১৯৬৯ সাল, টেক্সাসের বাসিন্দা নরমা ম্যাককর্ভি তৃতীয় সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেছেন। তিনি সন্তান জন্মদানে ইচ্ছুক ছিলেন না। তবে সে সময় টেক্সাসে মায়ের প্রাণ বাঁচানোর জন্য ছাড়া গর্ভপাত অবৈধ ছিল। আইনজীবী সারাহ ওয়েডিংটন এবং লিন্ডা কফি ম্যাককর্ভির পক্ষে আইনি ছদ্মনাম ‘জেন রো’-এর আওতায় মার্কিন রাষ্ট্রীয় আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। টেক্সাসের গর্ভপাত আইন অসাংবিধানিক এই অভিযোগে মামলাটি দায়ের করা হয় তৎকালীন জেলা আইনজীবী হেনরি ওয়েডের বিরুদ্ধে। নর্দান ডিস্ট্রিক্ট অব টেক্সাসের আদালত মামলায় ম্যাককর্ভির পক্ষে রায় দেয়। দুই পক্ষই সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করার পর ১৯৭৩ সালে দেশটির ইতিহাসে এক নারী অধিকার রক্ষায় এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আদালতের রায়ে বলা হয় যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান নারীর গর্ভপাতের অধিকারকে রক্ষা করে, যা অনেক গর্ভপাত আইনকে বাতিল করে দেয়।
৫০ বছর আগের ‘রো ভার্সেস ওয়েড’ রায়কে ২০২২ সালে বাতিল ঘোষণা করেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিয়োগ করা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা এবং বলা হয় যুক্তরাষ্ট্রে নারীর গর্ভপাতের কোনো সাংবিধানিক অধিকার নেই। শুধু তাই নয়, ২০১৯ সালে জানা যায় ট্রাম্প প্রশাসন চুপি চুপি যুক্তরাষ্ট্রে গার্হস্থ্য সহিংসতা এবং যৌন নির্যাতনের আইনি সংজ্ঞা পরিবর্তন করেছে। ট্রাম্পের বিচার বিভাগের সংজ্ঞায় শুধুমাত্র শারীরিক ক্ষতির ক্ষেত্রে কোনো অপরাধকে গার্হস্থ্য সহিংসতা হিসেবে গণ্য করা হবে যার মানে মানসিক নির্যাতন, বলপূর্বক নিয়ন্ত্রণ এবং কৌশলে বশে আনার মতো বিষয়গুলো সংজ্ঞার মধ্যে পড়ছে না। ২০২৪-এ এসে যৌন নির্যাতনের একাধিক মামলায় অভিযুক্ত ও অপরাধী প্রমাণিত ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় নিজের চরম নারী বিদ্বেষমূলক ও পুরুষ শ্রেষ্ঠত্ববাদী অবস্থানকে জাহির করাকেই কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এমনকি প্রচারণার শেষ ভাগে এসেও তিনি মন্তব্য করেছেন তিনি মার্কিন নারীদের রক্ষা করেই ছাড়বেন, ‘তারা সেটা পছন্দ করুক বা না করুক’। অনেকটা সেই কর্র্তৃত্বপরায়ণ স্বামী বা সঙ্গীর মতো, যে আপনার ভালোটা আপনার চেয়ে ভালো বোঝেন আর তিনি অঙ্গীকার করছেন না হুমকি দিচ্ছেন তা ফারাক করা যায় না। প্রতিদ্বন্দ্বী কমলা হ্যারিসের প্রতিও তিনি ও তার শিবিরের অশোভন ও বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের তুবড়ি ছুটিয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হ্যারিস গোড়া থেকেই নিজের প্রচারণার কেন্দ্রে রেখেছেন নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যসহ মৌলিক অধিকারের বিষয়গুলো। বিয়ন্সের মতো আন্তর্জাতিক কৃষ্ণাঙ্গ তারকাকে সঙ্গে নিয়ে টেক্সাসে গর্ভপাতের অধিকার বিষয়ক শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছেন। মিশেল ওবামা তার হয়ে ‘রো ভার্সেস ওয়েড’ খারিজ হওয়ার পর নারীস্বাস্থ্যে যে প্রভাব পড়েছে তা নিয়ে কথা বলেছেন। এর আগে প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কে ট্রাম্পকে দাঁতভাঙা জবাবও দিয়েছেন।
দশকের পর দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নারী এবং পুরুষরা ভিন্নভাবে ভোট দিয়ে আসছেন। ১৯৯৬ সাল থেকে প্রত্যেক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মার্কিন নারীরা ডেমোক্রেটিক প্রার্থীর প্রতিই আনুকূল্য দেখিয়েছে, কিন্তু শ্বেতাঙ্গ নারীরা তা করেছে মাত্র একবার। মার্কিন মোট ভোটারদের ৩০ শতাংশ নারী ভোটার যা এককভাবে বৃহত্তম ভোটব্যাংক। ২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনের চেয়ে ট্রাম্পকে বেশি ভোট দেন শ্বেতাঙ্গ নারীরা এবং গেল নির্বাচনেও অধিকাংশ শ্বেতাঙ্গ নারী (৫৩ শতাংশ) ট্রাম্পকে সমর্থন করেন। যেখানে ৯৫ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ নারী এবং ৬১ শতাংশ হিসপ্যানিক নারী জো বাইডেনকে ভোট দেন। এ বছর নির্বাচন-পূর্ববর্তী সমস্ত জরিপে দেখা গিয়েছিল শ্বেতাঙ্গ নারীরাও হ্যারিসের দিকে ঝুঁকছেন। সেপ্টেম্বরের এক জরিপে দেখা যায় ৪২ শতাংশ শ্বেতাঙ্গ নারী হ্যারিসকে সমর্থন করছেন, যেখানে ট্রাম্পের পক্ষে ছিলেন ৪০ শতাংশ।
এদিকে ট্রাম্প পুরুষ ভোট টানার ক্ষেত্রেই মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছেন, বিশেষত কম বয়সী এবং অরাজনৈতিক পুরুষ ভোটারদের যারা অন্য গোষ্ঠীগুলোর তুলনায় ভোট দিতে কম উৎসাহী। ট্রাম্পের রানিং মেট জে ডি ভ্যান্স ২০২১ সালে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, কংগ্রেস ও বাইডেন প্রশাসনে থাকা জ্যেষ্ঠ নারী ডেমোক্র্যাটরা ‘কতগুলো সন্তানহীনা বিড়ালপালিকা যারা নিজেদের জীবনে এবং যেসব সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছেন সেগুলোতে জঘন্য এবং তাই তারা বাকি দেশটারও একই দশা করতে চায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা একটা মৌলিক তথ্য কমলা হ্যারিসকে দেখুন... ডেমোক্র্যাটদের গোটা ভবিষ্যৎ সন্তানহীন মানুষদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এবং এটা কি কোনোভাবে অর্থপূর্ণ যে আমরা আমাদের দেশকে এমন মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছি তাদের এটাতে কোনো অংশীদারিত্ব নেই?’ পারিবারিক মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ অংশীদারিত্বের দোহাই দিয়ে পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নারীর ভূমিকাকে আরও সীমাবদ্ধ করাকে গোড়া থেকেই প্রচারণার মূলে রেখেছেন ট্রাম্প। ইলন মাস্ক এবং হাল্ক হোগানের মতো অতি পুরুষালি ব্যক্তিত্বদের দ্বারা নিজেকে পরিবেষ্টিত রেখেছেন এবং নিজেকে একজন কর্র্তৃত্বপরায়ণ, শক্তিশালী পুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
এবিসি নিউজের ভোট-পূর্ববর্তী সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের মধ্যে ১৩ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন ট্রাম্প এবং কলেজ পর্যন্ত পড়া হয়নি এমন শ্বেতাঙ্গ নারী-পুরুষদের মধ্যে তিনি প্রায় ৩০ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন। জরিপ অনুযায়ী শ্বেতাঙ্গ নারীদের মধ্যেও তিনি ৪ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন।
নিজেকে একজন নারীবিদ্বেষী মাস্তান হিসেবে ট্রাম্প প্রশ্নাতীতভাবে প্রমাণ করেছেন। এবং এই মাস্তানির বলেই ২০১৬ সালে তিনি হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়েছিলেন, ২০২৪ সালে এসে হারালেন কমলা হ্যারিসকে। যুক্তরাষ্ট্র আবারও একজন নারী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে ইতিহাস গড়তে ব্যর্থ হলো। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট হ্যারিসের বিরুদ্ধে রিপাবলিকান শিবিরের প্রচারের অন্যতম বিষয়বস্তু ছিল তিনি সন্তানহীনা, ফলে রাষ্ট্রের ভবিষ্যতে তার অংশীদারিত্ব কোথায়? কিন্তু নারীর মৌলিক অধিকারে বারংবার আঘাত হানা ট্রাম্পের অংশীদারিত্বের সীমারেখা নির্ধারিত হবে কি কেবল পুরুষের বিচারে?
লেখক : সাংবাদিক ও অনুবাদক
