বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের সাবেক এমপি মো. শরীফুল ইসলাম জিন্নাহর স্ত্রী মোহসীনা আক্তার গৃহিণী হলেও বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক। কোনো আয় না থাকলেও আয়কর দিয়ে ৭০ লাখ কালো টাকা সাদা করেছেন। প্রবাসী ভাইয়ের নামে রেমিট্যান্স দেখিয়েছেন ৪৫ লাখের বেশি। স্বামীর অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকায় তিনি সম্পদের মালিকানা অর্জন করেছেন। অথচ জিন্নাহর অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদন করেছিলেন মোহসীনা আক্তার। এতসব ছলচাতুরী করেও শেষ রক্ষা হচ্ছে না তার। সংস্থাটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে স্বামী জিন্নাহর দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় তাদের দুজনের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে। মামলার তদন্তও শেষপর্যায়ে। শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে বিচারিক আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে। স্বামীর দুর্নীতির টাকায় অবৈধ সম্পদ অর্জন করায় দুদকে আবেদন করেও শেষ রক্ষা হচ্ছে না এমপিপত্নী মোহসীনার। দুদক থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
দুদকের তথ্যমতে, ২০১৯ সালে দুদকে সাবেক এমপি মো. শরীফুল জিন্নাহর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে জমা পড়ে। কমিশন অভিযোগটি অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দুদকের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলমকে নিয়োগ দেন। তিনি দীর্ঘদিন অনুসন্ধান শেষে ২০২১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি শরীফুল ইসলাম জিন্নাহর বিরুদ্ধে মামলা (মামলা নম্বর-১) করেন। মামলার এজাহারে জিন্নাহর বিরুদ্ধে ৮৯ লাখ ২৭ হাজার ৫৫৮ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনসহ ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭৮ হাজার ১১৩ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। বর্তমানে দুদকের সহকারী পরিচালক নূরুল ইসলাম মামলাটি তদন্ত করছেন।
দুদকের অনুসন্ধান সূত্রে জানা গেছে, শরীফুল জিন্নাহর বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শুরুর পর স্বামীর অবৈধ আয়কে বৈধ করতে তার স্ত্রী মোহসীনা আক্তার ২০১৯-২০ অর্থবছরে একটি আয়কর নথি খোলেন। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানকালে মোহসীনা আক্তারের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথ্য পেলে তার সম্পদের হিসাব দাখিলের জন্য নোটিস পাঠানো হয়। দুদকের উপপরিচালক অজয় কুমার সাহা এ নোটিস পাঠান। ওই নোটিস পেয়ে তিনি ২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি দুদকে সম্পদ বিবরণী দাখিল করেন। সম্পদ বিবরণীতে তিনি ২ কোটি ৩৫ লাখ ৭২ হাজার ৯৯৭ টাকার সম্পদ অর্জনের ঘোষণা দেন। কিন্তু দুদকের অনুসন্ধানে তার মালিকানায় থাকা ২ কোটি ৪০ লাখ ৩৯ হাজার ১৩৯ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, পারিবারিক ব্যয়, আয়করসহ ২ কোটি ৬১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭২ টাকা অর্জনের তথ্য পাওয়া যায়।
অনুসন্ধান সূত্রে আরও জানা গেছে, মোহসীনা আক্তার একজন গৃহিণী। তার আয়ের কোনো উৎস নেই। সম্পদ বিবরণী অনুযায়ী, তিনি ১৫ লাখ ৮৮ হাজার ৬০৯ টাকা আয়কর দিয়েছেন। তিনি সৌদিপ্রবাসী ভাইয়ের কাছ থেকে ৪৫ লাখ ৭২ হাজার ৭৩ টাকা পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাই এসব টাকা তাকে কীজন্য দান করেছেন, সৌদিপ্রবাসী একজনের পক্ষে এত টাকা দান করা সম্ভব কি না, তার কোনো রেকর্ডপত্র দেখাতে পারেননি। দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে তিনি স্বামীর অবৈধ আয়কে বৈধ করতে আয়কর নথি খোলেন। স্বামীর অবৈধ আয়কে বৈধতা সহায়তা প্রদান, সম্পদের তথ্য গোপন, স্থানান্তর, রূপান্তর ও হস্তান্তরের মাধ্যমে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। এ কারণে মোহসীনা আক্তার ও তার স্বামী শরীফুল জিন্নাহর বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা করা হয়। দুদকের উপপরিচালক অজয় কুমার সাহা বাদী হয়ে ২০২২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মামলাটি করেন।
দুর্নীতি থেকে অব্যাহতি চেয়ে দুদকে চিঠি : ২০২২ সালের ২১ আগস্ট দুদকের অনুসন্ধান চলাকালে মোহসীনা আক্তার স্বামীর দুর্নীতির অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়ে সংস্থাটির চেয়ারম্যান, কমিশনার ও মহাপরিচালকের কাছে লিখিত আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, তিনি বগুড়ায় ধান, চাল ও রাখি মালামালের ব্যবসা করেন। তার স্বামী একজন সংসদ সদস্য। তার নামে ইটভাটা আছে। তিনি ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্সসহ রেকর্ডপত্র দেন। তার ভাই আমেরিকায় থাকেন। তিনি ভাইয়ের কাছ থেকে ২০২০ সালে ব্যাংকিং চ্যানেলে ৪৫ লাখ ৭২ হাজার ৭৩ টাকা রেমিট্যান্স পেয়েছেন। এ ছাড়া তিনি ২০২০-২১ অর্থবছরে আয়কর দিয়ে অপ্রদর্শিত ৭০ লাখ টাকা সাদা করেছেন। আয়কর আইন অনুযায়ী এ টাকার বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না। তারপরও দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা এ বিষয়ে তাকে বক্তব্য প্রদানের কোনোরূপ সুযোগ দেয়নি। তিনি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন বলে আশঙ্কা রয়েছে।
আবেদনে আরও বলা হয়, তিনি একজন বয়স্ক নারী। তার স্বামী দুবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯০ সালে নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন। তার বয়স, সামাজিক মর্যাদা ও আয়কর আইন বিবেচনায় আয়কর নথিতে প্রদর্শিত আয়ের উৎস বিবেচনা করে তাকে অভিযোগ থেকে দায়মুক্ত প্রদানের ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, সাবেক এমপি জিন্নাহ ও তার স্ত্রীর মোহসীনা আক্তারের অভিযোগ অনুসন্ধানকালে বিভিন্ন দপ্তর থেকে রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়। এসব রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা শেষে ২ কোটি ৬১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭২ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০২২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এর আগে ২০২১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সাবেক এমপি জিন্নাহর বিরুদ্ধে ৮৯ লাখ ২৭ হাজার ৫৫৮ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনসহ ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭৮ হাজার ১১৩ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে একটি মামলা করা হয়। দুজন কর্মকর্তা মামলা দুটির তদন্ত করছেন। তারা ইতিমধ্যে মামলার তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দিতে কমিশনে উপস্থাপন করেছিলেন। কমিশন অধিকতর তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দিয়েছে। শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দিতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। কমিশন অনুমোদন দিলেই আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে।
শরীফুল জিন্নাহ ও তার স্ত্রীর সম্পদ বেড়েছে : ২০০৯ সালের শরীফুল জিন্নাহ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন। ওই সময় তার বছরে আয় ছিল ৩ লাখ ৫২ হাজার টাকা, যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ লাখে। তখন তার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ২২ লাখ ৬২ হাজার ৯৫৫ টাকার। সর্বশেষ নির্বাচনী হলফনামায় সব মিলিয়ে ৫ কোটি ২৯ লাখ ৪১ হাজার টাকার মালিক। শরীফুল জিন্নাহ আওয়ামী লীগের জোট হয়ে ২০১৪ সালে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৮ ও ২০২৪ সালে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এমপি হওয়ার পর নিজের ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিকানা অর্জন করেন।
অভিযোগ রয়েছে, শরীফুল জিন্নাহর দেড় বিঘা কৃষিজমি ছিল, যা বেড়ে হয়েছে ৫০ বিঘা। যার মূল্য ৪৫ লাখ ৫০ হাজার ১৫০ টাকা। পিছিয়ে নেই তার স্ত্রীও। তার ৭ শতাংশ কৃষিজমি বেড়ে হয়েছে ৫ বিঘা। মূল্য দেখানো হয়েছে ২৭ লাখ ১১ হাজার ৮০০ টাকা। জিন্নাহর নামে ১ কোটি ৮৯ লাখ ৬১ হাজার টাকা মূল্যের দুটি ভবন এবং ১৫ লাখ ৯২ হাজার টাকার একটি ফ্ল্যাট আছে। সব মিলিয়ে শরীফুল জিন্নাহ ও তার পরিবার এখন শতকোটি টাকার মালিক। নামে-বেনামে ১০০ বিঘার ওপরে জমি রয়েছে তার।
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে অ্যাকাডেমিক ভবন নির্মাণ করতে গেলেও জিন্নাহকে ৫ লাখ টাকা করে দিতে হয়েছে। টাকা না দিলে সেই প্রতিষ্ঠানকে ভবন দেওয়া হয়নি। উপজেলায় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তিনি কম দামে ল্যাম্পপোস্টের সৌরবিদ্যুৎ কিনে কোটি কোটি টাকার বিল করে আত্মসাৎ করেছেন। বর্তমানে বেশিরভাগ সড়কে সৌরবিদ্যুৎ অকেজো পড়ে আছে। এ ছাড়া টিআর-কাবিখার বরাদ্দ নিয়েও অভিযোগের শেষ নেই। কোনো প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের জন্য টাকা বা টিআর-কাবিখার চাল ও গম বরাদ্দর প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে তা দেননি। এভাবে তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। দুদকের তদন্তে এর সত্যতা পাওয়া গেছে।
গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে শরীফুল ইসলাম জিন্নাহর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। এ কারণে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শরীফুল জিন্নাহর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা : সাবেক এমপি শরীফুল ইসলাম জিন্নাহর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আদালত। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগরের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন গত ১ অক্টোবর এ আদেশ দেন। দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মীর আহমেদ আলী সালাম গণমাধ্যমকে বলেছেন, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে শরীফুল ইসলাম জিন্নাহর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তিনি পালিয়ে যেতে পারেন বলে দুদক জানতে পেরেছে। এজন্য তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আদালতে আবেদন করা হয়। আদালত আবেদন মঞ্জুর করে।
