নতুন তিন উপদেষ্টা রবিবার সন্ধ্যায় শপথ নেওয়ার পর দুই উপদেষ্টার পূর্ববর্তী সময়ে তাদের বিতর্কিত কর্মকা- ঘিরে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। এ উপদেষ্টাদের নিয়ে সন্তুষ্ট নন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরাও। ওই রাতেই ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে তারা বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। তাছাড়া গতকাল সোমবার বিকেলে একই দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ এ সময় বলেছেন, ধানম-ি ৩২-কে যারা কাফেলা মনে করে, তাদের উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন রবিবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ পড়ান নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত তিন উপদেষ্টাকে। তারা হলেনÑ ব্যবসায়ী সেখ বশির উদ্দিন, চলচ্চিত্র পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম। তাদের মধ্যে ফারুকী ও সেখ বশিরকে নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
রবিবার রাত থেকেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে নতুন উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ঘনিষ্ঠতার নানা ছবি ও লেখা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হতে শুরু করে। ফারুকী বিভিন্ন সময় তার লেখায় ও ফেসবুক পোস্টে শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব ও শেখ হাসিনার প্রশংসা করেছেন। শুধু তিনি নন, তার স্ত্রী অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশাও আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে বিভিন্ন সময় নানা সুবিধা গ্রহণ করেছেন। শেখ হাসিনার লেখা ‘শেখ ফজিলাতুন নেছা-আমার মা’ শিরোনামে লেখার প্রশংসা করে একটি রিভিউ পোস্ট করেছিলেন ফারুকী। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ‘ইতিহাস বেশির ভাগ সময় বিজয়ী এবং পুরুষের চোখেই লেখা হয়। শেখ হাসিনার এই লেখাটায় একটা ভিন্ন জানালা দিয়ে আমাদের ইতিহাসটাকে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে। খুবই ইন্টারেস্টিং পার্সপেক্টিভ। পড়তে পড়তে অনেক জায়গায় আমার নিজের মাকে দেখতে পেয়েছি, নানাকে দেখতে পেয়েছি, মায়ের সংগ্রাম দেখতে পেয়েছি, বাবাকে দেখতে পেয়েছি।’
এ ছাড়া ৭ আগস্ট নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পোস্টে উপদেষ্টা ফারুকী লিখেছিলেন, ‘আমি মনে করি, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর একটা জরুরি কাজ হবে ৩২ নম্বরের বাড়ির সংস্কারকাজ শুরু করা। এই বাড়িকে আগের চেহারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা এবং এ বাড়ি সম্পর্কিত বিভিন্ন ছবি, স্মৃতিস্মারক যা যা পাওয়া যায় তা দিয়ে যাদুঘর আবার চালু করা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান প্রফেসর ইউনূসের উচিত হবে নিজেই বাড়িটা ভিজিট করা।’
সমালোচনা থেকে বাদ যাননি ব্যবসায়ী সেখ বশির উদ্দিনও। তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আফিল উদ্দিনের ভাই হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছে সমালোচিত হয়েছেন। আফিল উদ্দিন ২০০৯ সাল থেকে টানা চারবার আওয়ামী লীগের এমপি হিসেবে জয়ী হয়েছেন।
এ ছাড়া উত্তরবঙ্গ তথা রংপুর ও রাজশাহীর ১৬ জেলা থেকে কোনো উপদেষ্টাদের নিয়োগ না দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন উত্তরবঙ্গের শিক্ষার্থীরা। শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সংবলিত দরবার হলে নতুন উপদেষ্টাদের শপথ পাঠ নিয়েও সমালোচনা শুরু হয়। যদিও পরে সেখানে থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি অপসারণ করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সরব হন অনেকে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক সারজিস আলম ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘শুধু ১টা বিভাগ থেকে ১৩ জন উপদেষ্টা! অথচ উত্তরবঙ্গের রংপুর, রাজশাহী বিভাগের ১৬টা জেলা থেকে কোনো উপদেষ্টা নাই! তার ওপর খুান হাসিনার তেলবাজরাও উপদেষ্টা হচ্ছে!’ সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, ‘যে স্বপ্ন ধারণ করে হাজারো শহীদ জীবন বিলিয়ে দিয়েছে, তাদের দেওয়া আমাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে যে কারও বিরোধিতা করতে আমি দ্বিধা করব না, বরং এই বিরোধিতা ন্যায্য এবং দায়িত্বও বটে। স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রয়োজনে আরেকবার লড়াই হবে, জীবনবাজি রাখা হবে।’ আব্দুল কাদের লেখেন, ‘অথচ কথা ছিল, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপ; কিন্তু কী হচ্ছে? কারা এসব করাচ্ছে? আপনাদের উদ্দেশ্য কী?’ দ্বিতীয় বিপ্লবের কথা তুলে ধরে রিফাত রশিদ বলেন, ‘সেকেন্ড রেভল্যুশন, নতুন সংবিধান, সেকেন্ড রিপাবলিক, বিপ্লবীদের নিয়ে গঠিত রাষ্ট্র...।’ সমন্বয়ক রেজওয়ান আহমেদ রিফাত লেখেন, ‘বিপ্লবী সরকার গঠনে বাধা দিচ্ছে কারা? ছাত্রদের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ এ বাধা কারা? আমরা জুলাই এর পক্ষে আবার লড়াই করতে প্রস্তুত।’
এদিকে গতকাল ছাত্র-জনতার অংশীদারত্বহীন সিদ্ধান্তে উপদেষ্টা নিয়োগের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘যুদ্ধ শুরু হলে রাজনীতিবিদরা অস্ত্র দেয়, ধনীরা রুটি দেয় আর গরিবরা তাদের ছেলেদের দেয়। যুদ্ধ শেষ হলে রাজনীতিবিদরা হাত মেলায়, ধনীরা রুটির দাম বাড়ায় কিন্তু গরিবরা তাদের ছেলেদের কবর খুঁজে।’
ধানমন্ডি ৩২-কে যারা কাফেলা মনে করে তাদের উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করে আহ্বায়ক হাসনাত বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের রক্তকে পুঁজি করে, শ্রমিকদের রক্তকে পুঁজি করে সাধারণ মানুষের রক্তকে পুঁজি করে আপনারা যদি ভেবে থাকেন যে আপনারা উপদেষ্টা হবেন, আপনারা পদ বাগিয়ে নেবেন তাহলে সেটি আপনারা ভুল ভাবছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমরা জানতে চাই কাদের প্রেসক্রিপশনে এই আওয়ামী দোসরদের পুনর্বাসন হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের তাজা রক্ত রাস্তায় ঢেলে দিয়ে, শ্রমিকরা নিজেদের তাজা রক্ত রাস্তায় ঢেলে দিয়ে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান সফল করেছে। কিন্তু আপনারা তাদের সঙ্গে আলোচনা না করে, তাদের অংশীদারত্ব নিশ্চিত না করে কোন অদৃশ্য সিগন্যালে কাদের পুনর্বাসনের ম্যান্ডেট নিয়েছেন। শিক্ষার্থীরা আপনাদের প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রেখে ছাড় দেবে না।’
হাসনাত বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের সঙ্গে, শ্রমিক-জনতার সঙ্গে আপনারা মশকরা করা বন্ধ করেন। আপনারা বিপদে পড়বেন। আওয়ামী পুনর্বাসন হবে আর আপনারা বলবেন শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসবে এই দিন আর বেশি দিন থাকবে না। আপনাদের সেফ করার জন্য শিক্ষার্থীরা আর রাস্তায় আসবে না। প্রয়োজনে আপনাদের বিকল্প খুঁজে নিতে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় আসবে। ফ্যাসিবাদের যারা দোসর, ফ্যাসিবাদের সঙ্গে যাদের ন্যূনতম সম্পর্ক রয়েছে, কত ১৬ বছর ফ্যাসিবাদের নুন খেয়ে যারা গুণ গেয়েছে, তাদের ২৪-পরবর্তী বাংলাদেশে আমরা কোনো ফরম্যাটেই পুনর্বাসন দেখতে চাই না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ বলেন, ‘আওয়ামী স্বৈরাচারের দোসরদের ক্ষমতায় বসানো হয়েছে, যা জুলাই বিপ্লবের চেতনাবিরোধী। এটা শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করা হয়েছে। অবিলম্বে তাদের নিয়োগ বাতিল করতে হবে। অন্যথায় ছাত্র-জনতা দ্বিতীয় বিপ্লবের পথে হাঁটতে বাধ্য হবে।’
সমন্বয়ক মাহিন সরকার বলেন, ‘যারা বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে ধারণ করে না, ধানম-ি ৩২-কে কাবা মনে করে, তাদের আমরা লাল কার্ড দেখাই। এমন কাউকে আমরা উপদেষ্টা প্যানেলে চাই না। উপদেষ্টা নিয়োগে আঞ্চলিকতাকে ইস্যু করা হচ্ছে। উত্তরবঙ্গ থেকে কোনো উপদেষ্টা নেই, অথচ আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ উত্তরবঙ্গের। এই সরকারের যারা ফ্যাসিবাদের দোসর তাদের অনতিবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে।’
সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, ‘ফ্যাসিস্টের দোসর, সফট আওয়ামী লীগ ও সফট শাহবাগীদের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এর অর্থ হলো আহত ও শহীদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি। উপদেষ্টাদের কাজের স্পষ্টতা থাকতে হবে, নিয়োগ প্রক্রিয়া, দুর্নীতি দমন সবকিছু স্পষ্ট করতে হবে। আপনাদের প্রতি সপ্তাহের কাজের বিবরণী তুলে ধরতে হবে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন উপদেষ্টাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রস্তুত রয়েছে।’
এদিকে গতকাল সচিবালয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রথম দিন যোগ দিয়ে সাংবাদিকদের এক ব্রিফিংয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় কুরুচিপূর্ণ তথ্য শেয়ারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার শিল্প-সংস্কৃতি চর্চায় বাধা হবে না। তবে যারা শিল্পচর্চা করছে তাদেরও সচেতন হতে হবে। কুরুচিপূর্ণ, জঘন্য তথ্য যদি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেন, তাহলে সমস্যা হবে। বিপ্লবের চেতনা বুঝতে হবে। নাটক হচ্ছে, যাত্রা হচ্ছে, কেউ তা বন্ধ করেনি। অন্তর্বর্তী সরকার শিল্প-সংস্কৃতি চর্চায় বাধা হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিগত সরকারের সুবিধাভোগী হিসেবে যা বলা হচ্ছে, এ বিষয়ে কিছু বলার নেই। ২০১৩ সালে আমাকে বলা হতো জামায়াত-শিবির। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে তখন বলেছিলাম, এই চেতনা দিয়ে কী করব। সে সময় আমাকে শিবির বলা হয়েছিল। কেউ মনে করে জামায়াতি, কেউ বিএনপি, কেউ আওয়ামী লীগ। কিন্তু আমি কারও লোক নই। আমি আমার। আমি কারও প্রতি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দিইনি।’
