শব্দে শব্দে তথ্য, বেদনা আর ওয়াদা

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২৪, ০৪:০৫ এএম

কথা প্রায় আগেরগুলোই। তবে, এবার মানে একশ দিনের শাসন উপলক্ষে দেওয়া ভাষণের কথাবার্তা আগের চেয়ে পরিষ্কার। কিছুটা চাঁছাছিলাও। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তার কিছু যন্ত্রণার কথাও বলেছেন। পতিত শক্তি তাকে নানা ষড়যন্ত্রে ব্যর্থ করতে চায়, এ কথা আগে এভাবে বলেননি। বলেছেন বলে নিস্তার পেয়ে গেছেন? মোটেই না। এ সরকারকে ব্যর্থ করতে তার মাথা ও ঘাড়ের ওপর ঘুরতে থাকা যন্ত্রগুলো কেবল মোকাবিলা নয়, জনপ্রত্যাশাও পূরণ করতে হবে। ষড়যন্ত্রের শিরোমণির বিচার, সংস্কার, নির্বাচনসহ তার কাজের ভলিউম বিশাল। সেইসঙ্গে গণআন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা, তাদের কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আয়ত্তে আনা, প্রশাসন ঠিক করা, নিত্যপণ্যের বাজারের আগুন নেভানোসহ কাজের লিস্ট বড় দীর্ঘ। এগুলোর একটিও পাশ কাটানোর সুযোগ নেই তার।

কেবল ছয়যন্ত্র (ষড়যন্ত্র) নয়, আরও নানান যন্ত্রের ফেরে পড়ে গেছেন ডক্টর ইউনূস। ছাত্রনেতাদের বড় অংশটা যাদের তিনি ক্ষমতার পাটাতন বলেছিলেন তারাও এখন ক্ষমতার অংশীদারত্ব চেয়ে আরেকটা যান্ত্রিকতায় ফেলেছেন তাকে। তারা এখন অন্য উপদেষ্টাদের বিষয়ে প্রশ্ন তুলছেন, জানতে চাচ্ছেন তাদের ভূমিকা কী ছিল? আরেক দিকে, সরকারের ভেতর দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার লোভ ঢুকে পড়েছে বলে অভিযোগ ছুড়ছে আন্দোলনের কিছু কিছু অংশীজনও। সরকারের কার্যক্রম নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তৈরি হওয়া সন্দেহ গণ-অভ্যুত্থানের চাওয়ার বাইরে কিছু ইস্যু এনে সরকারের বোঝা ভারী করে দিচ্ছে। নিত্যপণ্যের দাম, বাজার নিয়ন্ত্রণ, পল্লীবিদ্যুতের অনিয়ম বন্ধের চেয়ে শহুরে মানুষের ড্রইংরুমের ইস্যুর ব্যস্ততা বাড়িয়ে সমালোচনার পাল্লা ভারী করে দেওয়া হচ্ছে। এগুলোর একটিও ফরজ কাজ নয়। নফলের পর্যায়েও নয়। 

অন্তর্বর্তী সরকারের কাজের পরিসর আরও অনেক দূর। পতিত শক্তির নানান ষড়যন্ত্র রুখতে হচ্ছে। এবারের ভাষণেও এর ছাপ আছে। ড. ইউনূস বলেছেন, ‘হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরত চাইব, ১৫ বছরের সব অপকর্মের বিচার করব। শুধু জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডই নয়, গত ১৫ বছরের সব অপকর্মের বিচার করব।’ এটি যা তা কথা নয়। কথার কথাও নয়। জাতির কাছে অঙ্গীকার। ভাষণের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদ এবং গত জুলাই-আগস্ট মাসে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার অভ্যুত্থানে নিহতদের স্মরণ করে ড. ইউনূস বলেন, ‘আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম ১০০ দিন অতিক্রম করলাম। আপনারা জানেন কী কঠিন এক পরিস্থিতিতে আমাদের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়েছে। ছাত্র-শ্রমিক-জনতার অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের পর ফ্যাসিস্ট সরকারপ্রধান পালিয়ে গেলে দেশ সরকারশূন্য হয় সাময়িকভাবে। পুলিশ প্রশাসনও এ সময় সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে উদ্বেগজনক এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্বৈরশাসনে বিপর্যস্ত এই দেশকে আমাদের সবাইকে মিলে পুনর্গঠন করতে হচ্ছে।’

এ বক্তব্য ও বক্তব্যের প্রতিটি শব্দ এক একটি তথ্য, বেদনা; এরপর ওয়াদা। জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পর আমরা এমন একটি দেশ হাতে পেয়েছি যার সর্বত্র ছিল বিশৃঙ্খলা। স্বৈরশাসন টিকিয়ে রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিপ্লব চলাকালে প্রায় দেড় হাজার ছাত্র-শ্রমিক-জনতার শহীদি মৃত্যু হয়। মৃত্যুগুলোর তথ্য এখনো অসম্পূর্ণ। এই বিপ্লবে আহত হয়েছে ১৯ হাজার ৯৩১ জন। আহতদের জন্য ঢাকার ১৩টি হাসপাতালসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে। তা মোটেই পর্যাপ্ত নয়। আহতদের কাতরানি এবং তাদের চিকিৎসা খরচ টানতে গিয়ে পরিবারগুলোর করুণ অবস্থা। গুম কমিশনের সদস্যদের কাছে ভুক্তভোগীদের বিবরণ গা শিউরে ওঠার মতো। অক্টোবর পর্যন্ত গুম কমিশন ১ হাজার ৬০০ গুমের তথ্য পেয়েছে। তাদের ধারণা, এ সংখ্যা সাড়ে তিন হাজার ছাড়িয়ে যাবে। অনেকের কমিশনের কাছে গুমের অভিযোগ করতে ভয় পাওয়ার কথা এসেছে ড. ইউনূসের ভাষণেও। এ ভয়ের কারণ, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দ্বারা তারা আবার আক্রান্ত হতে পারেন, ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন এ ভয় তাড়া করছে। সেই ভয় তাড়ানো এবং বিচারের ভারও এখন সরকারের ওপর। এসব ছাপিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে নির্বাচন সবচেয়ে জরুরি। তাদের কথার জবাবও দিতে হচ্ছে ড. ইউনূসকে। প্রয়োজনীয় কিছু সংস্কার শেষে নির্বাচন আয়োজন করার কথা আবার জানিয়েছেন তিনি। তার ভাষায় ‘নির্বাচনের ট্রেন যাত্রা শুরু করেছে, এটা আর থামবে না। যদিও সংস্কারের জন্য নির্বাচন কয়েক মাস বিলম্ব করা যেতে পারে। তবে যেতে যেতে আমাদের অনেকগুলো কাজ সেরে ফেলতে হবে। এ ট্রেন শেষ স্টেশনে কখন পৌঁছাবে, তা নির্ভর করবে কত তাড়াতাড়ি আমরা তার জন্য রেললাইনগুলো বসিয়ে দিতে পারি আর তা হবে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের মাধ্যমে।’ একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা তার সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ড. ইউনূস আশা করেন, ‘ডিসেম্বর-জানুয়ারির মধ্যেই সংস্কার কমিশনগুলো তাদের সুপারিশমালা সরকারের কাছে পেশ করতে পারবে। তাদের সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ক্রমাগতভাবে আলোচনায় সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতেই তারা সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করবেন।’

সংস্কারের বিষয়টি বেশি প্রায়োরিটি প্রকাশ পেয়েছে তার বক্তব্যে। সংস্কারকে পাশ কাটিয়ে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ‘নির্বাচনের কথা বলার সঙ্গে নির্বাচন ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সংস্কারের কথাটিও বলুন। সংস্কার হলো জাতির দীর্ঘমেয়াদি জীবনীশক্তি। নির্বাচন ছাড়া আরও গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করার ব্যাপারে ঐকমত্য গঠনের জন্য অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হতে পারে। নির্বাচনের আয়োজন চলাকালে কিছু সংস্কার হতে পারে।’ নির্বাচন বিলম্বের এ বার্তা বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের কাছে পছন্দ নয়। তারা চায় দ্রুত নির্বাচন। নির্বাচনের পর সংস্কারের কাজ তারাই করবেন। চিন্তা ও বোধের সূক্ষ্ম এ ব্যবধান কীভাবে অবসান হবে সেই জিজ্ঞাসা অবধারিতভাবে এখন মুখ্য হয়ে উঠেছে।

সংস্কার প্রশ্নে কিছু আগাম হতাশা ছিল প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে। ‘আমি নিশ্চিত নই, সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের সুযোগ আমরা কতটুকু পাব। তবে আপনারা সুযোগ দিলে প্রয়োজনীয় কিছু অত্যাবশ্যকীয় সংস্কারকাজ শেষেই কাক্সিক্ষত নির্বাচন আয়োজন করব’ এ কথার মধ্যে কিছু ভিন্ন আভাস বোধ করছেন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের কেউ কেউ। পরাজিত শক্তির নানা কৌশলে ক্রিয়াকর্মের কথাও এসেছে ভাষণে। তিনি বলেন, ‘এ সরকারকে ব্যর্থ করার জন্য, অকার্যকর করার জন্য বিশাল অর্থে বিশ্বব্যাপী এবং দেশের প্রতিটি স্থানে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে এক মহাপরিকল্পনা প্রতি মুহূর্তে কার্যকর রয়েছে। তাদের কিছুতেই সফল হতে দেবেন না।’ এর আগে কোনো বক্তব্য বা ভাষণে এভাবে আসেনি বিতাড়িত শক্তির কথা। একই সঙ্গে তিনি পতিত সরকার ও তার দোসরদের প্রতি বছর দেশ থেকে ১২-১৫ বিলিয়ন ডলার পাচারের কথা উল্লেখ করে জানান, এ অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য সম্ভব সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কাজে সফল হতে পারলে অর্থনীতি আরও গতি পাবে। নিশ্চয়তা দিয়ে বলেছেন, একটা মজবুত অর্থনীতি দিয়ে যাবেন। যাতে ভবিষ্যতে চলার পথ সহজগম্য হবে।

ভাষণে অর্থনৈতিক অবস্থার কথাও এসেছে। তার ভাষায় ‘পতিত সরকার আমাদের জন্য যে ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি রেখে গেছে তাতে রাজস্ব আদায়ে গতি আনতে হিমশিম খেতে হচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে। এর মধ্যেও জুলাইয়ের নেতিবাচক অবস্থা থেকে অক্টোবর নাগাদ রাজস্ব আদায়ে পৌনে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। আগের অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বিপুল রাজস্ব ঘাটতি ছিল। যে কারণে এবার শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অনেক বেড়ে যায়। এর ফলে স্বৈরাচার পতনের পরবর্তী তিন মাসে পৌনে ৯ শতাংশ রাজস্ব বৃদ্ধির পরও লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২৩ শতাংশের বেশি ঘাটতি থেকে যায়।’ এক পর্যায়ে যোগ করেন ‘আমাদের বন্ধুদের কাছ থেকে যে সাহায্যের আয়োজন হয়েছে এখনো তা আসা শুরু করেনি। বন্ধু রাষ্ট্রগুলো শুধু যে আমাদের বড় বড় অঙ্কের সাহায্য নিয়ে আসছে তাই নয়, এই সাহায্য দ্রুততম সময়ে আসা শুরু করবে এই প্রতিশ্রুতিও তারা আমাকে দিয়েছে। এই সাহায্য আসা শুরু করলে আমাদের অর্থনীতি অত্যন্ত মজবুত এবং আকর্ষণীয় অর্থনীতিতে পরিণত হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও নানা রকম বিনিয়োগে উৎসাহিত হয়ে এগিয়ে আসবে।’ কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে বিদেশিরা তো আর এমনি এমনি সাহায্যে করে না, তাদের বিনিয়োগ লাভজনক বিবেচিত হলে তবেই তারা এগিয়ে আসবে। আর এই লাভজনক বিনিয়োগের প্রথম শর্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কোনো ব্যক্তিবিশেষ নয়। 

গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক প্রায় সব কথাই এসেছে প্রধান উপদেষ্টার এবারের ভাষণে। কিন্তু, শাসন-প্রশাসনের কথা কম। ভাষণ এ দেশে আলোচিত হওয়ার রেকর্ড আছে, শাসনে তা নয়। দলীয় লুটেরাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করা কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত ব্যবস্থাকে সিভিল সার্ভিস বলা যাবে কি না এমন প্রশ্ন ঘুরছে। এ সার্ভিসটি একটি ভঙ্গুর সার্ভিস। তা সিভিল সার্ভিস নামের অর্থ বহন করে না। সময়ে সময়ে এ নিয়ে কথা হয়েছে। কখনো কখনো কমিশনও হয়েছে। ১৯৮৩ সালে এরশাদ সরকারের আমলে প্রণীত ‘এনাম কমিটির’ সুপারিশ ও জনবল কাঠামো অনুযায়ী চলছে প্রায় সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তর। গত ৪১ বছরে জনবল কাঠামো হালনাগাদ করতে পারেনি সরকারের মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো।

পুরনো কাঠামো দিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা এখন প্রায় অসম্ভব। যে যত কথাই বলুক সংস্কার বা ভালো হওয়ার জন্য সময়-সুযোগ দুটোই লাগে। কখনো সময় আসে, সুযোগ আসে না। আবার কখনো সুযোগ আসে কিন্তু সময় কুলায় না। হালে সংস্কারের একটি মোক্ষম সময় পার হচ্ছে। ইউনূস সরকার একটি কার্যকর সময়োপযোগী কমিশন করে সিভিল সার্ভিসকে পুনর্গঠন করতে না পারলে সেই সুযোগ আর কখনো ধরা দেবে কি-না সন্দেহ। তা না করলে এ সরকারের ব্যর্থ হওয়ার জন্য বেশি সময় লাগবে না এমন ভবিষ্যদ্বাণীও কারও কারও।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত