দেশে গত ১৫ বছরের ফিরিস্তি নিয়ে শ্বেতপত্র তৈরি করেছে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি। আজ রবিবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে শ্বেতপত্র হস্তান্তর করবেন কমিটির প্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। গত বৃহস্পতিবার ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের আলোচনা সভায় ইঙ্গিত দিয়ে ড. দেবপ্রিয় বলেছিলেন, স্বৈরশাসনে সবচেয়ে বেশি লুটপাট হয়েছে ব্যাংক ও জ্বালানি খাতে।
যদিও কমিটির যাত্রার শুরুতেই জানানো হয়েছিল, শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি কোনো ধরনের দুর্নীতির তথ্য উদঘাটন করবে না।
জানা যায়, শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র। এতে বলা হয়েছে, দুর্নীতি সবচেয়ে বেশি হয়েছে ব্যাংক খাত, দ্বিতীয়ত বিভিন্ন প্রকল্পে, তৃতীয়ত জ্বালানি খাতে। গত ১৫ বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিসহ (এডিপি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা ৬০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১ হাজার ৪২৪ বিলিয়নই রাজনৈতিক চাঁদাবাজি, ঘুষ এবং বাজেট বৃদ্ধিতে হারিয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের জন্য ঋণ কেলেঙ্কারি, প্রতারণা, ভুয়া ঋণ ও ঋণের অপব্যবহারের বিভিন্ন ঘটনা চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় মদদে ব্যাংক দখলে সহায়তা করা হয়েছে। ব্যাংক খাত থেকে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে যে অর্থ লুট করা হয়েছে, তার বড় অংশই পাচার হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে যে শ্বেতপত্র প্রকাশিত হবে, তাতে ছয়টি বিষয় থাকবে। সেগুলো হচ্ছে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা, বাহ্যিক ভারসাম্য, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান।
যে ছয় বিষয়ে এ কমিটি কাজ করেছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা। এতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ, সরকারি ব্যয় (সরকারি বিনিয়োগ, এডিপি, ভর্তুকি ও ঋণ) ঘাটতি বাজেট অর্থায়ন বিষয়াদি থাকবে। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যে থাকবে উৎপাদন, সরকারি কেনাকাটা ও খাদ্য বিতরণ। আর বাহ্যিক ভারসাম্যে থাকবে রপ্তানি, আমদানি, প্রবাসী আয়, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই), বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিদেশি অর্থায়নের প্রভাব ও ঋণ।
অন্যদিকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের চাহিদা, জোগান, দাম নির্ধারণ, উৎপাদন ব্যয় ও ক্রয় চুক্তি; বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঋণের সুবিধা, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও লজিস্টিকস, কর্মসংস্থান খাতে দেশি-বিদেশি, প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক মজুরি এবং তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে আলোকপাত করা হবে শ্বেতপত্রে।
বাংলাদেশে শ্বেতপত্র প্রকাশের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ২০০১ সালে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে। তাতে আওয়ামী লীগ সরকারের আগের মেয়াদের বিভিন্ন অসংগতির কথা তুলে ধরা হয়।
২০২১ সালে একদল বেসামরিক নাগরিকদের, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা একটি গণকমিশন গঠন করেন।
তারা পরের বছর ‘বাংলাদেশে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ২০০০ দিন’ নামে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে। তবে ‘ইসলাম বিদ্বেষ’-এর অভিযোগে এটি নিয়ে সে সময় বিতর্ক দেখা দেয়।
শ্বেতপত্রে কী থাকছে এর কিছুটা ধারণা গত বৃহস্পতিবার ইআরএফের ওই আলোচনা সভায় জানিয়েছিলেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি জানান, দেশের দুটি ফুসফুস ব্যাংক ও জ্বালানি খাত। এই দুই খাতে বড় ধরনের অনিয়মের কথা উল্লেখ করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ব্যাংক ও জ্বালানি খাতে বেশি লুটপাট হয়েছে। এসব তুলে ধরা হবে প্রতিবেদনে।
দুর্নীতি প্রসঙ্গে ওই অনুষ্ঠানে দেবপ্রিয় বলেন, ‘সাধারণ মানুষের যে ধারণা আছে তার চেয়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল। এমন একটি অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কোনো উত্তরাধিকার সরকারের করার কিছু থাকে না। ব্যাংক খাতে সমস্যা বেশি ছিল। তাৎক্ষণিক দূর করার চেষ্টা চলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর যতটা উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে, তা যদি সরকার দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে না পারে তবে দেশের মানুষকে ততটাই হতাশ করা হবে। এ জন্য বছর শেষে সরকারকে পাঁচ মাসের মূল্যায়ন উপস্থাপন করতে হবে। কী কী সরকারের দিক থেকে করা হয়েছে। এগুলো একত্রিত করে প্রকাশ করতে হবে। বাজেটের আগে চলমান পরিস্থিতিতে আগামী ছয় মাসের পরিকল্পনা প্রকাশ করতে হবে। এর মধ্যে মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, সরকারি ব্যয়, রাজস্ব আয় ও বৈদেশিক খাতের ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা তুলে ধরতে হবে।’
