চট্টগ্রাম বোর্ডে আবারও ফলাফল জালিয়াতি!

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৩২ এএম

ফলাফল দুর্নীতি থেকে বের হতে পারছে না চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড। এসএসসি পরীক্ষার পুনঃনিরীক্ষণের ফলাফল তৈরির সময় ধরা পড়ল খাতার নম্বরের সঙ্গে প্রকাশিত নম্বরের কোনো মিল নেই। অভিযুক্ত শিক্ষার্থী তিনটি বিষয়ের জন্য পুনঃনিরীক্ষণ করলেও সব বিষয়ে খাতায় প্রাপ্ত নম্বরের চেয়ে প্রকাশিত ফলাফলে বাড়তি নম্বর উঠেছে। আর এই ঘটনা অনুসন্ধানে শিক্ষা বোর্ড থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত শিক্ষার্থী যাতে কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি প্রক্রিয়ায় আবেদন করতে না পারে সেজন্য সার্ভার থেকে ফলাফল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা বোর্ডগুলো পুনঃনিরীক্ষণের ফলাফল তৈরিতে ব্যস্ত।

একজন শিক্ষার্থীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার খাতা পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আনা হয়। কিন্তু নিরীক্ষণ করার সময় খাতায় প্রাপ্ত নম্বরের সঙ্গে প্রিন্টেড (প্রকাশিত ফলাফল) নম্বরের মধ্যে অমিল দেখতে পায় বোর্ড কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। শুধু একটি খাতায় নয়, পুনঃনিরীক্ষণে আবেদন করা তিনটি বিষয়ের খাতায় এই অমিল ধরা পড়ে। এই অমিল শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তা শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যানকে অবগত করেন গত ২৫ আগস্ট ২০২৬। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছ থেকে অবগত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গত ২৫ আগস্ট তারা প্রকৃত ঘটনা অনুসন্ধানের জন্য শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যানকে বিষয়টি অবগত করেন। সেদিনই চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপনকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেন চেয়ারম্যান। এই কমিটি কাজও প্রায় শেষ করে এনেছেন।

এক বিষয় ছাড়া সব বিষয়ের সৃজনশীল নম্বরে অমিল? : অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর সব বিষয়ের প্রাপ্ত নম্বরের অমিল রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বিজ্ঞান বিভাগের অভিযুক্ত এই শিক্ষার্থী প্রকৃতপক্ষে মাত্র এক বিষয়ে পাস করেছে। কিন্তু প্রকাশিত ফলাফলে ৪ দশমিক ৯৪ জিপিএ পেয়ে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ হয়েছে শিক্ষার্থীটি বাংলায় (উভয় পত্র) ‘এ’ মাইনাস (১২০ নম্বর), রসায়নে ‘এ’ (৭৮ নম্বর), আইসিটিতে ‘এ’ (৩৭ নম্বর) পেয়েছে এবং বাকি সব বিষয়ে ‘এ প্লাস’ পেয়েছে। ফলাফল পুনঃনিরীক্ষণে এই তিন বিষয়ের নম্বরের পার্থক্য শনাক্ত হওয়ার পর ওই শিক্ষার্থীর বাকি উত্তরপত্রগুলোও যাচাই করা হয় এবং সেগুলোতেও খাতায় প্রাপ্ত নম্বর ও প্রকাশিত নম্বরের মধ্যে পার্থক্য পাওয়া যায়। এক সূত্রে জানা যায়, শুধু বাংলা প্রথমপত্র ছাড়া সব বিষয়ের সৃজনশীল নম্বরে পার্থক্য রয়েছে।

কীভাবে শনাক্ত হলো জালিয়াতি : জালিয়াতি বিষয়ে জানতে কথা হয় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গত ২৫ আগস্ট পুনঃনিরীক্ষণ চলাকালীন একজন পরীক্ষক পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের একটি উত্তরপত্রে প্রিন্ট আউটের (প্রকাশিত ফলাফল) নম্বরের সঙ্গে খাতার প্রাপ্ত নম্বরের অমিল দেখতে পান। খাতায় শূন্য থাকলেও প্রিন্ট আউটে ৪৫ ছিল। এই অসঙ্গতি উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (মাধ্যমিক) মোহাম্মদ আবদুল মন্নানকে চেক করতে বলা হলে তিনি কম্পিউটার সেন্টারের ডাটার সঙ্গে খাতার নম্বরের অমিল দেখতে পান। পরে আমি, উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (মাধ্যমিক) মোহাম্মদ আবদুল মন্নান ও উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (উচ্চ মাধ্যমিক) প্রফেসর মোহাম্মদ দিদারুল আলমকে সঙ্গে নিয়ে শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরীকে লিখিতভাবে অবগত করি। তখন চেয়ারম্যান মহোদয় সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি আমলে নিয়ে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন।’

তিন বিষয়ের পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করা হয়েছিল : অভিযুক্ত শিক্ষার্থী পদার্থবিজ্ঞান, উচ্চতর গণিত এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করেছিল। পদার্থবিজ্ঞানের সৃজনশীল নম্বরে অমিল শনাক্ত হওয়ার পর বাকি দুই বিষয়ের নম্বরেও যখন অমিল পাওয়া যায়, তখন অন্য বিষয়গুলোর খাতাও তলব করা হয়। সেখানেও অমিল খুঁজে পায় তদন্ত কমিটি। তবে পুনঃনিরীক্ষণের কথা অস্বীকার করেন অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বাবা আবু শাহেদ হারুন। তিনি বলেন, ‘আমি বা আমার পরিবারের কেউ পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করিনি। আমার বিরোধী কোনো পক্ষ আবেদন করলে হয়তো করতে পারে।’

বাবার অবর্তমানে মা করেছেন কি না জানতে কথা হয় অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর মা রুবিনা আকতারের সঙ্গে। তিনিও বলেন, ‘আমরা প্রকাশিত ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে পুনঃনিরীক্ষণের জন্য কোনো আবেদন করিনি।’

প্রধান শিক্ষক ও অভিভাবককে ডেকেছিল তদন্ত কমিটি : এদিকে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীটি ছিল আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়ের। এ বিষয়ে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থী সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল তদন্ত কমিটি। এর সত্যতা নিশ্চিত করতে গত বৃহস্পতিবার আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে কথা হয় বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ গোলাম ফরহাদের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার কাছে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর নির্বাচনী ফলাফল সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন শিক্ষা বোর্ডের সচিব স্যার। আমি নির্বাচনী পরীক্ষার ফলাফলের একটি পূর্ণাঙ্গ কপি উনাকে দিয়েছি।’

নির্বাচনী পরীক্ষার ফলাফল কী ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনী পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক না হলেও আমরা সবাইকে ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছিলাম।’

সার্ভার থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর ফলাফল : শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী যাতে চলমান একাদশ শ্রেণির ভর্তি প্রক্রিয়ায় (২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া) আবেদন করতে না পারে সেজন্য সার্ভার থেকে তার ফলাফল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। শুধু সার্ভার-ই নয়, আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক একটি ফলাফল ইআইএন নম্বরের বিপরীতে ফলাফল প্রকাশের দিন দেওয়া হয়েছিল। সেই ফলাফলে অভিযুক্ত এই শিক্ষার্থীর ফলাফল ছিল। কিন্তু গতকাল প্রতিষ্ঠানের ইআইএন নম্বর দিয়ে ফলাফল ডাউনলোড করে দেখা যায়, সেখানে এই রোল নম্বরটি নেই। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের ফলাফলও সংশোধন করা হয়েছে। সেখানে আগের ফলাফল আর নেই। আবার শিক্ষার্থীর রোল নম্বর দিয়েও আর ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না।

শিক্ষা বোর্ডের বক্তব্য : অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি তদন্তাধীন। মিডিয়াকে বলার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। এ ঘটনা কীভাবে ঘটেছে তা নিয়ে আমরা তদন্ত কমিটির সদস্যরা কাজ করছি। তবে এবার আমরা কাউকে ছাড়ব না, আমরা বিষয়টি খুব শক্তভাবে মোকাবিলা করব এবং জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনব।’

এদিকে গত ২৫ আগস্ট চেয়ারম্যানের আদেশক্রমে গঠিত তদন্ত কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়। এই সাত কর্মদিবস ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট কবে নাগাদ জমা দেবেন? এই প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন বলেন, ‘আমরা কাজের প্রতি দায়িত্বশীল। সঠিক সময়ে আমরা রিপোর্ট জমা দেব।’ তবে অপর এক সূত্রে জানা যায়, তদন্ত রিপোর্ট শেষ করতে আরও তিন থেকে চার দিন সময় লাগতে পারে।

ফলাফল নিয়ে শিক্ষা বোর্ডের যত অনিয়ম : এদিকে গত বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের পুনঃনিরীক্ষণের সময় ৩৪টি খাতার নম্বরপত্র বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে শিক্ষা বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রফেসর ইলিয়াছ উদ্দিন আহাম্মদ গতকাল বলেন, তখন যেটা ঘটেছিল সেটা হলো পুনঃনিরীক্ষণের সময় নিরীক্ষণ শেষে খাতায় প্রাপ্ত নম্বর লিখেছিল পুনঃনিরীক্ষণের পরীক্ষক। কিন্তু নিরীক্ষণের ফলাফল শিটে ৩৪টি উত্তরপত্রে বাড়তি নম্বর ইনপুট দেওয়া হয়েছিল। আমরা পরে তা শনাক্ত করে সঠিক প্রাপ্ত নম্বর বসিয়ে নিরীক্ষণের চূড়ান্ত ফলাফল প্রস্তুত করেছিলাম।

কিন্তু তখনকার সময়ে কম্পিউটার সেন্টারে কারা জড়িত ছিল তাদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি জানতে চাইলে প্রফেসর ইলিয়াছ উদ্দিন আহাম্মদ বলেন, ‘তখন আমরা তদন্ত কমিটির রিপোর্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত আসেনি।’ প্রদত্তক্ষমতাবলে বোর্ডের চেয়ারম্যান সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। এই প্রশ্নের বিষয়ে তিনি বলেন, বোর্ড চেয়ারম্যান মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের আলোকে কাজ করেন।

এর আগে ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক সচিব প্রফেসর নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলের ফলাফলে ১১টি পত্রের নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ নিয়ে মামলাও হয় এবং মামলায় চার্জশিটও দাখিল হয় গত মাসে।

সব জালিয়াতি কম্পিউটার সেন্টারে : ফলাফল নিয়ে যত জালিয়াতির ঘটনা, সবই হচ্ছে বোর্ডের কম্পিউটার সেন্টারে। বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রধান পরীক্ষক থেকে প্রাপ্ত নম্বরগুলোকে বলা হয় ‘এইচ’ টাইপ। আর পরীক্ষার হল থেকে উত্তরপত্রের প্রথম অংশ কম্পিউটার সেন্টারে আগেই চলে যায়, সেটাকে বলা হয় ‘ই’ টাইপ। ই টাইপ আগেই সার্ভারে স্ক্যান করে ঢুকিয়ে রাখা হয়। প্রধান পরীক্ষক থেকে নম্বর আসার পর এইচ টাইপ স্ক্যান করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ফলাফল প্রকাশের কয়েকদিন আগে একটি প্রোগ্রামিং (ডি কোডিং) করা হয়। আর তা করা হলে লিথু কোডের মাধ্যমে ই টাইপ তার নিচের অংশের এইচ টাইপকে খুঁজে নেয়। আর তখনই জানা যায় কোন শিক্ষার্থী কত নম্বর পেল। শিক্ষার্থীর পরিচয় জানতে পারার পর কম্পিউটার সেন্টারের কেউ হয়তো কোনো শিক্ষার্থীর নম্বর বাড়িয়ে দেয়। সাবেক সচিব নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলের ঘটনায় সেভাবেই ফলাফল পরিবর্তন করা হয়েছিল। আদালতে দাখিলকৃত চার্জশিটেও তা উল্লেখ করা হয়। এদিকে এ ঘটনায় কম্পিউটার সেন্টারে দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করা তিনজন অপারেটরকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে জানা যায়। 

উল্লেখ্য, এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭৭ হাজার ৪৫৩ জন পাস করে। এদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯ হাজারর ৩৯৮ জন। ফলাফল পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করেছে ৩৯ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থী। আগামী ১০ বা ১১ সেপ্টেম্বর পুনঃনিরীক্ষণের ফলাফল প্রকাশ করা হতে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত