সংবিধানের ফাঁদ

আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০২৪, ০১:১৪ এএম

বাংলাদেশে সংবিধান সংবিধান করে যত চেঁচামেচি হয় জগতের আর কোথাও তা হয় না। আর কোথাও এত বেশি সংবিধান লঙ্ঘন হয় না। সংবিধানের দোহাই দিয়ে এত বেশি অপকর্মও আর কোথাও হয় না। সংবিধানের বিধিবিধান মেনে চলার বদলে আমরা আমাদের স্বেচ্ছাচারিতা পূরণে সংবিধান কাটাছেঁড়া করে বদলে ফেলাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আর আমাদের বিরোধিতা থেকে অন্যদের বিরত রাখতে আমরা সংবিধানকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করি। এই সংবিধানকে আমরা নিজেদের স্বৈরকর্মের ঢাল ও বর্ম হিসেবেও ব্যবহার করি। আবার জাতি যখন বড় রকমের কোনো সমস্যা সংকটে পড়ে তখন এই সংবিধান তার সুরাহার পথ বাতলে দিতে পারে না। বরং তখন বাস্তবসম্মত যে সমাধান আমাদের মানতে হয় তাকেই পরে সাংবিধানিক বৈধতা দিতে বাধ্য হই আমরা।

সংবিধানকে মহাপবিত্র বলে প্রচার করে যত অন্যায় ও পাতক কর্ম করা হয় তার অনেক কিছুই আমরা এই সংবিধানের ছুতাতেই সেরে ফেলি। এই সংবিধানের ব্যাখ্যা-অপব্যাখ্যারও কোনো অন্ত নেই। জোড়াতালিরও কোনো শেষ নেই। আমরা নিজেদের সংবিধান-অনুগত জাতি হিসেবে প্রমাণ করতে পারিনি। কিন্তু সংকীর্ণ স্বার্থরক্ষায় সংবিধান নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছি। এই সংবিধান জনগণের স্বার্থ ও গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ হতে পারেনি। অথচ লিখিত সংবিধান ছাড়াই কোনো কোনো দেশ গণতন্ত্র ও জনস্বার্থকে সমুন্নত রেখে চলেছে।

আমাদের দেশে যে সংবিধান রয়েছে সেই সংবিধানের আলোকে কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র গঠিত হয়নি। বরং একটি প্রদেশকে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে রাষ্ট্রে পরিণত করার পর সেই রাষ্ট্রটির চলার পথ নির্ণয়ের বিধিবিধান হিসেবে এই সংবিধান রচনা করা হয়েছে। আবার সেই সংবিধান রচনার প্রক্রিয়াটিও গোড়া থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে।

১৯৭০ সালে অখণ্ড পাকিস্তানে সামরিক শাসনের আওতায় সর্বশেষ নির্বাচনটি হয়েছিল লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার (এলএফও) নামের সামরিক অধ্যাদেশ অনুযায়ী। কথা ছিল ওতে জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদ নামের দুটি অ্যাসেম্বলি গঠিত হবে। জাতীয় পরিষদ পাকিস্তানের জন্য একটি শাসনতন্ত্রও রচনা করবে। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর সেই পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ ও পূর্বপাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের যেসব সদস্য বাংলাদেশে ছিলেন তাদের সমন্বয়ে বাংলাদেশ কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি বা গণপরিষদ গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়। ইতিমধ্যে মৃত ও যে সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিলেন তাদের বাদ দেওয়া হয় এবং মনোনীত কয়েকজন মহিলা সদস্যকে যুক্ত করা হয়। এই গণপরিষদ বাংলাদেশের সংবিধানের খসড়া রচনার জন্য ৩৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। সেই কমিটি প্রণীত খসড়া গণপরিষদ পাস করে।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে জাতীয় সরকার গঠনের দাবি নাকচ করে কেবল একদলীয় বা আওয়ামী লীগের সরকার গঠন এবং সেই সরকারের আদেশে গণপরিষদ গঠনের বৈধতার ব্যাপারে প্রশ্ন তুলে প্রখ্যাত সাংবাদিক আবদুস সালাম ‘দ্য সুপ্রিম টেস্ট’ শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় লেখেন। এই অপরাধে বাংলাদেশ অবজারভার পত্রিকার সম্পাদক পদ থেকে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও তার দলও এই গণপরিষদ গঠনকে অবৈধ বলে মত দেয়। সে সময় নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ গণপরিষদে পাস হওয়া সংবিধানের প্রতি জনগণের অনুমোদন আছে কিনা তা যাচাইয়ের জন্য গণভোট আয়োজনের দাবি জানায়। কিন্তু এসব দাবি ও মতামত নাকচ করে দেওয়া হয়।

প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়ায় প্রণীত ১৯৭২ সালের সংবিধানের প্রতি দেশের জনগণের কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি। এতে জনগণের মনোভাব বা আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে কিনা তাও যাচাই করা হয়নি। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এরপর বলা হয়, এই ভোট প্রমাণ করেছে যে, স্বাধীনতার পর সরকার ও গণপরিষদ গঠন এবং সংবিধান প্রণয়নসহ প্রতিটা কাজের প্রতিই দেশবাসীর অনুমোদন রয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে এসব কার্যকলাপের কিছুই সাংবিধানিক বা আইনগত বৈধ পথে করা হয়নি। করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধকে একটা বিপ্লব হিসেবে ধরে নিয়ে সেই বিপ্লবের বিজয়ের পটভূমিতে অর্জিত কর্র্তৃত্বের বলে। কিন্তু সেই বিপ্লবী বৈধতাও কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব দলের সমন্বয়ে জাতীয় সরকার গঠন না করে একদলীয় বা কেবল আওয়ামী লীগের সরকার গঠন করায়।

১৯৭২ সালের সংবিধানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চারটি মূলনীতির কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু ১২ অক্টোবর সংবিধানের যে খসড়া গণপরিষদে পেশ করা হয় তাতে তিনটি মূলনীতির কথা বলা হয়েছিল। সেই প্রস্তাবিত মূলনীতি তিনটি ছিল : গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। ৩১ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এমএজি ওসমানী গণপরিষদে দেওয়া ভাষণে জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানালে পরিষদ তা গ্রহণ করে। তিনি তখন গণপরিষদ সদস্য ও মন্ত্রী ছিলেন। ৪ নভেম্বর গণপরিষদ সংবিধান পাস করে এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস থেকে তা কার্যকর বলে ঘোষণা করা হয়।

জনগণের অনুমোদন ছাড়াই প্রণীত ও গৃহীত এ সংবিধানকে মুক্তিযুদ্ধের বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত কর্র্তৃত্ব বলে চাপিয়ে দেওয়া বলে ধরে নেওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধ যে বাস্তবতার জন্ম দিয়েছিল এবং তখনকার জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতা যেসব বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছিল সংবিধান প্রণেতারা সেসব তাৎক্ষণিকতার প্রভাব এড়াতে পারেননি। তারা সে সময় মুজিববাদের অস্পষ্ট এক রাজনৈতিক তত্ত্বের ঘোরে আচ্ছন্ন ছিলেন। যে তত্ত্ব সম্পর্কে ‘গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র’ এই শব্দবন্ধটুকু ছাড়া বিশদ কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। এই তত্ত্বই ছিল ১৯৭২-এর সংবিধান প্রণয়নের চালিকাশক্তি।

তবে ঐ যে বললাম, মুজিববাদের তত্ত্বগত অস্পষ্টতার কথা, সেই অস্পষ্টতার কারণে সংবিধানে মুজিববাদ ঠিকমতো প্রতিফলিত হতে পারেনি। শাসনব্যবস্থা ও রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে মুজিববাদের বাস্তব প্রয়োগ করতে গিয়ে বারবার তাই হোঁচট খেতে হয়েছে আর প্রতি পদক্ষেপে সংবিধান বদলাতে হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বদলটা ঘটাতে হয় ১৯৭৪ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে। মুজিববাদকে ‘গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র’ বলা হলেও প্রয়োগ করতে গিয়ে মুজিববাদীরা গণতন্ত্রকেই সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখতে পায়। আর তাই গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ছুড়ে ফেলে দিয়ে প্রবর্তন করা হয় একদলীয় ব্যবস্থা বাকশাল। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই বাকশাল প্রবর্তন করতে গিয়ে সংবিধানের মৌলিক চরিত্র সম্পূর্ণ বদলে ফেলা হয়। কিন্তু এর জন্য জনগণের কাছে থেকে কোনো ম্যান্ডেট কিংবা গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদন নেওয়া হয়নি। সংবিধান যেমন মুক্তিযুদ্ধ থেকে উৎসারিত বিপ্লবী কর্র্তৃত্বের বলে তৈরি করা হয়েছিল ঠিক তেমনই চতুর্থ সংশোধনীকেও দ্বিতীয় বিপ্লব নাম দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করা হয়, যদিও এর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের মতো জনগণের কোনো সম্পৃক্ততাই ছিল না। ফলে বাহাত্তরের সংবিধানকে বৈধ বিবেচনা করলে চতুর্থ সংশোধনীকে সবচেয়ে গুরুতর সংবিধান লঙ্ঘনের ঘটনা বলে মানতে হয়।

চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে যে সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন ঘটে তাতে শান্তিপূর্ণ, নিয়মতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক পন্থায় পরিবর্তনের সব সুযোগ রহিত হয়ে যায়। ফলে বৈপ্লবিক ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সরকার বদলের ধারার সূত্রপাত ঘটে। এবং সেসব পরিবর্তনকে পরবর্তী সময় সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়ার রীতি চালু হয়ে যায়। দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিক পথে সরকার পরিবর্তনের পথ অনেকটাই উন্মোচিত হয়। আবার ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন অনির্বাচিত সরকার গঠনের ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। এই পদ্ধতি কিছু সময়ের জন্য সাংবিধানের মৌলিক চরিত্র পরিবর্তনের সুযোগ দেয়। অথচ এই মৌলিক পরিবর্তনের ব্যাপারে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

এরপর আসে পঞ্চদশ সংশোধনী। এটিও চতুর্থ সংশোধনীর মতোই ভয়ংকর এবং সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন আনা এই সংশোধনীর প্রতিও গণভোটের মাধ্যমে জনগণের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। পঞ্চদশ সংশোধনীও প্রকারান্তরে নিয়মতান্ত্রিক পথে সরকার বদলের সব পথ রুদ্ধ করে দেয়। ফলে ‘চব্বিশের ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থান অর্থাৎ বলপ্রয়োগের মাধ্যমে হাসিনা রেজিমকে উৎখাত করা হয়। এই পরিবর্তন রাষ্ট্রপরিচালনার জন্য যে সরকারের হাতে দায়িত্ব দেয় সেই সরকারেরও সাংবিধানিক বৈধতা নেই। অর্থাৎ ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থান বা বিপ্লব থেকে উৎসারিত কর্র্তৃত্ব বলেই এখন সব কিছু চলছে।

ইতিহাসের এই পর্যায়ে এসে বিদ্যমান সেই মুজিববাদী সংবিধানের কার্যকারিতা ও ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংবিধান সংস্কারের ব্যাপারে সরকার একটি কমিশনও গঠন করেছে। তবে কিছু সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান হালনাগাদ করা হবে নাকি নতুন করে লেখা হবে তা নিয়ে মতভেদ রয়ে গেছে। সংবিধানে হাত দেওয়ার ব্যাপারে বর্তমান সরকারের অধিকার ও এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ। আমি মনে করি, মুজিববাদের অস্পষ্ট তত্ত্বের ভিত্তিতে ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতিতে প্রণীত এবং কয়েক দফায় অন্যায়ভাবে পরিবর্তিত সংবিধানের কার্যকারিতা, ন্যায্যতা ও বৈধতা কোনোটাই নেই। জাতি হিসেবে আমরা সেই অচল সংবিধানের ফাঁদে আটকা পড়ে আছি। ‘চব্বিশের বিপ্লব সেই সাংবিধানিক ফাঁদ থেকে আমাদের সামনে মুক্তির যে সুযোগ এনে দিয়েছে সে সুযোগকে সাহসের সঙ্গে কাজে লাগানো উচিত। না হলে আবার সেই জোড়াতালির ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে থাকবে এবং আমরা ঘুরপাক খেতে থাকব সংকটের চক্রব্যুহে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত