৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে যেকোনো প্রকল্পের অনুমোদনে সম্ভাব্যতা যাচাই বাধ্যতামূলক। তবে দেশের জ্বালানি সংকটের সময় গ্যাসকূপ খননে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই থেকে অব্যাহতি চেয়ে পরিকল্পনা কমিশনে চিঠি দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম সম্প্রতি পরিকল্পনা বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ অব্যাহতির আবেদন করেছেন।
পরিকল্পনা কমিশনের জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী, ৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে প্রাক্কলিত ব্যয়ের সব বিনিয়োগ প্রকল্প গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ, নিরপেক্ষ ও পেশাদারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি পরামর্শক কর্তৃক আবশ্যিকভাবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে এবং নির্ধারিত ছকে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রতিবেদন প্রণয়ন করতে হবে।
প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে সমীক্ষা যাচাইয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে পরিকল্পনা কমিশনের পরিপত্রে আরও বলা হয়েছে, প্রতিবেদনের সুপারিশ ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ (নির্বাহী সার-সংক্ষেপ, ব্যয় প্রাক্কলন, ডিজাইন/কনসেপচুয়াল ডিজাইন ইত্যাদি) প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। এছাড়া, প্রকল্পের গুরুত্ব/প্রকৃতি বিবেচনায় ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত প্রাক্কলিত ব্যয়ের বিনিয়োগ প্রকল্প গ্রহণের আগেও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে।
তবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব তার চিঠিতে পাঁচটি কূপ খনন প্রকল্পে ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি বা সমীক্ষা যাচাই থেকে অব্যাহতি চেয়ে এ চিঠি দিয়েছেন।
তবে এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রথমত, দেশে যেহেতু গ্যাস সংকট চলছে, উৎপাদনে আসা দরকার। সেক্ষেত্রে ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি করে সরকার কালক্ষেপণ করতে চাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, এমন কোনো কাজ যেটিতে আর্থিক ব্যয় আছে, সেখানে ঝুঁকিও আছে। সেক্ষেত্রে আর্থিক ব্যয় না করলে সাশ্রয় হবে। তাতে অনুসন্ধান কূপে যাওয়ার ক্ষেত্রে খুব ঝুঁকি সৃষ্টি করবে না বলেই মনে হচ্ছে। এ উদ্যোগ ইতিবাচক।’
তবে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গণহারে ছাড় দেওয়া উচিত নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যেসব গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে সেখানে উত্তোলনের ক্ষেত্রে এমনটি করা যায়, কিন্তু সেটিকে ঢালাওভাবে ছাড় দেওয়া উচিত নয়।’
চিঠিতে মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম লিখেন, বর্তমান সরকার ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৮-২৯ অর্থবছর পর্যন্ত ১০০টি কূপ খননের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সে জন্য এ বিভাগ বর্ণিত অর্থবছরসমূহে ২ডি/৩ডি সাইসমিক জরিপের ৮টি প্রকল্প এবং কূপ খননের ১৫টি প্রকল্পসহ মোট ২৩টি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
পাঁচটি প্রকল্পের ডিপিপির প্রাথমিক রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছে : ১টি মূল্যায়ন কাম উন্নয়ন কূপ (বেগমগঞ্জ-৫) এবং ১টি অনুসন্ধান কূপ (বেগমগঞ্জ-৬) খনন; ১টি মূল্যায়ন কাম অনুসন্ধান কূপ (সুন্দলপুর-৫) এবং ২টি অনুসন্ধান কূপ (সুবর্ণচর-১ ও নোয়াখালী-১) খনন; ১টি মূল্যায়ন কূপ (সেমুতাং-৭) এবং ২টি অনুসন্ধান কূপ (বেগমগঞ্জ-৭ ও চরলক্ষ্যা-১) খনন; ৩টি অনুসন্ধান কূপ (কৈলাশটিলা-১০, রশিদপুর-১৪ ও ডুপিটিলা-২) খনন; এবং তিতাস গ্যাস ফিল্ডে ২টি মূল্যায়ন-কাম-উন্নয়ন কূপ খনন।
পাঁচ প্রকল্পে সম্ভাব্যতা যাচাই থেকে অব্যাহতি চাওয়ার যুক্তি তুলে ধরে সাইফুল ইসলাম লিখেন, ‘অন্যান্য মন্ত্রণালয়, বিভাগ, করপোরেশন বা কোম্পানিগুলোর গৃহীত উন্নয়ন প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করার জন্য পেশাদারি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম-প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পাদনের জন্য অভিজ্ঞ লোকবল না থাকায় কোনো প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান অদ্যাবধি গড়ে ওঠেনি।’
দেশে এক্ষেত্রে পেশাদারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান না গড়ে ওঠাও যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরাও। এ প্রসঙ্গে ড. শামসুল আলম বলেন, প্রথম কারণ হলো আমাদের দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে কোনো উৎসাহই দেয়নি। আমাদের দেশে এক্ষেত্রে কোনো উদ্যোগই নেই, উদ্যোগ থাকলেই তো উদ্যোক্তা গড়ে উঠবে। বাপেক্স জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাদের কিছু উদ্যোগ আছে। কিন্তু বেসরকারি খাতে আমাদের অভিজ্ঞতা খুব ভালো না। তিনটা গ্যাস ফিল্ড পুনর্গঠিত করে জাতীয় গ্যাস ফিল্ড বাপেক্স গঠন করে অথবা তিনটিকেই আরও বেশি সক্ষমতা উন্নয়ন করলে আমাদের যা চাহিদা তা দিয়েই যথেষ্ট। এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের সুযোগ তৈরির কোনো যুক্তি দেখি না।
জ্বালানি উপদেষ্টা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জানিয়ে চিঠিতে বলা হয়, ৩ অক্টোবর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় : ‘‘তৃতীয় পক্ষের দ্বারা ‘সম্ভাব্যতা যাচাই’ সম্পাদনের বাধ্যবাধকতার অব্যাহতি চেয়ে পরিকল্পনা কমিশনে ইতিপূর্বে প্রেরিত পত্রটি পুনরায় পরিকল্পনা কমিশনে বিবেচনার জন্য প্রেরণ করতে হবে।’’
চিঠিতে সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পগুলো গ্রহণের ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। এ প্রক্রিয়ায় একটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্নের ক্ষেত্রে অনেকগুলো ধাপ অনুসরণ করতে হয়। এসব কার্যক্রম অনুসরণ করে চূড়ান্ত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন পেতে ৬-১২ মাস সময়ের প্রয়োজন হয়। তাছাড়া প্রতিটি প্রকল্পের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বাবদ ৩০-৪০ লাখ টাকা ব্যয় হয়।’
জানা গেছে, ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পেট্রোবাংলা অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর জন্য একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর আওতায় ২০২৫ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে ১০০টি নতুন এবং পুরনো কূপ খনন করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
পেট্রোবাংলা বর্তমানে দৈনিক অতিরিক্ত ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর জন্য ৪৮টি অনুসন্ধানমূলক, উন্নয়ন ও সংস্কারপূর্ণ কূপ খননের জন্য আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব কূপের মধ্যে ২৩টির খননকাজ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাপেক্স (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড) পরিচালনা করবে। বাকি ২৫টির কাজ আউটসোর্স করা হবে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে গ্যাসের চাহিদা প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু আমদানিকৃত ৬৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসসহ দৈনিক গড় সরবরাহ মাত্র ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের দৈনিক ঘাটতি রয়েছে দেশে।
২০২৯-৩০ সালের মধ্যে দেশের গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৬ হাজার ৬৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট হবে বলে অনুমান করছে পেট্রোবাংলা। এর মধ্যে ৪ হাজার ৩৫২ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পেট্রোবাংলার একটি নথির বিবরণ অনুযায়ী, এ ব্যবধান পূরণ করতে সরকার অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, অনশোর এবং অফশোর প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে।
