ঋণের চাপ কমুক

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২৪, ০১:৪৫ এএম

একটি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সক্ষমতা কতটুকু, দেশের সার্বিক উন্নয়নে কী পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ প্রয়োজন সে জন্য সবসময়ই বিভিন্ন পর্যায়ে বিশ্লেষণ করে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে বৈদেশিক ঋণের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হয়, ঋণপ্রাপ্তির পর সেই টাকা কোন কোন খাতে, কী পরিমাণে, কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে। কিন্তু বিগত হাসিনা সরকারের সময় যে পরিমাণ অর্থ ঋণ নেওয়া হয়েছে, দেখা যাচ্ছে সেই টাকা উন্নয়নের নামে নয়ছয় করা হয়েছে। শেখ হাসিনার আওয়ামী সরকারের বিদায়ের পর দেখা যাচ্ছে, সেই বৈদেশিক ঋণের মূল টাকা এবং কিস্তি পরিশোধে ব্যতিব্যস্ত রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। যে কারণে নতুর ঋণের প্রবাহ স্বাভাবিকভাবেই ধীর হয়ে এসেছে। 

অনেক অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, বিদেশি সাহায্য সেসব দেশেই কার্যকর,  যেখানে ভালো অর্থনৈতিক, মুদ্রা ও বাণিজ্য নীতিমালা রয়েছে। আবার কেউ বলেন, বিদেশি সাহায্য কার্যকর হওয়ার সঙ্গে গ্রহীতা দেশের অর্থনৈতিক নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই। উন্নয়নের নামে বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো ‘বিদেশি ঋণের ফাঁদ’ বলে অভিহিত করেছে। অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আমলে না নিয়ে একের পর এক মেগা প্রকল্পের নামে মেগা দুর্নীতি আর সেই দুর্নীতি আড়াল করতে দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে দেশি-বিদেশি ঋণের প্রতি। ফলে অন্তর্র্বর্তী সরকার এই পর্বতসম ঋণের বোঝা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। ২০০৯ সালে যখন শেখ হাসিনা ক্ষমতা নেন, তখন দেশি-বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা। এরপর সাড়ে ১৫ বছর টানা ক্ষমতায়  থেকেছেন তিনি। আর এই সময়ে ঋণ ফুলেফেঁপে বেড়েছে সাড়ে ৬ গুণ। ঋণে বেহাল অবস্থায় সরকার।

উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশি ঋণ যা আসছে, তার চেয়ে বেশি শোধ করতে হচ্ছে আগের ঋণের কিস্তি। উন্নয়নের নামে সাড়ে ১৫ বছরে সীমার চেয়েও বেশি ঋণ করেছে হাসিনা সরকার। অধিকাংশই প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে। ফলে প্রকল্প চালু হলেও তা থেকে আশানুরূপ ফলাফল আসছে না। ফলে ঋণ করেই এখন ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ এসেছে, তার চেয়ে বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে শুক্রবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে তা রীতিমতো আতঙ্কজনক। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবরে) বৈদেশিক ঋণছাড় হয়েছে ১২০ কোটি ২০ লাখ ডলার। অথচ এ সময়ে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে ১৪৩ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে চাপ, ঋণ নিয়ে যে উন্নয়ন হয়েছে সেখান থেকে রিটার্ন না আসা, আয়ের চেয়ে বেশি মেইনটেন্যান্স খরচের ফলে অন্তর্বর্তী সরকারকে নিজস্ব তহবিল থেকে এসব প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। বিদায়ী অর্থবছরে বাংলাদেশের রেকর্ড ৩৩৫ কোটি ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৬৮ কোটি ডলার বেশি। এর আগে কোনো অর্থবছরে সরকারকে এত ঋণ পরিশোধ করতে হয়নি। অন্যদিকে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৪ মাসে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে ২৫ কোটি ৪৫ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরে একই সময়ে ছিল ৩৬২ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় প্রতিশ্রুতি কমেছে ৯০ শতাংশ।

এখন দেখা যাচ্ছে, শেখ হাসিনা সরকারের রেখে যাওয়া ঋণ বর্তমান সরকারের ওপর একটি বড় ধরনে বোঝা। তবু বর্তমান সরকার অর্থনীতিতে একটি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। তবে এই উদ্যোগ সফল হতে হলে, দুর্নীতি বন্ধ করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে হবে। যারা দুর্নীতি করেছেন, তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। না হলে, প্রকল্পের ঋণ শোধে সরকারের ওপর চাপ ক্রমাগত বাড়বে। এর ফলে বিভিন্ন রকম অর্থনৈতিক নৈরাজ্য প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। এর সঙ্গে যদি যোগ হয় রাজনৈতিক নৈরাজ্য, তাহলে দেশের চিত্র কেমন হতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই মুহূর্তে জরুরি, সরকারকে যেকোনো ধরনের চাপ মুক্ত রাখা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত