বিক্রির জন্য আমরা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে দেশীয় বা দেশের বাইরের যে প্রতিষ্ঠান বেশি দর হাঁকাবে, আমরা তার কাছেই জাহাজ দুটি বিক্রি করব।’

এদিকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টায় পতেঙ্গার ডলফিন জেটিতে তেল খালাসের সময় এমটি বাংলার জ্যোতি বিস্ফোরিত হয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজন মারা যান। ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাহাজটি। এ ঘটনার পরপরই ৪ অক্টোবর রাত ১২টা ৪০ মিনিটে এমটি বাংলার সৌরভ বহির্নোঙরে থাকা অবস্থায় বিস্ফোরিত হয়ে অগ্নিকাণ্ড ঘটায়। এতে একজনের মৃত্যু হয়। আর পরপরই উভয় জাহাজ আর তেল পরিবহন করবে না বলে ঘোষণা দেয় বিএসসি। এ দুই জাহাজ বহির্নোঙর থেকে (কুতুবদিয়া) তেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের ডলফিন জেটিতে ইস্টার্ন রিফাইনারির ট্যাংকে তেল সরবরাহ করত। ইস্টার্ন রিফাইনারি এসব তেল পরিশোধন করে সারা দেশে সরবরাহ করত।

২০১৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিক সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের আইন অনুযায়ী সিঙ্গেল হাল ট্যাংকারের কোনো জাহাজ সমুদ্রপথে তেল পরিবহন করতে পারবে না। কিন্তু তারপরও সরকারি জাহাজ হওয়ায় সিঙ্গেল হাল ট্যাংকারের এই জাহাজ দুটি বিশেষ অনুমোদন নিয়ে চলছিল। তবে বেশি পুরনো হওয়ায় এই জাহাজের পেছনে বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকা খরচ হতো বলে বিএসসি সূত্রে জানা যায়। 

পুরনো এই জাহাজ দুটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে যায় ২০১৫ সালে। তারপরও এত দিন এগুলো চালিয়ে আসা হয়েছিল জানিয়ে বাংলাদেশ মার্চেন্ট অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, ‘এগুলো অনেক আগেই স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রির উপযোগী হয়ে গিয়েছিল। এত দিন এগুলো বাড়তি সাপোর্ট দিয়েছে। এখন আর স্ক্র্যাপ ছাড়া গতি নেই। এতে ইন্স্যুরেন্সের কভারেজ যেমন পাচ্ছে, তেমনিভাবে স্ক্র্যাপের মূল্যবাবদও টাকা পাবে বিএসসি।’

তবে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যেহেতু ২৫ বছরের পুরনো জাহাজ জলপথে চলাচল করতে পারবে না, তাই বেশি বয়সী জাহাজগুলো বিশ্বে স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হলেও আমাদের এখানে হয়নি বলে জানান পিএইচপি শিপব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইকেল ইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘একটি জাহাজ ভাসমান অবস্থায় থাকলে নাবিকদের বেতনের পাশাপাশি জ্বালানি বাবদ অনেক টাকা খরচ হয়। তাই দ্রুত এগুলো উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরের প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে দেওয়া হলে দেশ লাভবান হবে।’

বিএসসির এ দুই জাহাজ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আমদানি করা তেল মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে ডলফিন জেটির ইস্টার্ন রিফাইনারিতে নিয়ে আসত। ২০১৫ সালে নেওয়া সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) নামে নেওয়া ৪ হাজার ৯৩৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকার প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু তিন দফায় মেয়াদ বাড়ায় ব্যয় বেড়ে ৮ হাজার ৩৪১ কোটি টাকায় গিয়ে পৌঁছে।

গত বছরের ৩ জুলাই ‘এমটি হোরে’ নামের জাহাজ থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে মহেশখালীর কালারমারছড়ায় স্থাপিত ট্যাংকে তেল পরিবহনের পরীক্ষামূলক কাজ শুরু হলেও গত মার্চে পাইপলাইনে তেল পরিবহন শুরু হয় নিয়মিতভাবে। পাঁচ দিন খালাসের পর তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আর তা চালু করা যায়নি। মহেশখালীর কালারমারছড়া ইউনিয়নে উপকূল থেকে ১৬ কিলোমিটার পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) স্থাপন করা হয়েছিল। এসপিএম থেকে ৩৬ ইঞ্চি ব্যসের দুটি আলাদা পাইপলাইনের মাধ্যমে ক্রুড অয়েল ও ডিজেল আসার কথা। কিন্তু পরীক্ষামূলক চালুর পর আর তা চালু করা যায়নি। এসপিএম চালু থাকলে আর লাইটার জাহাজে করে তেল চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে আনার প্রয়োজন পড়ত না। বর্তমানে এসব জাহাজের একটি রয়েছে নৌবাহিনীর ড্রাইডকে এবং অন্যটি কর্ণফুলী নদীর ওপারে আনোয়ারার পারকি বিচের কাছে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত