একসময় বলা হতো, ‘ভাতের পরিবর্তে আলু খান, ভাতের ওপর চাপ কমান।’ কিন্তু তখন খুচরা বাজারে আলু ছিল, কমবেশি ১২-১৬ টাকা কেজি। মাত্র ৩ বছর আগের কথা। তারপর ধীরে ধীরে বর্তমানে আসে। এখন খুচরা বাজারে আলুর কেজি ৭০-৭৫ টাকা। দাম নাকি আরও বাড়তে পারে! টিসিবির তথ্যানুসারে, গত চার বছরে প্রতি কেজি আলুর দাম বেড়েছে গড়ে ৭০ শতাংশ। এর মধ্যে ২০২২ সালে প্রতি কেজি আলুর দাম বেড়েছে ৫০ শতাংশ, ২০২৩ সালে বাড়ে ৬৬ ও চলতি বছরে বেড়েছে ৮৭ শতাংশ। বর্তমানে খুচরা বাজারে বিক্রি হওয়া ৭০-৭৫ টাকার আলু ২০২১ সালে বিক্রি হয়েছিল মাত্র ১৬ টাকায়। পরের বছর ৮ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হয়েছিল ২৪ টাকায়। এর পরের বছরে ১৬ টাকা বেড়ে হয় ৪০ টাকা।
প্রতি বছর শীত মৌসুমের শুরুতে এই সবজির উৎপাদন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। এ সময় কৃষকরা মাঠ থেকে ১ কেজি আলু বিক্রি করেন মাত্র ১৪-১৫ টাকায়। গত জুনে হঠাৎ করেই আলুর বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। দাম ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আলু আমদানিতে শুল্ক কমিয়েছে সরকার। গত ৫ সেপ্টেম্বর ২৫ শতাংশ শুল্ক থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ ও নিয়ন্ত্রণ শুল্ক প্রত্যাহার করে নেয়। এরপরও তখন আমদানি শুরু হয়নি। সম্প্রতি দেশে আলুর দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে পড়তা পড়ায় বিশেষ উদ্দেশ্যে গত সপ্তাহ থেকে আমদানি শুরু হয়েছে। প্রথম দিকে দুই থেকে তিন ট্রাক আমদানি হলেও পরে তা বেড়ে ১০ থেকে ২০ ট্রাকে দাঁড়িয়েছে। তারপরও আলুতে আগুন। এত আলু যায় কোথায়? দেশে এ বছর চাহিদার চেয়ে বেশি আলু উৎপাদন হয়েছে। বাড়তি আলুও আছে ব্যবসায়ীদের কাছে। তারপরও আলুর কেজি ৭৫ টাকা, দাম নাকি আরও বাড়তে পারে।
সরবরাহ সংকটের অজুহাত দেখিয়ে অস্থিরতা তৈরি করা হয়েছে আলুর বাজারে। নতুন আলু বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। শীত মৌসুমের শুরুতে এই সবজির উৎপাদন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় আর মাঠ থেকে ১ কেজি আলু বিক্রি হয় মাত্র ১৪-১৫ টাকায়। একসময় কৃষকরা দাম না পেয়ে রাস্তায় আলু ফেলে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। আলুর বাম্পার ফলন হলেও একদিকে কৃষকরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না অন্যদিকে ক্রেতাও কম দামে আলু কিনতে পারছেন না। এর সুফল ভোগ করছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা।
কেউ বলেন, আলুর দাম বাড়ার জন্য পাইকাররা দায়ী। আবার পাইকাররা দুষছেন, হিমাগার মালিকদের। তারা বলছেন, কৃষকের থেকে কম দামে আলু কিনে হিমাগার ব্যবসায়ীরা প্রতি কেজি আলুতে অন্তত ২০ টাকা লাভ করছেন। হিমাগার থেকে আলু নিয়ে তাদের নিজস্ব ফড়িয়া সিন্ডিকেট সদস্যরা ১০ টাকা লাভে দেশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করেন। এতে হিমাগার থেকে বের হতেই প্রতি কেজি আলুতে ৩০ টাকা বেড়ে যায়। এতে চাপ পড়ে খুচরা পর্যায়ে। আবার খুচরায় প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৭৫ টাকায়। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে সোমবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব মতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদিত আলুর পরিমাণ ১ কোটি ১৯ লাখ ৯১ হাজার টন। অন্যদিকে চাহিদা মাত্র ৯০ লাখ টন। এরপরও কেন আলুর দামে ঊর্ধ্বগতি? ফেব্রুয়ারি-মার্চে কৃষকরা মাঠ থেকে আলু উত্তোলন করে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের কাছে তা বিক্রি করে দেন। এসব আলু মজুদ করতে হিমাগারে রাখা হয়। জুন মাস থেকে আলুর সরবরাহ কমিয়ে দেন মজুদদাররা। এই কৌশল অবলম্বন করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে আলুর দাম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেন। অক্টোবর-ডিসেম্বর পর্যন্ত এই দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে। যে কারণে কিছুদিন আগেই এনবিআর আলু আমদানিতে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক কমিয়েছে। একইসঙ্গে আলু আমদানিতে যে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ছিল, তাও প্রত্যাহার করা হয়েছে। তারপরও এই পণ্য নিয়ে মজুদদাররা দস্যুপনা করছেন। বাজারে এই দুর্বৃত্তায়ন চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ হবে অশুভ। তখন কেবল আলুতেই এমন প্রবণতা আটকে থাকবে না। আলুর দামে আগুন লাগলে, শেষ পর্যন্ত কে যে পোড়ে! যদিও পোড়া আলু অনেকের পছন্দ।
