বিদেশে বাংলাদেশের ৩৭টি মিশনের পাসপোর্ট ও ভিসা উইংয়ে পাসপোর্ট কর্মকর্তাদের বদলে ক্যাডারদের পদায়ন নানা সময়ে নানা ধরনের ভুল হচ্ছে। ওইসব মিশনে শুধু ফিঙ্গারপ্রিন্ট ভুল নেওয়া হয়েছে ২ হাজার ১৫২ জনের, অসম্পূর্ণভাবে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে ১৪৬ জনের এবং চোখের আইরিশ ভুল করা হয়েছে ৭২০ জন আবেদনকারীর। এসব ভুলের কারণে বছরের পর বছর ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের। ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এসব ভোগান্তির মূল কারণ পাসপোর্ট সেবায় ক্যাডারদের অংশগ্রহণ।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইতে কর্মরত মো. ইউনুস (পাসপোর্ট নং : অঅ৯৮২৬৩৯১) নামে একজন শ্রমিক পাসপোর্ট হালনাগাদ করতে আবেদন করেছিলেন ২০২৩ সালে। কিন্তু তারিখের পর তারিখ বদল হলেও মিশন কর্মকর্তারা ২০২৪ সালের শেষ দিকে এসেও সেই আবেদনের নিষ্পত্তি করতে পারেননি।
এমন সংকটের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ওমান, কাতার, কুয়েত, সিঙ্গাপুর, ইতালি, কানাডা, বাহরাইন, হংকং, দক্ষিণ আফ্রিকা, জর্ডানে বাংলাদেশ মিশনের পাসপোর্ট ও ভিসা উইংয়ের জন্য প্রথম সচিব এবং দ্বিতীয় সচিব পদে ১৯ জনবল চেয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ। গত সেপ্টেম্বর মাসের ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রথম সচিব পদের জন্য আবেদনকারীর যোগ্যতা জাতীয় বেতন স্কেলের ষষ্ঠ গ্রেডে কমপক্ষে দুই বছরের চাকরির অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সিনিয়র সহকারী সচিব ও সমযোগ্যতাসম্পন্ন বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসের কর্মকর্তা এবং দ্বিতীয় সচিব পদের জন্য জাতীয় বেতন স্কেলের ষষ্ঠ গ্রেডপ্রাপ্ত সিনিয়র সহকারী সচিব ও সমযোগ্যতাসম্পন্ন বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসের কর্মকর্তারা আবেদন করতে পারবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তুলেছে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর। তাদের দাবি, ষষ্ঠ গ্রেডে বেতনপ্রাপ্ত হলেও পদমর্যাদায় পাসপোর্ট কর্মকর্তারা না বিসিএস ক্যাডার, না সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যদার। ফলে এ বিশেষায়িত পদগুলোতে তাদের আবেদনের সুযোগ থাকবে না।
এ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিকে সাংবিধানিক এবং বিধি মোতাবেক ন্যায়বিচার লঙ্ঘন দাবি করে সুরক্ষা সেবা বিভাগে উকিল নোটিস পাঠিয়েছেন পাসপোর্ট এবং ইমিগ্রেশন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। গত ৩০ অক্টোবর সুরক্ষা সেবা বিভাগের সিনিয়র সেক্রেটারি বরাবর এ নোটিস পাঠানো হয়।
কর্মকর্তাদের দাবি, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৩৬-এর উদ্দেশ্য পূরণে মাঠপর্যায়ে কাজ করে যাওয়া ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর বাংলাদেশ পাসপোর্ট আদেশ, ১৯৭৩ বলে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এই আদেশের অনুচ্ছেদ-২(ঘ)-তে পাসপোর্ট কর্র্তৃপক্ষের কথা বলা রয়েছে। বাংলাদেশ পাসপোর্ট বিধিমালা, ১৯৭৪ এর বিধি-৩-এ পাসপোর্ট কর্র্তৃপক্ষ সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া সত্ত্বেও সুরক্ষা সেবা বিভাগের এমন নোটিস জারি আইনকে স্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করাসহ আমলাদের সব সুবিধা ভোগের মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এখানে ব্রিটিশ নীলকরদের শাসনব্যবস্থার মতো অবস্থা। নীলকররা যেমন ঔপনিবেশিক নিপীড়ন চালাত এখন পাসপোর্টের কর্মকর্তাদের ওপর তেমন বৈষম্য চলছে।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির সংশোধনী চেয়েছেন ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ডিজি মেজর জেনারেল মো. নুরুল আনোয়ার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগে সিনিয়র সচিব বরাবর এক আবেদনে তিনি এ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির সংশোধনী চেয়ে পদগুলোতে অধিদপ্তরের দক্ষ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট সেবা দেওয়ার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের জন্য পদ বরাদ্দ করার দাবি করেছেন।
তার দাবি, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে পাসপোর্ট কর্মকর্তাদের আবেদনের সুযোগ না থাকায় অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হতাশাগ্রস্ত হয়েছেন। সিনিয়র সচিব ও উপদেষ্টাকে অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের হতাশার বিষয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে।
পাসপোর্ট ডিজির চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের পাসপোর্ট ও ভিসা উইংয়ে প্রথম সচিব ও দ্বিতীয় সচিব পদে পাসপোর্ট ও ভিসাসংক্রান্ত কাজে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা, অভিজ্ঞতা কারিগরি জ্ঞান ছাড়াই বর্ণিত ক্যাডারের কর্মকর্তারা আবেদন করতে পারলেও ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা তাদের ওপর আরোপিত কাজ করতে পারবে না। এ ধরনের নিয়োগ প্রকৃতপক্ষে দেশি-বিদেশি নাগরিকের অনুকূলে রাষ্ট্র কর্র্তৃক প্রদত্ত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে বিস্তৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা কার্যক্রমকে সম্পূর্ণরূপে বিঘিœত করবে। অধিকন্তু; বাংলাদেশ পাসপোর্ট বিধিমালা, ১৯৭৪ এর তফসিল সংশোধন ব্যতীত ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অভিজ্ঞ, দক্ষ এবং যোগ্য পাসপোর্ট কর্র্তৃপক্ষ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অন্য সব ক্যাডারকে নতুন করে পাসপোর্ট কর্র্তৃপক্ষ হিসেবে ঘোষণা করা আইনত সঠিক হবে না। অবশ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ বলছে, পদ তৈরি হয়েছে ক্যাডার সার্ভিসের জন্য। স্পষ্ট লেখা রয়েছে। এখানে জনপ্রশাসন নীতি মানা হয়েছে।
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, দক্ষ কর্মীদের বঞ্চিত করে সেবা নিশ্চিত করতে পারছে না মিশনগুলো। এসব কারণে পর্যটকরাও সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন। পাসপোর্ট সেবা বিষয়টি কারিগরি বিষয়, এটি কীভাবে অন্য কর্মকর্তা দিয়ে পূরণ হবে?
কর্মকর্তারা বলেন, অন্য ক্যাডার কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে কোনো দক্ষতা নেই। মিশনে যাওয়ার আগে সিনিয়র সহকারী সচিব বা যারা নিয়োগপ্রাপ্ত হন তাদের আমরাই মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ দিই।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে অভ্যন্তরীণ এ অসন্তোষের কথা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগকে অবহিত করেছেন পাসপোর্টের ডিজি। মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, জনবল নিয়োগে অর্থ বিভাগের যে শর্ত রয়েছে ‘সমপর্যায়ে কর্মকর্তা’ এ ধারাটি রাখা হয়নি। এ ধারাটি সংযোজনের আবেদন করেছেন ডিজি। এ বিষয়ে জানতে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ডিজিকে ফোন করা হলে তিনি তা রিসিভ করেননি।
এ প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর এ বৈষম্যের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি কাম্য নয়। আর সাংবিধানিক যে ন্যায্যতার কথা বলা হয়েছে, সেটি লঙ্ঘন করা হয়েছে এ বিজ্ঞপ্তিতে। বিশেষায়িত এ সেবা দেওয়ার জন্য যোগ্য ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে বিসিএস ক্যাডার দিয়ে সেবা সম্ভব নয়। পরে এ সেবা খাতে সুশাসনের ঘাটতি হওয়াই স্বাভাবিক।
২০১২ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর দেশের বাইরে বিভিন্ন মিশনে পাসপোর্ট ও ভিসা উইং তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সে বছর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট ও মেশিন রিডেবল ভিসা যন্ত্র বসানো হয়েছে এমন মিশনগুলোতে সেবা দেওয়ার উইং তৈরির প্রস্তাব করা হয়। সে সময় দাবি করা হয়, দক্ষ লোকের অভাবে যন্ত্রগুলো ব্যবহার হচ্ছে না। বাস্তবতা বিবেচনায় ৬৬টি মিশনে ৩৬৬টি পদ তৈরির প্রস্তাব দেয়। সে বছর ১৯টি বাংলাদেশি মিশনে ৭৩টি পদের অনুমোদন দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
অবশ্য ২০২৪ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক গেজেটে বলা হয়, প্রথম সচিবের পদ জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিবরা পূরণ করবেন এবং এ পদগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের জন্য সংরক্ষিত।
বিদেশি মিশনের পাসপোর্ট ও ভিসা উইংয়ে কর্মরত প্রথম সচিব তার মূল বেতন পান মার্কিন ডলারে। এ ছাড়া মাসে মোটা অঙ্কের বৈদেশিক ভাতা ও বিনোদন ভাতা পান ডলারে। কর্মকর্তার জন্য বার্ষিক ২০ হাজার ডলারের শিক্ষা ভাতা বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং সরকার থেকে তিন কক্ষের বাড়ির ব্যবস্থা ও ৯০ শতাংশ চিকিৎসা খরচও বহন করা হয়। বছরে একবার কর্মকর্তা ও তার পরিবারের সদস্যদের জন্য (সর্বোচ্চ পাঁচজন) বিমান টিকিটের ব্যবস্থা করা হয়।
