জর্জ অরওয়েল অ্যানিমেল ফার্মে বলেছিলেন, সব প্রাণীই সমান, তবে কোনো কোনো প্রাণী অন্যরে চেয়ে বেশি সমান। টোটালিটারিয়ান দুনিয়ায় মানুষের অসাম্য নিয়ে খোঁটা নিয়ে কথাটা বলেছিলেন এই ব্রিটিশ লেখক। কিন্তু মানুষের দুনিয়ায় কবে অসাম্য না ছিল? বার্থ লটারি কিংবা সামাজিক অবস্থানের জোরেই কি মানুষের অবস্থান নির্ধারিত হয় না? এমনকি শিশুদের বেলাতেও? যদিও শিশুদের নিয়ে মানবসমাজে আদিখ্যেতা চলে, নিষ্পাপ বলে এই ছোট আত্মাগুলো সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখা হয়, কিন্তু বারবার আমাদের সামনে সত্যটা চলেই আসে— সব শিশুর লাশ সমান নহে।
আলাপটা আবার সামনে এলো শিশু মুনতাহার মৃত্যুতে। ফুটফুটে সুন্দর শিশু মুনতাহা কদিন আগে হারিয়ে যায়। তার অনিন্দ্যসুন্দর ছবিটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জুড়ে ছড়িয়ে যায়। বাচ্চাটার চোখের মায়া বুকের ভেতর গিয়ে আঘাত করে। এমনিতে সারাক্ষণ ঘেন্না ছড়ানো আর নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই করা নেটিজেনরা অস্থির হয়ে ওঠেন। কেউ কেউ পুরস্কার ঘোষণা করেন, কেউ প্রার্থনায় রত হন। ইয়া খোদা, হে ভগবান, এই মাসুম বাচ্চাটাকে তুমি রক্ষা করো।
কিন্তু দুনিয়ার কদর্যতা সব কল্পনাকে ছাড়িয়ে যায়। বিশেষত দুপেয়ে জীবের সমাজে। নৃশংসতা শব্দটাকে গালভরে পাশবিক বলা হলেও, মানুষের পৃথিবীতে নিষ্ঠুরতা পশুদের কল্পনার বাইরে।
মুনতাহার লাশ পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, তুচ্ছ রাগের বশবর্তী হয়ে তারই পরিচিত এক নারী শিশুটিকে হত্যা করে পুঁতে ফেলতে চেয়েছিলেন। এলাকাবাসীর হাতে ধরা পড়েন ওই নারী। পুরো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অবশ শোকে নিথর হয়ে পড়ে।
বছরদুই আগে আয়াত নামে এক শিশুর ছয় টুকরা লাশ পাওয়া যায়। ওরই বয়সী আয়লান কুর্দি যুদ্ধ থেকে বাঁচতে সাগর পাড়ি দিতে চেয়েছিল। পাঁচ বছরের বাচ্চাটার লাশ পুরো দুনিয়ার মানবতাকে নাড়া দিয়েছিল।
মুনতাহা আর আয়াতের মতো শোরগোল উঠেছিল রাজনের বেলাতেও। রাজনকে অবশ্য এই ‘কাতারে’ উঠতে নির্মমভাবে মরতে হয়েছিল। ‘চোর’ সন্দেহে ১৩ বছরের রাজনকে চার-চারজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নির্মম অত্যাচার করে শুধু হত্যাই করে না, এর ভিডিও করে। সম্ভবত ওই চারজনের মনে হয়েছিল, ‘চোর পেটানোর’ মতো মহৎ কাজ করে তারা সমাজের প্রশংসা কুড়াবে।
লোকগুলোর দুর্ভাগ্যই বলতে হবে। এই তল্লাটে তো গণপিটুনি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি বিষয়। কবির সুমন তার কাঁদতে দে গানে বিবরণ দিয়েছিলেন এই পৈশাচিক গণ-উন্মাদনার উল্লাসের।
‘প্যাঁচ দিয়ে দিয়ে ভাঙা দুই হাত
ওপড়ানো নখ ওপড়ানো দাঁত
উদাসীনভাবে দেখছে লোকে
ক্ষতবিক্ষত ছেলেটার লাশ
দেখছে জনতা বলছে সাবাস’
দুই বাচ্চার এক মাকে আমরা পিটিয়ে মেরেছিলাম বিপুল উদ্যম ও আক্রোশ নিয়ে। ইনসাফবিহীন সমাজে আদিম মানুষের রুদ্রমূর্তি ধারণ করে গণপিটুনি রীতিমতো আমাদের ‘সংস্কৃতি’।
সে কথা আপাতত থাক। শিশুরে আলাপেই ফিরে আসি। মুনতাহার মৃত্যু আমাদের কাঁদায় শিশুটি সুন্দর বলে। রাজনের মৃত্যু আমাদের বিচলিত করে ভিডিও দেখে। গোপনে গোপনে খুনিদের মতো উল্লাস চাপা দিয়ে ফেসবুকে ভালো মানুষ সাজার মিছিলে যোগ দেওয়ার প্রেরণায়। তেমনিভাবে ক্রসফায়ারে নিহত হওয়া এক বাবার সঙ্গে মেয়েশিশুর শেষ মুহূর্তের কথোপকথনে আমরা ডুকরে কাঁদি।
এসব আসলে সভ্যসমাজে কেউ স্বীকার না করলেও, স্রেফ দৃশ্যকল্পের চাপ। নতুবা আমাদের সভ্যতায় শিশুদের নিয়ে, সহমানুষদের নিয়ে আমাদের তেমন হোলদোল নেই। আমরা সাধারণত মানুষ, এমনকি শিশু মরলেও অচেতনে আগে বিবেচনা করে নিই তা আমারে গোত্রের আওতাভুক্ত কি না।
রাজনৈতিক বিচারে গাজার শিশুমৃত্যু আমাদের যতটা বিচলিত করে রোহিঙ্গা, উইঘুরের শিশু ততটা করে না। বিহারি শিশু মরাতে তো সহ-বাঙালিদের উল্লাস পর্যন্ত করতে দেখেছি। নানা রকম জাতীয়তাবাদী আর ধর্মীয় চেতনার জজবা মানুষকে বরাবরই চালিত করে। পশ্চিমারা আবার যেমন একটা ফিলিস্তিনি লাশের চেয়ে ইসরায়েলি জীবনের মূল্য অনেক বেশি দেয়।
পশ্চিমা দার্শনিক স্লাভোই জিজেক ব্যাপারটাকে টয়লেটে ফ্লাশ করার সঙ্গে তুলনা দেন, যা আমরা দেখি না তার অস্তিত্বই নেই। যেই খুনগুলো চোখের সামনে ঘটে, তা নিয়ে আমরা বিচলিত হই কিন্তু বাকিগুলো আমাদের কাছে সংখ্যা। একটা মানুষের জবাই করার ভিডিও আমাদের যতটা বিচলিত করে, বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হওয়াটা, পুলিশের হামলায় বা যুদ্ধে মরাটা ততটা করে না। আর দারিদ্র্যের কারণে যে হত্যাকাণ্ড, তা তো স্রেফ সংখ্যা।
ফেসবুকে লক্ষ করলাম, মুনতাহার মৃত্যুর সঙ্গে জুলাই আন্দোলনে হত্যা করা শিশুদের তুলনা হচ্ছে। লেখক আফসোস করে বলছেন, মুনতাহার মৃত্যুতে সবাই কাঁদলেও রিয়া, তাহমিদ, জাবির, যাদের পতিত স্বৈরাচার গুলি করে মেরেছিল, তাদের শোক অনেককে ছুঁতে পারছে না। বরং রাজনৈতিক প্রভাবে সেই খুনিদেরই অনেকে সমর্থন করছে। কথাটা আবেগী হলেও এর বাস্তবতা কঠিন। মানুষ কখনোই এসব বিবেচনাবোধের ঊর্ধ্বে না। জন লেনন যে দুনিয়ার স্বপ্ন দেখতেন, তা ইউটোপিয়াই। শিশুরাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ, যুদ্ধে, চেতনায়, বিশ্বাসে তাদের ছাড় দেওয়া হয় না।
মুনতাহা হত্যা: চার আসামি ৫ দিনের রিমান্ডে
উপদেষ্টা পরিষদের ১৪ জনই চট্টগ্রাম বিভাগের