শিক্ষার্থী-সরকারে বাড়ছে দূরত্ব

  • সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ না থাকায় ক্ষোভ সমন্বয়কদের
  • ৫ দফার অন্য দাবি পূরণ না হওয়ায় হতাশ
  • সরকারের কর্মকাণ্ড অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ: নাগরিক কমিটি
  • অভ্যুত্থানের অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া আহবান
আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০২৪, ০৮:০৩ এএম

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। এতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা। বিগত সরকারের নির্যাতন হুমকি-ধামকি মোকাবিলা করে কাঙ্ক্ষিত বিজয় ছিনিয়ে আনেন তারা। কিন্তু সরকার গঠনের তিন মাস পর কিছু বিষয় নিয়ে দূরত্ব তৈরি হয়েছে ক্ষমতার বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। আর দুই উপদেষ্টার নিয়োগের পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

গত রবিবার উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন ব্যবসায়ী শেখ বশির উদ্দিন এবং চলচ্চিত্র পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। এরপরই তাদের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। প্রশ্ন উঠে এসব সিদ্ধান্ত আসছে কোথায় থেকে, কারা নেয় এসব সিদ্ধান্ত। আন্দোলনকারী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করাও জানেন না এসব সিদ্ধান্তের বিষয়ে। গত সোমবার প্রতিবাদ কর্মসূচিও পালন করেন তারা।

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার ঢাবির টিএসসিতে ‘উত্তরবঙ্গের সাধারণ ছাত্র-জনতা’র ব্যানারে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে সরকারের কাছে তিন দফা দাবি জানায় শিক্ষার্থীরা। দাবিগুলো হলো- সুষম উন্নয়ন ও অর্ন্তভুক্তিমূলক নীতি প্রণয়নে উত্তরবঙ্গের দুই বিভাগ থেকে কমপক্ষে ২ জন করে ৪ জন উপদেষ্টা নিয়োগ করতে হবে; সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আমলা ও কর্মকর্তা নিয়োগে আঞ্চলিক বৈষম্য করা যাবে না। সেই সঙ্গে প্রত্যেক উপদেষ্টার কার্যক্রমের অগ্রগতি সাপ্তাহিক জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে; বিতর্কিত ও জুলাই বিপ্লবকে ধারণ করে না, এমন কোনো উপদেষ্টাকে অন্তর্বর্তী সরকারে রাখা যাবে না ও পলিসি প্রণয়নে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতাদের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা বলছেন, সরকারে দুজন ছাত্র প্রতিনিধি থাকলেও ছাত্রদের সেখানে অংশগ্রহণ নেই। কার পরামর্শে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিরোধী সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে সেটাও তাদের জানা নেই। উপদেষ্টা নিয়োগের পর এত বিতর্ক, সমালোচনা হওয়ার পরও সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া না যাওয়ায়ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। এছাড়া সরকারের কাছে ৫ দফা দাবি জানালেও শুধুমাত্র এক দফা পূরণ হওয়ায়ও ক্ষোভ-অসন্তোষ রয়েছে বলে মনে করেন আন্দোলনকারীদের কেউ কেউ। তাদের দাবি, দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র ঘোষণা, রাষ্ট্রপতির অপসারণ, সংবিধান সংশোধনসহ অন্যান্য বিষয়গুলোতে সরকার আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে পারতো।

অন্তর্বর্তী সরকারে উপদেষ্টা নিয়োগের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বৈষম্য করা হচ্ছে অভিযোগ এনে সমন্বয়ক মাহিন সরকার, আমাদের ব্যানারের নাম ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। যদি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে আবারও বৈষম্য করা হয়, যারা বৈষম্য সৃষ্টি করবে, যে সরকারই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে চ্যালেঞ্জ জানাবে, আমরা তাদেরকে টেনে নামাব। দুইদিন আগে আপনারা (সরকার) যে উপদেষ্টাকে নিয়োগ দিলেন, বিতর্কিত ব্যক্তিদের শপথ পড়ালেন তার ম্যান্ডেট কে দিয়েছে! এই সরকার যদি জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া কোনো প্রকার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে এই সরকারকে যেমন ভালোবেসে আদর করে বসানো হয়েছে ঠিক তেমনি টেনে নামাতেও আমাদের সময় লাগবে না।

সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা যে ৫ দফা দাবি জানিয়েছিলাম সেখানে শুধু এক দফা পূরণ হয়েছে। আমরা আমাদের মতো কাজ করছি, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো ভূমিকা দেখা না যাওয়ায় হয়তো আলোর মুখ দেখছে না। এছাড়া সর্বশেষ কিছু সিদ্ধান্তে আমাদের একদমই বাইরে রাখা হয়েছে। আমরা জানি না কাদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র অধিকার পরিষদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, উপদেষ্টা নিয়োগ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তারা বিতর্কিত লোকদেরকে নিয়োগের মাধ্যমে আমাদেরকে হতাশ করেছে। কোন যোগ্যতায়, কোন প্যারামিটার ব্যবহার করে এমন বিতর্কিত লোকদেরকে উপদেষ্টা প্যানেলে যুক্ত করেছে সেটা তারা পরিষ্কার করেনি। সারাদেশে এটার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানানোর পরেও বর্তমান সরকার এই বিষয়ে জাতির সামনে কোনো বিবৃতি বা বক্তব্য দেয়নি। তারা যদি এভাবে গায়ের জোরে চলতে চায় তাহলে শিগগিরই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন।

তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিল বৈষম্যহীন একটি বাংলাদেশ বিনির্মাণে জন্য। কিন্তু এই সরকার সেই পথে হাঁটছে না। সরকারের কাছে অনুরোধ করবো আপনারা মতাদর্শগত বৈষম্য ও আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করেন। জনসাধারণের সেন্টিমেন্ট বুঝে সিদ্ধান্ত নিন। আওয়ামী লীগের দোসরদেরকে পুনর্বাসনের পথ বন্ধ করুন। দেশে একটি উপযুক্ত নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করুন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক রিফাত রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, উপদেষ্টা পরিষদে মুজিববাদীদের জায়গা দেওয়া আমাদের হতাশ করেছে। যেটা কোনোভাবেই জুলাই অভ্যুত্থানের সঙ্গে যায় না। এর মাধ্যমে আমরা আশাহত হয়েছি এবং কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবাদও জানিয়েছি। যে এক দফার মাধ্যমে শেখ হাসিনার পতন এবং ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ হয়েছিল সে আকাঙ্ক্ষা ধরে রাখার দাবি জানাচ্ছি আমরা। তারা যদি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার বিরোধী হয় তাহলে আমরা এই সরকারের প্রতি আরও কঠোর আচরণ করতে বাধ্য হব।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সমন্বয়ক দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারের কিছু বিষয়ে আমরা খুবই আশাহত। সিদ্ধান্ত গ্রহণে শুরুতে আমাদের যেমন প্রাধান্য ছিল সেটা এখন নেই। কোথা থেকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় আমরা জানি না। আমরা দাবি জানিয়েছি- উপদেষ্টাসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে যারা সরাসরি অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেছে তাদের রাখার জন্য। কিন্তু সরকার এসব থোড়াই কেয়ার করছেন। অন্যদিকে এখনো পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি অপসারণ কিংবা সংবিধানের সংশোধনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পোঁছাতে পারেনি তারা। উল্টো এক সময়ের আওয়ামীপন্থীদের নিয়োগ দিয়ে জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি করা হচ্ছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়লে জুলাই অভ্যুত্থানের জন আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা সহজ হবে বলে আমি মনে করি।

গত সোমবার ছাত্র জনতার অংশীদারত্বহীন সিদ্ধান্তে উপদেষ্টা নিয়োগ এবং এতে ফ্যাসিবাদী দোসরদের স্থান দিয়ে শহীদের রক্তের অবমাননার অভিযোগে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এসময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ৫ জুন থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনের সবচেয়ে বড় আইনি হলো তিন মাস পরেও হাসিনার বিচার চাইতে হয়। ধানমন্ডি ৩২-কে আদর্শ মনে করা লোকদের উপদেষ্টা দেওয়া হয়। আমরা খুনি হাসিনাকে উৎখাত করেছি, তার লিগ্যাসি রক্ষার জন্য না। যাদের সাথে ফ্যাসিবাদের দূরতম সম্পর্ক রয়েছে তাদেরকে সরকারে দেখতে চাই না।

সরকারের সঙ্গে আপনাদের দূরত্ব বাড়ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, সরকারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কাছাকাছি না। আমরা প্রায় সবকিছু গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানি। সরকার সরকারের মতো কাজ করছে, আমরা আমাদের মতো। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং  নাগরিক কমিটি প্রেশার গ্রুপ হিসেবে কাজ করছে। সরকারের যেকোনো নেতিবাচক কর্মকাণ্ড নিয়ে আমরা প্রতিবাদ জানাব।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সাম্প্রতিক কিছু কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতীয় নাগরিক কমিটি।

কমিটির মুখপাত্র সামান্তা শারমিনের পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সাম্প্রতিককালে অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু কার্যক্রমে জাতীয় নাগরিক কমিটি উদ্বিগ্ন। জুলাই অভ্যুত্থানে যে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্বের আহ্বান জানানো হয়েছিল- সরকারের বর্তমান কর্মকাণ্ডে তা অনেকাংশেই প্রতিফলিত হচ্ছে না। উপদেষ্টা নিয়োগসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সঠিক ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় এবং অভ্যুত্থানের অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শের ভিত্তিতে গ্রহণ করা হচ্ছে না বলে আমরা মনে করি। অভ্যুত্থানের অংশীজনদের মতামত এবং পরামর্শকে গুরুত্ব না দিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।’

তিনি বলেন, ‘সুতরাং, আমরা জাতীয় নাগরিক কমিটি, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে ভবিষ্যতে অভ্যুত্থানের অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, গণঅভ্যুত্থানে যারা মূল অংশীজন তাদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না এলে সেটি খুব বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। এজন্য সব ধরনের অংশীজনের মতামত নেওয়া জরুরি। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ সঞ্চার হলে সেটি বর্তমান সরকারের জন্য ভালো হবে না। জুলাই অভ্যুত্থান এবং শিক্ষার্থীদের সেন্টিমেন্টকে সামনে রেখেই সিদ্ধান্ত আসা উত্তম হবে বলে আমি মনে করি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত