রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে আশঙ্কাজনক মোড়

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২৪, ০১:৪১ এএম

রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধাবস্থা নতুন করে আশঙ্কাজনক মোড় নিয়েছে। পশ্চিমা শক্তিদের ক্রমাগত সাহায্যের পরও রাশিয়া যুদ্ধ থেকে পিছু হটেনি। শুরুর দিকে পশ্চিমা তরফ থেকে বলা হয়েছিল, ইউক্রেনের ওপর হামলার জন্য রাশিয়াকে চরম মূল্য দিতে হবে। অল্পদিনেই এই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে বলে পরাশক্তিরা আশ্বস্ত করেছিল। বাস্তবে তা হয়নি। একে তো বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ, তদুপরি বিশ্ব রাজনীতির কূটনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন হওয়ায় যুদ্ধটা একতরফা হয়নি যেমনটা পশ্চিমারা আশা করেছিল। রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধেও সে দেশে তেমন জোরদার প্রতিবাদ গড়ে ওঠেনি। বরং ইউক্রেন ও পশ্চিমা বিরোধী মনোভাব সম্ভবত তাকে লৌহমানবে পরিণত করেছে। দুনিয়ার রাজনীতির সমীকরণও পশ্চিম দিকে হেলে নেই। ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ওপর অমানবিক, অন্যায্য, নির্মম আক্রমণে দুনিয়ার বেশিরভাগ মানুষ দখলদার ইসরায়েলি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তবে ইসরায়েলি গণহত্যায় পশ্চিমারা সমর্থন দিয়েই যাচ্ছে, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সবচেয়ে নিন্দনীয়। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ও অর্থসাহায্য তারা দিয়ে যাচ্ছে, ইসরায়েলের গণহত্যা ও দখল অব্যাহত রাখতে। জাতিসংঘে নিজেদের ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে বারবার আটকে দিচ্ছে যুদ্ধবিরতি ও ইসরায়েলিদের থামানোর যেকোনো সম্ভাবনা। এ কারণে মার্কিনসহ পশ্চিমাদের ওপর বিশ্ব জুড়ে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

এই সুযোগে মার্কিনিদের দুই শত্রু রাশিয়া ও চীন কাছাকাছি এসেছে। শত্রুর শত্রু মিত্র এই আপ্তবাক্য মেনে তারা জোট বেঁধেছে। ভারত, ব্রাজিলের মতো বিপুল জনশক্তি ও সম্পদের দেশগুলোও এই জোটে যুক্ত হচ্ছে। চীনের সঙ্গে শত্রুতা থাকা সত্ত্বেও রাশিয়ার তেল সম্পদ সস্তায় কিনে নিচ্ছে, কূটনৈতিক নৈকট্য স্থাপন করছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রেখেছে। চীন যাতে আরও শক্তিশালী না হয়ে উঠে এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রও ভারতের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক রাখতে চাইছে না। নানাপ্রান্তে যুদ্ধের ধকল নিতে পারছে না শক্তিশালী পশ্চিমা দেশগুলো। সেসব দেশেও যুদ্ধবিরোধী আওয়াজ প্রকট হচ্ছে। এসবের প্রভাবে লোকরঞ্জনবাদ শক্তিশালী হচ্ছে। এতে বিভাজন আরও বাড়ছেই। এর প্রভাব দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে। লিবারেল মিডিয়া ট্রাম্পের বিরুদ্ধে টানা প্রচার করে গেলেও দ্বিতীয়বারের মতো তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। ট্রাম্প রাজনীতিতে লিবারেল মূল্যবোধকে একদমই গুরুত্ব দেন না। তিনি বর্ণবিদ্বেষী, ইমিগ্র্যান্টদের প্রতি খড়্্গহস্ত। ফলে ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ায় সে দেশের সংখ্যালঘু, ইমিগ্র্যান্ট ইত্যাদি গোষ্ঠী আশঙ্কার মধ্যে আছেন। এবার আরও জোরদার ম্যান্ডেট পাওয়ায় প্রথমবারের চেয়েও তিনি আরও বেশি আগ্রাসী হবেন এই আশাঙ্কা থাকছে। কিন্তু এর একটা অন্য দিকও আছে। ট্রাম্পের সঙ্গে পুতিনের সম্পর্ক ভালো। এই অভিযোগও আছে যে, ২০১৬ সালে প্রথমবার যখন ট্রাম্প নির্বাচিত হন তখন পুতিন ও রুশ গোয়েন্দা বাহিনী নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছিল। যদিও ইতিমধ্যে ইসরায়েল ট্রাম্পের সঙ্গে আরও নিবিড় সম্পর্ক করবে বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং ইসরায়েলি লবি ট্রাম্প প্রশাসনে আরও শক্তিশালী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, ইউক্রেন প্রশ্নে সম্ভবত মার্কিন নীতি আরও বেশি ঠান্ডা হয়ে যাবে।

এর প্রভাবেই হয়তো পুতিনের গলার জোর বেড়েছে। গত বৃহস্পতিবার তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘কিয়েভকে যদি নিউক্লিয়ার অস্ত্র দেওয়া হয় তবে রাশিয়া তার অস্ত্রাগারে থাকা সব অস্ত্র ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে।’ গত সপ্তাহে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বলা হয়েছে বেশ কয়েকজন পশ্চিমা কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ক্ষমতা ছাড়ার আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইউক্রেনকে নিউক্লিয়ার অস্ত্র প্রদান করতে পারেন।

‘আমরা যে দেশটির সঙ্গে এখন মূলত যুদ্ধে আছি সেই দেশটি যদি পারমাণবিক শক্তিতে পরিণত হয়, তাহলে কী করব? এই ক্ষেত্রে, আমরা সব ব্যবহার করব, আমি এই ব্যাপারটার ওপর জোর দিতে চাই, অবিকল ধ্বংসের সব উপায় রাশিয়ার কাছে আছে। সবকিছু আমরা করব। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজর রাখব’

কাজাখস্তানের আস্তানায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন পুতিন। তিনি আরও বলেন, ‘যদি আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ কিছু হস্তান্তর করে, তাহলে এর অর্থ হবে তারা যে সব অপসারণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তার লঙ্ঘন করল।’ পুতিন আরও যোগ করেন, “ইউক্রেনের পক্ষে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা কার্যত অসম্ভব, তবে দেশটি কোনো ধরনের ‘নোংরা বোমা’ তৈরি করতে সক্ষম হতে পারে, যা দূষণ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তেজস্ক্রিয় উপাদান দিয়ে সজ্জিত একটি প্রচলিত বোমা।” সেক্ষেত্রে রাশিয়া যথাযথ জবাব দেবে বলে তিনি জানান। রাশিয়া প্রমাণ না দিয়েই বারবার বলেছে, ইউক্রেন এমন একটি অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। ১৯৯১ সালে পতনের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার ইউক্রেন উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল। কিন্তু রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের কাছ থেকে নিরাপত্তা আশ্বাসের বিনিময়ে ১৯৯৪ সালে বুদাপেস্ট মেমোরেন্ডামের অধীনে সেগুলো বিসর্জন দেয়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বারবার অভিযোগ করেছেন যে, এই পদক্ষেপটি তার দেশকে নিরাপত্তাহীন করেছে। এই কারণেই তিনি নিজের দেশকে ন্যাটোতে যুক্ত করতে চান, যা নিয়ে রাশিয়ার তীব্র আপত্তি এবং সেখান থেকেই যুদ্ধ শুরু। বাইডেন যদি ক্ষমতা ছাড়ার আগে ইউক্রেনকে সত্যি নিউক্লিয়ার অস্ত্র দিয়ে থাকেন, তবে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। ট্রাম্পের সঙ্গে পুতিনের সম্পর্ক যত ভালোই হোক, এর ফল হবে মারাত্মক। পুতিন ইতিমধ্যে সাবধান করে বলেছেন, রাশিয়া নতুন ধরনের ওরেশনিক হাইপারসনিক মিসাইল দিয়ে ইউক্রেনের ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রগুলোতে’ আক্রমণ করবে। রাশিয়া এখনো পর্যন্ত ইউক্রেনের মন্ত্রণালয়, সংসদ বা প্রেসিডেন্টের বাসভবনে আক্রমণ করেনি।

পুতিনের হুমকি যদি সত্যি হয়, এবার হয়তো রাশিয়া আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবে। অবশ্য, ট্রাম্পের ওপর আস্থা রাখতে চাইছেন তিনি। নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আক্রমণ, এমনকি হত্যাচেষ্টা করা হয়েছে উল্লেখ করে বলেছেন এহেন অসভ্য আচরণে তিনি রীতিমতো বিক্ষুব্ধ। বাইডেন প্রশাসন যুদ্ধ উসকে দিতে চাইছে এ কথা বলে তিনি আশা করেন,  ট্রাম্প ‘সমাধান’ খুঁজে বের করবেন। তার জন্য মস্কো আলোচনায় প্রস্তুত।

 লেখক : সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত