জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী রবি চৌধুরী। নব্বই দশকের শুরু থেকেই শ্রোতা-দর্শকের কাছে জনপ্রিয় তিনি। ক্যারিয়ারের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত শ্রোতাপ্রিয় অজস্র গান উপহার দিয়েছেন। স্টেজ শো ও টিভি অনুষ্ঠান নিয়ে দেশ-বিদেশে নিয়মিত ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে তাকে। পাশাপাশি ১০০ গানের কাজে হাত দিয়েছেন। আজ পর্যন্ত তার ৬৫টি একক অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। অসংখ্য চলচ্চিত্রে প্লে-ব্যাক করেছেন। শুরু হলো তাকে নিয়ে ভিন্ন আমেজের আড্ডা। ছিলেন সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, হেড অব ইভেন্টস অ্যান্ড ব্র্যান্ডিং শিমুল সালাহ্উদ্দিন, সিনিয়র সহ-সম্পাদক দীপংকর দীপক, সহ-সম্পাদক ইমানুল সোহান এবং মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার জাকির আহম্মেদ। ক্যামেরায় ছিলেন কনটেন্ট এডিটর নুরুস সাফা।
কণ্ঠশিল্পী রবি চৌধুরী গানের কথা লেখেন-সুর করেন। ক্যাসেট, সিডি, রেডিও, টেলিভিশন, সিনেমা, নাটক প্রভৃতি মাধ্যমে তার জনপ্রিয় গানের সংখ্যা অজস্র। অন্যদের জন্যও বানিয়েছেন প্রচুর গান। ১৯৯১ সালে সেলেক্সের ব্যানারে তার প্রথম একক অ্যালবাম ‘প্রেম দাও’ প্রকাশিত হয়। এরপরই শ্রোতার নজরে আসেন। বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানান, কর্ণধার মুরাদ ভাইয়ের কাছে। বলেন, তার কাছে সেই সময় আমার লেখা ও সুর করা ‘আমি আজ জেনে গেছি’ ও ‘বেদনার সবটুকু আমাকে দিয়ে’ গান দুটি নিয়ে যাওয়ার পর তিনিই আমাকে ‘প্রেম দাও’ অ্যালবামটি করার সুযোগ দেন। বললেন সেই সময় এই অ্যালবামটি ১০ কোটি টাকা ব্যবসা করেছিল। কথা চলছিল এলোমেলো। শিমুল সালাহ্উদ্দিন আড্ডার চমৎকার ভূমিকা দিলেন। শুরু হলো প্রশ্নোত্তর পর্ব। প্রথমেই তার কাছে জানতে চাওয়া হলো
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : কেমন লাগছে? সবাই তো আপনাকে ঘিরে বসেছেন! হাহাহাহা...
রবি চৌধুরী : অনেক দিন পর এ রকম আড্ডা হচ্ছে। এই মজাটা নব্বই দশকে পেয়েছি। বিনোদন সাংবাদিকদের সঙ্গে তখন একটা আত্মার সম্পর্ক ছিল। (তাপস রায়হানের পিঠে চাপড় দিয়ে মিষ্টি হেসে বললেন এই যে সেই সময়ের তাপস ভাই তো এখনো আছেন। আমি মনে করি, এই প্র্যাকটিসটা থাকা উচিত)।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : সংগীত জগতে আপনার যে পদচারণা, সেই সময় থেকে কমপক্ষে ৩ যুগ পার হয়ে এসেছি। এখন ফিতার ক্যাসেট নেই। সিডির পর ইউটিউব। এতদিন পর এসে, জনপ্রিয়তার সেই সময়টা কীভাবে দেখেন?
রবি চৌধুরী : খুব মিস করি, সেই সময়টা। আসলে আমরা তো ভাগ্যবান। বিশেষ করে, অডিও ক্যাসেটের মাধ্যমে যারা এসেছি। মানুষের ঘরে ঘরে ছবিসহ পৌঁছে গিয়েছিলাম। ক্যাসেটের ওপর যে ছবিটা থাকত, সেটাই ক্রেতারা আগে দেখতেন। এরপর গানের কথার দিকে চোখ রাখতেন। (রবি চৌধুরী তার মোবাইল নিয়ে দেখালেন কীভাবে ক্রেতা দেখতেন! কিছু মেয়ে ভাবত, তাকে বিয়ে করা যা কিনা! হাহাহাহা। যদি একটু প্রেম করা যায়, হ্যালো করা যায়।) সে সময় যে ল্যান্ডফোন ছিল, সেখানে অনেক ছেলেমেয়ে ফোন করতেন। আর সেলিব্রিটিরা তো করতেনই। অপরিচিতরাও করতেন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : কখনো বিরক্ত হননি?
রবি চৌধুরী : না, না। ভালো লাগত। হাঁটার সময় কেউ যদি আমাকে না দেখেন বিশেষ করে কোনো সেলিব্রিটিকে, তাহলে সে ভীষণ কষ্ট পাবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আপনি যে সময়ের তারকা, এতদিনে সেটা অনেকটাই অভ্যস্ততার মধ্যে চলে এসেছে। এই যে এত গান গাইছেন, এখনো সংগীতের সঙ্গেই জড়িয়ে আছেন। জানতে চাইছি, সংগীতে আপনার জীবনে সবচেয়ে বেশি অবদান কারা রেখেছেন? প্রথম ৩ জনের কথা যদি বলেন?
রবি চৌধুরী : প্রথমেই আমি বলব, যার হাতে আমি গান শিখেছি। চট্টগ্রামের সেই ওস্তাদ মরহুম আহমেদ কবীর আজাদ। তিনি চট্টগ্রাম বেতারে গান করতেন, দক্ষিণাঞ্চলের আঞ্চলিক গানের সম্রাট। আর উচ্চাঙ্গ সংগীত তালিম নিয়েছি ওস্তাদ মরহুম আবু বকর সিদ্দিকীর কাছে। যিনি কক্সবাজারে সংগীতায়োজনের শিক্ষক ছিলেন। আরও দুজনের নাম বলতেই হবে। একজন হচ্ছেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী মরহুম খালিদ হাসান মিলু। তিনি আমাকে নিয়ে অনেক স্ট্রাগল করেছেন। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে অডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘সেলেক্স’ আমাকে সুযোগ দেয়। আর টেলিভিশনে প্রথম সুযোগ দিল কারি হাবিবুল্লাহ বেলালি। তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল সৌদি আরবে। যখন ’৮৮ সালে বন্যা হলো, তখন সেখানে গান করতে গেলাম। সেখানের কনস্যুলার জেনারেল মরহুম মুনিরুজ্জামান সাহেব, হাইকমিশনার ছিলেন দিল্লিতে। তিনি আমাকে একটা চাকরি দিলেন। সেই সুবাদেই বেলালি ভাই, কায়কোবাদ ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। তারা গান শুনতে চাইলেন। আমি একটা গজল শোনালাম। ১৯৯১ সালের কথা। বিটিভিতে তখন ‘অন্তরঙ্গ’ নামের একটা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান হতো। উপস্থাপনা করতেন রায়হান গফুর ভাই। প্রযোজনা করতেন লুৎফর রহমান তালুকদার। শুরু করেছিলাম একটা আরবি গান দিয়ে। এ ছাড়া সুরকার খন্দকার নুরুল আলম সাহেবের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। এরপর যখন আমি পরিচিত, তখন পেলাম সুরকার প্রণব ঘোষকে। দাদাকে অনেক মিস করি। তাকে আমি মাইকেল দাদা বলতাম। তিনি তো সবসময় শরীর নাচিয়ে কথা বলতেন। ‘বড় মিঞা, বড় মিঞা’ বলে গান করতেন আর গোবিন্দ ড্যান্স দিতেন। খুব মজা করতেন। আবার একদম কম সময়ে সুর করতেন। সব অসাধারণ। সেই যে, ‘খুব বেশি মনে পড়ে তোমাকে’ গানটা। আহা! তখন তো ইত্যাদি ম্যাগাজিন অনুুষ্ঠানে গান গাওয়া লটারির মতো। সাবাতানির সঙ্গে প্রথম ডুয়েট গান করলাম। তখন সে পপ গায়িকা হিসেবে জনপ্রিয়। আর আমি তো নতুন। ‘ভালোবাসা বহুরূপী তাকে চেনা তো যায় না’, লিটন অধিকারী রিন্টুর কথা আর প্রণব দার সুর। বিটিভির অনেকেই বললেন, ওর গান হয় নাকি? এরপর হানিফ ভাই প্রণব দাকে ফোন করলেন। বললেন ওকে দিয়ে সলো গাওয়াতে চাই। সম্ভবত এটা ’৯৫-৯৬ সালের কথা। প্রথমে গাইলাম, ‘আমি চাই না তোমায় হারাতে...।’ (কাচের টেবিল চাপড়ে শিমুল সালাহ্উদ্দিন গাইলেন দ্বিতীয় লাইন ‘আমার সুখের প্রদীপ নেভাতে’।) কিন্তু এরপর, ‘খুব বেশি মনে পড়ে’ গানটা গাইলাম। হানিফ ভাই চোখ বন্ধ করে পুরো গানটা শুনলেন। এরপর বললেন আমি এই গানটা করব। আমি বললাম, আগের গানটা তো রিদমিক। হানিফ ভাই বললেন অনেকেই বলেছে, তুমি গাইতে পারো না। তাই ‘খুব বেশি মনে পড়ে’ গানটাই করব। সবাই বুঝুক, তুমি গাইতে পারো কি না। এরপর তো গানটা সুপারহিট হলো।
জাকির আহম্মেদ : আপনি ক্লাসিক্যাল মিউজিকে তালিম নিলেন। জনপ্রিয় হলেন আধুনিক গানের শিল্পী হিসেবে...।
রবি চৌধুরী : আমি আধুনিক গানের শিল্পী। কিন্তু গজলের প্রতি ভীষণ দুর্বল। মেহেদি হাসান, গোলাম আলীর গান সবসময় শুনি। আমেরিকার নিউ ইয়র্কে সম্প্রতি ‘গজল সন্ধ্যা’ করে এলাম। সেখানে মৌলিক গজল গানও আছে। (তাপস রায়হান বললেন একটা শোনান না? শিমুল সালাহ্উদ্দিন বললেন- প্লিজ...। রবি চৌধুরী হাত উঁচিয়ে ‘আপ কোয়ি মুঝে সামঝায়ে/ করো তো মে ক্যায়া করো’ গানের ৪ লাইন শোনালেন।) আমি আসলে দুঃখ পাওয়ার দলে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : এই যে অডিও ইন্ডাস্ট্রির বিশাল একটা পরিবর্তন হলো...
রবি চৌধুরী : অর্থনৈতিকভাবে শিল্পীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এক সময় আমরাই অডিও ইন্ডাস্ট্রি লিড করতাম। যে মিলু ভাই আমাকে নিয়ে ঘুরেছে, স্টার বানিয়েছে পরে তার পেমেন্ট ছিল ৩ লাখ। আর আমার ছিল ১০ লাখ।
দীপংকর দীপক : সেই সময়ে আপনার ‘প্রেম দাও নয় বিষ দাও’ অ্যালবামটি কত টাকার ব্যবসা করেছিল?
রবি চৌধুরী : এটা সে সময় ১০ কোটি টাকার ব্যবসা করেছিল। এটা সেলেক্সের মুরাদ ভাইয়ের নিজ মুখে বলা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আপনি রয়্যালিটি কত পেয়েছিলেন?
রবি চৌধুরী : কোনো টাকাই পাইনি। হাহাহাহাহা। এতে কিন্তু কোনো কষ্ট নেই। এর ফলে অন্য মিউজিক কোম্পানির অনেকেই টাকার বস্তা নিয়ে ঘুরেছে। বলেছে গুলশানে ফ্ল্যাট দেবে, গাড়ি দেবে এটাই তো অনেক।
তাপস রায়হান : (মুচকি হেসে) কিছু নিয়েছিলেন?
রবি চৌধুরী : হ্যাঁ, নিয়েছি। আফতাব নগরে নিলাম। সাউন্ডটেকের বাবুল ভাই দিয়েছিলেন। তখন তো ৬ মাস পরপর গাড়ির মডেল পরিবর্তন করতাম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : এখন অডিও ক্যাসেটের দিন নেই। কীভাবে শ্রোতা-দর্শকের কাছে পৌঁছাচ্ছেন?
রবি চৌধুরী : বিশেষ কোনো দিন বা ঈদ ছাড়া টিভিতে অনুষ্ঠান করি না।
জাকির আহম্মেদ : বর্তমানে আপনার মোট অ্যালবামের সংখ্যা কত?
রবি চৌধুরী : একক হচ্ছে ৬৪। আর ডুয়েট, মিক্সড মিলিয়ে ২৫০ হবে।
তাপস রায়হান : আর প্লে-ব্যাক?
রবি চৌধুরী : শুরু করেছিলাম ‘আন্দোলন’ ছবি দিয়ে। মোট ৭০-৮০টা গান হবে।
তাপস রায়হান : আপনি তো ভালো গীতিকবিও?
রবি চৌধুরী : দেশ-বিদেশের অনেকেই আমার লেখা গান গেয়েছেন। আমাদের মনির খান, কলকাতার নচিকেতা, মৃদুলা গেয়েছে।
দীপংকর দীপক : আপনার সংগীত ক্যারিয়ারে সেরা প্রতিদ্বন্দ্বী কাকে মনে হয়েছে?
রবি চৌধুরী : আসলে কাউকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করি না। যে ভালো গান করে, তাকে অ্যাপ্রিসিয়েট করতে জানি। এটা আমার ভালো লাগে। হিংসা ব্যাপারটা আমার মধ্যে নেই। এটা কিন্তু শত্রুরাও বলে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আপনার ১০০ গানের একটা প্রজেক্টের কথা শুনেছি। এটা নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাইছি?
রবি চৌধুরী : অনেক ভক্ত-শ্রোতা আমাকে বলেন অডিওতে আপনার গান পাচ্ছি না কেন? আপনাকে বেশি টিভিতে দেখি না কেন? তাদের জন্যই পুরনো ৫০ হিট গান নতুনভাবে আর নতুন ৫০টি গান নিয়ে একটা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছি।
জাকির আহম্মেদ : গানগুলো কোন কোন গীতিকার লিখেছেন?
রবি চৌধুরী : অনেকেই লিখতে পারে। তবে এর বাণী ভালো লাগতে হবে।
জাকির আহম্মেদ : কেমন লিরিক আপনার ভালো লাগে?
রবি চৌধুরী : এখন তো আর গাজী মাযহারুল আনোয়ার ভাইয়ের মতো গীতিকার পাব না। যেই লিখুক, ভালো লিরিক হলেই হবে।
তাপস রায়হান : আপনি দেশের বাইরে শো করে যাচ্ছেন। কোন কোন দেশে বেশি করছেন?
রবি চৌধুরী : মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশেই করেছি। আমেরিকার অনেক রাজ্যে করেছি। এ ছাড়া কানাডা, ইউরোপের অনেক দেশেই করেছি। (শিমুল সালাহ্উদ্দিন বললেন শুধু অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া! হাহাহাহা।)
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : কোন কোন দেশের মিউজিক ভালো লেগেছে?
রবি চৌধুরী : আমাকে আসলে ঠুমরি খুব টানে। কয়টা বলব? অনেক দেশের।
দীপংকর দীপক : বাংলা ছাড়া কতগুলো ভাষায় গান করেছেন?
রবি চৌধুরী : হিন্দি, উর্দু, আরবি। মালয়েশিয়ার ভাষাসহ ১০-১২টি হবে।
ইমানুল সোহান : বর্তমানে গানে প্রযুক্তির ব্যবহার অনেক। আবার বাজেট বাড়িয়ে মিউজিক ভিডিও করা হয়। তখন আর গানের দিকে মনোযোগ তেমন থাকে না। এই বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
রবি চৌধুরী : ফিল্মে শাকিব খান এত হিট কেন? অভিনয়ের পাশাপাশি উচ্চ বাজেটের ছবি। টেকনিশিয়ান কিন্তু দেশের বাইরের। আমার কিন্তু অটো টিউন দরকার হয় না। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এটা করে। কিন্তু স্টেজে গাইতে গেলে কিন্তু তারা সমস্যায় পড়ে।
দীপংকর দীপক : বর্তমানে ভিউর যুগ চলছে। ভিউ দিয়ে কি শিল্পীকে মূল্যায়ন করা যায়?
রবি চৌধুরী : ‘...বাচ্চা’ বলে কিছু বললে তো ভিউ হবেই। রিয়েল গান শুনে যদি ৫টি ভিউ হয়, তাহলে কিন্তু আমি ৫টি আত্মাকে শান্তি দিতে পারলাম। শ্রোতা যখন বলবেন আহা! এই ‘আহা’ শব্দ না হলে কিন্তু আপনি কোনো শিল্পীই না।
দীপংকর দীপক : কিন্তু ভালো মানের গান তেমন ভিউ হচ্ছে না?
রবি চৌধুরী : নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী কিন্তু বাংলাদেশে একজনই। শাহনাজ রহমত উল্লাহ একজনই হয়। আমার লেখা কথা-সুরের একটা গান বলি। সেখানে চটুল কথা। সেটা হচ্ছে ‘আমি কারও হলে/ তোমার কেনো জ¦লে বন্ধু /তোমার কেনো জ¦লে।’ একজন সুরকার একদিন বললেন, একটা বাচ্চা মেয়ে একটা গান গেয়েছে। ভিউ হয়েছে ১ কোটি। আমি বললাম, কোন গানটা? তখন সে এই গানটা শোনাল। তো? বেবি নাজনীনের প্রথম সিডি ‘কালিয়া’র টাইটেল সং তো আমিই লিখেছি। তাতে কী হলো? এ পর্যন্ত ৫০টির মতো গান লিখেছি।
জাকির আহম্মেদ : ৯০ দশকে চলচ্চিত্রে আপনি জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। অডিও তো ছিলই। আসলে প্রফেশনালি সংগীতে আসার নেপথ্য গল্পটা শুনতে চাই?
রবি চৌধুরী : কমার্শিয়াল গান হচ্ছে অনেকটা লটারির মতো। আমার লটারি হচ্ছে ‘প্রেম দাও’ অ্যালবাম। লাখ লাখ মানুষ ক্যাসেট কিনলেন। আমি জনপ্রিয় হয়ে গেলাম। আর গানের প্রতি আমার তো একটা ঝোঁক ছিলই। এর বাইরে নেপথ্যে কোনো কারণ নেই।
দীপংকর দীপক : শোনা গেছে, আপনি এ পর্যন্ত যত পুরস্কার-পদক পেয়েছিলেন, সব চুরি হয়েছে। তখন কোনো আইনি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন?
রবি চৌধুরী : দর্শক-শ্রোতা আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছে, তাতেই আমি খুশি। ওসব চলে গেছে, তাতে কী?
তাপস রায়হান : আমরা সেই ৯০ দশকের শুরুতে চলে যাই। তখন তো আপনি একটা ‘ভাব’ নিয়ে থাকতেন। নিশ্চয়ই অনেক সম্পর্ক হয়েছে?
রবি চৌধুরী : হাহহাহাহাহাহা। (স্যান্ডউইচ খেতে খেতে মুচকি হেসে বললেন) সেই সংখ্যা বলা যাবে না। আসলে ওইসব প্রেম না। এই তো ভালো লাগত, আর কি...। সত্যি বলতে কী, আমাকে অনেকে ভালোবেসেছে।
তাপস রায়হান : ৭০-৮০-এর দশকে সংগীতে একটা টিম ছিল গীতিকার-সুরকার-শিল্পী। অনেক গান কিন্তু তখন আমরা পাই। কিন্তু বর্তমানে কি তার ছন্দপতন হয়েছে?
রবি চৌধুরী : এখন গুণীরা কাজ পান না। কিন্তু অনেক গীতিকার উঠে আসছেন।
ইমানুল সোহান : আধুনিকতার সঙ্গে মিল রেখে বাণীর গতিপথটাও কি আগের মতোই আছে?
রবি চৌধুরী : তা ঠিক পাচ্ছি না।
জাকির আহম্মেদ : অভাবটা কি মূলত গীতিকার, সুরকার না কণ্ঠশিল্পীর?
রবি চৌধুরী : সবই আছে। কিন্তু সবাই অস্থির। টিমওয়ার্ক হলে অবশ্যই আধুনিক গানে সুদিন ফিরে আসবে। আমি আশাবাদী। তবে বর্তমানে আধুনিক গানের বাণী দুর্বল।
তাপস রায়হান : অনেকেই বলেন, আপনি একটি রাজনৈতিক দলের আদর্শে বিশ্বাসী। সত্যিটা বলবেন?
রবি চৌধুরী : অনেকেই বলেন, আমি বিএনপি করি। আসলে কোনো দলের সঙ্গে আমি যুক্ত না। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক। ২০০৬ সালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে তাকে যখন সংবর্ধনা দেওয়া হলো, তখন আমি গান শুনিয়েছিলাম। গানটা ছিল ‘কইলজার ভিতর গাঁথি রাইক্কুম তুহারে’। এরপর তাকে ‘আলিঙ্গন’ অ্যালবামটা উৎসর্গ করেছিলাম। এখন তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। এই দুর্দশাগ্রস্ত দেশকে ঠিক করতে তো সময় লাগবেই। তিনি অসম্ভব ভালো মানুষ। আমরা তার জন্য বরাবর শুভকামনা করি।
দীপংকর দীপক : যদি কিছু মনে না করেন, একটা প্রশ্ন করি? ডলি সায়ন্তনীর সঙ্গে আপনার একটা ভালো সম্পর্ক ছিল। আপনারা জুটি ছিলেন। আসলে সম্পর্কটা ভেঙে যাওয়ার কারণ বলা যাবে?
রবি চৌধুরী : ডলি আমার কো আর্টিস্ট। আমার সন্তানের মা। তিনি শ্রদ্ধার জায়গায় থাক। এর বাইরে আর কিছু বলার নেই। আজকেই আমার স্ত্রীকে বললাম, ৩২ বছর পর এ আর রহমানের ডিভোর্স হয়েছে। ও বলল, কেন হলো? আমি বললাম কেন হলো, সেটা তারাই জানে। আসলে এই যে ‘কেন হলো’ বিষয়টা ব্যাখ্যা করা কঠিন। এটা আসলে বলা যায় না। কেউ কি আসলেই বলতে পারে! হয়তো নতুন কোনো সম্পর্ক হয়েছিল। মানুষ তো? আমরা তো মানুষ।
তাপস রায়হান : আবার কি প্লেব্যাক করার ইচ্ছে আছে?
রবি চৌধুরী : সে রকম সিনেমা কোথায়? হচ্ছে না তো!
দীপংকর দীপক : বিশে^র বিভিন্ন দেশে আপনি গেছেন। সেখানে আধুনিক বাংলা গানের মর্যাদা কেমন?
রবি চৌধুরী : আসলে বলতে কি, সংগীতে ভাষার সীমানা নেই। একজন চিত্রশিল্পী যেভাবে ছবি আঁকেন, তার অনেকটাই আমরা বুঝতে পারি। সংগীতের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। আসলে তা যে ভাষার গানই হোক।
তাপস রায়হান : পরিবার নিয়ে কিছু বলবেন?
রবি চৌধুরী : ভালোই আছি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে। একমাত্র মেয়েই আমার সব। অবশ্য মাঝেমধ্যে আমাকে ডিস্টার্ব করে। হাহাহহাহাহা। ওর জন্য আমেরিকা থেকে কয়েকবার চলে এসেছি। এভাবেই জীবন চলছে।
আড্ডার শেষ দিকে রবি চৌধুরী কয়েকটি গানের মুখ গাইলেন। টেবিলে ঠুকছেন তাল। অন্যদিকে রাত গভীর হচ্ছে। ... একসময় শেষ হলো আড্ডা।
গ্রন্থনা : অনিন্দিতা আচার্য
ছবি : আবুল কালাম আজাদ
লোকেশন : গ্রিন লাউঞ্জ