ডিসি-ওসিতে ইসি

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২৪, ০১:৪৬ এএম

বিদ্যমান বিধান ও পদ্ধতিতে নবনিযুক্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসিরউদ্দীন কী করবেন বা কী করার আছে জিজ্ঞাসাটি নতুন করে আলোচিত। তিনি নিজেও এর একটা জবাব দিয়েছেন। বলেছেন, প্রয়োজনীয় সংস্কারের পর অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করবে তার কমিশন। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ‘যা করা দরকার’ কমিশন তাই করবে, তাও বলেছেন। এ দায়িত্বকে জীবনের একটি অপরচুনিটি হিসেবে দেখছেন বলেও জানিয়েছেন। কথাগুলো সুন্দর, চমৎকার। তার আগের সিইসিদেরও সুন্দর সুন্দর অনেক কথা রয়েছে। কিন্তু, আদতে বা বাস্তবে তারা করে গেছেন অনেক অসুন্দর কাজ। উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে, বিনা সংস্কারেই মানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের করা আইনেই গঠন হয়েছে নাসিরউদ্দীন কমিশন। গত ৫ আগস্ট ব্যাপক আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের দাবি ওঠে। তাগিদ আসে নির্বাচনী বিধিবিধান সংস্কারেরও। আলামত বুঝে পূর্ববর্তী প্রধান নির্বাচন কমিশনার হাবিবুল আউয়াল এবং তার ৪ কশিনার পদত্যাগ করে কেটে পড়েন ৫ সেপ্টেম্বর। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারের আগে ইসি গঠনের সমালোচনা হচ্ছে কিছু মহলে। তারা বলছেন, ২০২২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের আইন প্রত্যাখ্যান করে বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ওই আইনের অধীনেই নির্বাচন কমিশন গঠনের সার্চ কমিটি গঠন করে। অথচ নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে সরকার একটি কমিটি গঠন করেছে। ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনব্যবস্থা সম্পর্কে সার্বিক প্রস্তাব সরকারের কাছে পেশ করা তাদের কাজ। বদিউল আলম মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ওই কমিশন কাজ শুরু করেছে দুই মাসও হয়নি। তাদের প্রথম কাজই হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন গঠনের পদ্ধতি ঠিক করা। এ লক্ষ্যে কমিশন একটি নতুন আইনের খসড়া তৈরি করেছে, যা সরকারের কাছে পাঠানোর অপেক্ষায়। এর আগেই সরকার এরইমধ্যে ইসি গঠন করে ফেলেছে। নতুন সিইসি এখন বলছেন, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার শেষে নির্বাচন দেবেন। প্রশ্নটা এখানেই। সংস্কার শেষ করে কি কমিশন গঠন করা যেত না?

গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ছাত্র-জনতার দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত অন্তর্বর্তী সরকারের এ কাজকে ৫ আগস্টের স্পিরিটবিরোধী ঠেকছে কারও কারও কাছে। নির্বাচন প্রশ্নে আইন, পদ্ধতি, ব্যক্তি, সততা, দক্ষতা মূল ফ্যাক্টর নয়। কমিশন একা নির্বাচন করতে পারে না। পারবেও না। এজন্য নির্ভর করতে হয় প্রশাসনের ওপর। ডিসি-এসপি-ওসিরা সেখানে বড় ফ্যাক্টর। ১৯৯১ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ একটি আইন করেছিলেন। তাতে নির্বাচনী কাজে যুক্ত কর্মকর্তারা অনিয়ম করলে কিংবা অর্পিত দায়িত্ব পালন না করলে তাদের শাস্তির আওতায় আনার কথা রয়েছে। কমিশন তাদের সাসপেন্ড করতে পারবে। আইনে দুই মাস সাসপেন্ড রাখার কথা আছে। কিন্তু, আইন আইনের জায়গায়ই থাকে। কখনো কখনো আইনের খণ্ডিত প্রয়োগ দেখা যায়। এ ছাড়া প্রতিবারই নির্বাচনের ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক ওঠে। ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা হওয়ার পরও এর অবসান হয়নি। নতুন সিইসি এ এম এম নাসিরউদ্দীনের অঙ্গীকার হচ্ছে, মানুষ যাতে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে, সেটার সর্বোচ্চ চেষ্টা করার। এ ব্যাপারে যাবতীয় চ্যালেঞ্জ নেবেন। বলেই ফেলেছেন, ‘২০১৪ সাল থেকে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। গত জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে অনেক মানুষ প্রাণ দিয়েছে। এই আন্দোলনের মূল বিষয়ই ছিল ভোটের অধিকার নিশ্চিত করা। এত মানুষের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করা সম্ভব নয়। এক সময়ের তথ্য, বিদ্যুৎ-জ্বালানি,  স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই সচিবের পেশাগত ক্যারিয়ার বর্ণাঢ্য। নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণের বিষয়ে এখনই আগাম কিছু বলতে চান না তিনি। সময় হলে বিষয়গুলো পরিষ্কার হবে।

দিন-তারিখ ঠিক না হলেও নির্বাচনের হাট জমে গেছে, আলামতও বোধগম্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নির্বাচনের রোড আর ম্যাপ দুটোই মোটামুটি স্পষ্ট। কথামালাও জমজমাট। চারদিকে পরামর্শের ঝড়। পুরনো কথাও আসছে নতুন করে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের পদমর্যাদা মন্ত্রীদের ওপরে নির্ধারণ করা, ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা করা, ‘না’ ভোটের বিধান আবার চালু করা, স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে ভোটারের সমর্থনযুক্ত সইয়ের বিধান বাদ দেওয়া, জাতীয় নির্বাচনসংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সংজ্ঞায় ‘নির্বাচন’-এর সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত ও সুস্পষ্ট করাসহ কত যে পরামর্শ। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনও ব্যস্ত। কমিশন এখন পর্যন্ত ২১/২২টি বৈঠক করেছে। নির্বাচনসংক্রান্ত সব আইন ও বিধি পর্যালোচনা করা হয়েছে। ডিজিটাল মাধ্যমে মানুষের মতামত নেওয়া হচ্ছে। অনেকে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে লিখিত প্রস্তাব দিচ্ছেন। নারীর ক্ষমতায়নে সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি ভোটের প্রস্তাবও আছে। ২২টি রাজনৈতিক দল ও জোটের কাছে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার বিষয়ে প্রস্তাব চেয়ে চিঠি দিয়েছে কমিশন। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের ১০০ দিন উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টা ১৭ নভেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, ‘যাত্রা শুরু করা নির্বাচনী ট্রেনকে সামনে এগোতে এগোতে অনেকগুলো কাজ সেরে ফেলতে হবে। এই ট্রেন শেষ স্টেশনে পৌঁছানো নির্ভর করছে, তাড়াতাড়ি রেললাইনগুলো বসিয়ে দেওয়ার ওপর যা করা হবে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের মাধ্যমে।’ তাতে অনেকের কাছে মনে হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার ধারণার চেয়ে কম সময়ে তাদের কাজ শেষ করে বিদায় নিতে চাচ্ছে। নির্বাচন আর প্রশাসন যে খুব প্রাসঙ্গিক এ বিষয়টি প্রশ্নের মতো করে আলোচনায় এসেছে নতুন সিইসির দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই। তার কাছে প্রশ্ন ছিল বিগত নির্বাচন কমিশনের ঊর্ধ্বতন থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের বিরুদ্ধে আওয়ামী পক্ষপাতের অভিযোগ রয়েছে, সেক্ষেত্রে কী করবেন? জবাবে বলেছেন, ‘সরকারি কর্মচারীরা হচ্ছে তরল পদার্থের মতো। পাত্র অনুযায়ী রঙ ধরে, পাত্র যে রকম তারাও ওই রঙ ধরে। যখন তারা দেখবে সঠিক নির্বাচন চাওয়া হচ্ছে। তারাও তো মানুষ, তাদেরও তো ভাই-ব্রাদার এই দেশে আছে। তারাও তো চায় যে, একটা সুষ্ঠু নির্বাচন এই দেশে হোক। তাদের হয়তো অন্যভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু এখন তারা দেখবে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে চায় সরকার, তারা সহযোগিতা করবে।’ ১৯৭৩ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো নির্বাচনের সঙ্গেই মেলানো যাবে না সামনের নির্বাচনকে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সিইসির দায়িত্ব পান বিচারপতি মো. ইদ্রিস। এরপর পাঁচজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি পরপর সিইসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত সাতজন বিচারপতি সিইসির দায়িত্ব পালন করেন। আমলাদের মধ্যে মোহাম্মদ আবু হেনা থেকে বর্তমান নাসিরউদ্দীনসহ যোগ হলেন ছয়জন। দেশের প্রথম সিইসি মো. ইদ্রিসের অধীনে হয় ১৯৭৩ সালের সাতই মার্চ প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ১৯৭৭ সালের ৮ জুলাই দ্বিতীয় সিইসির দায়িত্বে ছিলেন বিচারপতি একেএম নূরুল ইসলাম। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন হয় তার অধীনে। তৃতীয় সিইসি হিসেবে ১৯৮৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব পান বিচারপতি চৌধুরী এটিএম মাসউদ। এই সিইসির অধীনে ১৯৮৬ সালে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ১৯৮৮ সালের চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। এই দুই নির্বাচনেই বিজয়ী হয় সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি।  এরপর ১৯৯০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি চতুর্থ সিইসি হিসেবে দায়িত্ব নেন বিচারপতি সুলতান হোসেন খান। তিনিই প্রথম সিইসি যার অধীনে কোনো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ পতনের পর দেশের পঞ্চম সিইসি হিসেবে বিচারপতি আবদুর রউফ ১৯৯০ সালের ২৫ ডিসেম্বর দায়িত্ব নেন। তার অধীনে ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় নির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনে বিজয়ী হয় বিএনপি। এর পরের সিইসি বিচারপতি একেএম সাদেক। তার অধীনে হয় ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। 

আমলাদের মধ্যে প্রথম মোহাম্মদ আবু হেনাকে সিইসি নিয়োগ দেওয়া হয় ১৯৯৬ সালের ৯ এপ্রিল। হেনা কমিশনের অধীনে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। এ নির্বাচনের মাধ্যমে ২১ বছর পরে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ।  ২০০০ সালের ২৩ মে দেশের অষ্টম সিইসি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন সাবেক সচিব এমএ সাঈদ। এ কমিশনের অধীনে হয় ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট। ২০০৫ সালের ২৩ মে সিইসির দায়িত্ব গ্রহণ করেন বিচারপতি এমএ আজিজ। তার দায়িত্ব গ্রহণের বিরোধিতা করে আন্দোলনের ডাক দেয় তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট।

আজিজ কমিশন ২০০৭ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিলও ঘোষণা করে। কিন্তু ব্যাপক আন্দোলনের মুখে সেই সময় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। ২০০৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি দেশের ১০ম সিইসি হিসেবে দায়িত্ব নেন আরেক সাবেক আমলা ড. এটিএম শামসুল হুদা। তার অধীনেই  ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর হয় নবম জাতীয় নির্বাচন। সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। ১১তম সিইসি হিসেবে ২০১২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেন কাজী রকিব উদ্দিন আহমেদ। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি হয় ১০ম সংসদ নির্বাচন। যে নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। বিনা ভোটে ১৫৩ জনকে এমপি বানিয়ে দেওয়ার রেকর্ড গড়েন কাজী রকিব। ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দায়িত্বে আসে কেএম নুরুল হুদার কমিশন। এ কমিশনের অধীনে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর হয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আগের রাতেই অধিকাংশ ভোট কেটে নেওয়ার অভিযোগ এই কমিশনের বিরুদ্ধে। এর পরের সিরিয়ালে হাবিবুল আউয়াল। তার বিদায়ের পরই এলেন এ এম এম নাসিরউদ্দীন। সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ দেখছেন তিনি। চ্যালেঞ্জ জয়ের প্রত্যয়ের কথাও এলো। মনে রাখতেই হবে, এবারের সময় ও প্রেক্ষিতটা ভিন্ন।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট, ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত