বিশ্বকাপ ফুটবল: খেলায় জয়-পরাজয় নিয়ে ট্রল ও বুলিং নয়, হোক পারস্পরিক সম্মান

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ১১:২৬ পিএম

বিশ্বকাপ ফুটবল শুধুমাত্র একটি খেলা নয়; এটি কোটি মানুষের আবেগ, পরিচয় এবং আনন্দের একটি বড় অংশ। তাই প্রিয় দলের জয়-পরাজয়ে উচ্ছ্বাস, হতাশা বা বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি-ঠাট্টা স্বাভাবিক। কিন্তু যখন সেই হাসি-ঠাট্টা অপমান, ব্যক্তিগত আক্রমণ, কটূক্তি বা বারবার বিদ্রূপে পরিণত হয়, তখন তা আর ট্রল বা ব্যান্টার (banter) থাকে না—বরং বুলিং (bullying)-এ রূপ নেয়।

মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা
১. সামাজিক পরিচয় (Social Identity Theory) মানুষ তার প্রিয় দলকে নিজের পরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখে। ফলে দলের জয়কে নিজের জয় এবং পরাজয়কে নিজের পরাজয় হিসেবে অনুভব করে। এই পরিচয়ের কারণে প্রতিপক্ষ দলের সমর্থকদের ছোট করা বা উপহাস করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
২. "আমরা বনাম তারা" (In-group vs Out-group Bias) মনোবিজ্ঞানে দেখা যায়, মানুষ নিজের দলের সদস্যদের ইতিবাচকভাবে এবং অন্য দলের সদস্যদের নেতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করার প্রবণতা রাখে। বিশ্বকাপের সময় এই বিভাজন আরও তীব্র হতে পারে এবং তা অপ্রয়োজনীয় ট্রলিংয়ের জন্ম দেয়।
৩. আবেগ নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি খেলায় হারের হতাশা, রাগ বা ক্ষোভ অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে বা সহকর্মীদের ওপর বিদ্রূপের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। এটি অনেক সময় নিজের নেতিবাচক আবেগ অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার (displacement) একটি রূপ।
৪. দলগত প্রভাব (Group Effect) একজন ব্যক্তি একা হয়তো কাউকে অপমান করতেন না, কিন্তু দলবদ্ধভাবে বা সামাজিক মাধ্যমে অন্যদের উৎসাহে ট্রলিংয়ে অংশ নিয়ে ফেলেন। এতে অনেকেই বুঝতেই পারেন না যে তাদের আচরণ অন্যের মানসিক কষ্টের কারণ হচ্ছে।

ট্রল কখন বুলিং হয়ে যায়?
গবেষণায় দেখা গেছে, মজা বা banter তখনই বুলিংয়ে পরিণত হয় যখন— একই ব্যক্তিকে বারবার লক্ষ্য করা হয়, অপমান বা কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্য থাকে, ভুক্তভোগী অস্বস্তি বা অপমানবোধ করেন, থামতে বলার পরও আচরণ বন্ধ করা হয় না।

গবেষণা কী বলছে?
Frontiers in Psychology (2022)-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ফুটবল সংস্কৃতিতে "মজা" ও "বুলিং"-এর সীমারেখা অনেক সময় অস্পষ্ট হয়ে যায়। খেলোয়াড়দের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, যেটিকে অনেকে "স্রেফ মজা" মনে করেন, সেটিই অন্য কারও জন্য মানসিক আঘাতের কারণ হতে পারে।

European Sport Management Quarterly (2022)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, পেশাদার ফুটবলে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া "banter" অনেক সময় উদ্বেগ, মানসিক চাপ এবং কর্মক্ষেত্রে অসন্তোষ সৃষ্টি করে।

করণীয়
খেলাকে খেলার জায়গাতেই রাখুন; ব্যক্তিকে নয়, খেলাকে নিয়ে আলোচনা করুন। বন্ধুত্বপূর্ণ রসিকতা করুন, কিন্তু কারও আত্মসম্মানে আঘাত দেবেন না। কেউ অস্বস্তি প্রকাশ করলে সঙ্গে সঙ্গে থেমে যান। কর্মক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মান ও নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখুন। শিশু ও তরুণদের সামনে সম্মানজনক ক্রীড়া সংস্কৃতির উদাহরণ তৈরি করুন।

মনে রাখুন, আজ আপনার দল জিতেছে, কাল হারতেও পারে—কিন্তু সম্পর্ক যেন হারিয়ে না যায়।

শেষ কথা
ফুটবল আমাদের আনন্দ, ঐক্য এবং মানবিকতার বার্তা দেয়। একটি ম্যাচের ফলাফল সাময়িক, কিন্তু আমাদের ব্যবহার ও সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী। তাই বিশ্বকাপের উন্মাদনায় ট্রল বা বুলিং নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা এবং সুস্থ ক্রীড়া সংস্কৃতিই হোক আমাদের পরিচয়।

লেখক : সিনিয়র সাইকোলজিস্ট এন্ড এডিকশন প্রফেশনাল, স্বাস্থ্য ও নিউট্রিশন সেক্টর, ঢাকা আহছানিয়া মিশন

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত