এক দশকে হারিয়ে গেছে হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থীদের আন্দোলন

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৬:২০ পিএম

কেনেথ যখন হংকংয়ের ভিক্টোরিয়া পার্কের মধ্য দিয়ে হাঁটছিলেন— তখন তার মনের মধ্যে সেই স্মৃতি ফিরে আসতে শুরু করে, যা একসময় ছিল চীনের বিরুদ্ধে শহরটির আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। ছোটবেলায় নববর্ষ মেলায় কেনেথ গণতন্ত্রপন্থী রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে ক্যালিগ্রাফি পোস্টার কিনতেন।

তিয়েন আনমেন গণহত্যার প্রতিবাদে মাত্র ১২ বছর বয়সে কেনেথ ভিক্টোরিয়া পার্কের সমাবেশে অংশ নিতে শুরু করেন। যদিও তখন চীনের মূল ভূখণ্ডে আন্দোলন নিষিদ্ধ ছিল, তবে হংকংয়ে প্রকাশ্যে তিয়েন আনমেনে নিহতদের স্মরণ করা হয়েছিল।

তারপর কিশোর বয়সে তিনি যে প্রতিবাদ মিছিলে যোগ দিতেন, সেগুলো শহর প্রদক্ষিণের আগে এই ভিক্টোরিয়া পার্কে সবাই সমবেত হতো। সেই মিছিলগুলো এখন আর নেই, মেলায় রাজনীতিবিদদের স্টলগুলোও চলে গেছে। বিক্ষোভে এখন নীরবতা নেমে এসেছে এবং গণতন্ত্রপন্থী নেতাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কেনেথ মনে করেন, তার এবং হংকংয়ের আন্দোলনের স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলা হচ্ছে।

কেনেথ বিবিসির প্রতিবেদকের কাছে যে আন্দোলনের স্মৃতির কথা বলছিলেন সেটি হচ্ছে হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী ‘অক্যুপাই সেন্ট্রাল মুভমেন্ট’। প্রায় এক দশক ধরে হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থীদের এ আন্দোলন বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছিল। এই আন্দোলন ছিল স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল প্রতীক। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে বেইজিংয়ের কঠোর হস্তক্ষেপে হংকংয়ের এই আন্দোলন স্তব্ধ হয়ে গেছে। আজ এই সংগ্রামের ইতিহাস কেবল স্মৃতিতে বেঁচে আছে।

আন্দোলনের স্মৃতিচিহ্ন মুছে যাওয়ার বিষয়ে কেনেথ বিবিসিকে বলেন, ‘মানুষ এখনো জীবন নিয়ে চলে... তবে আপনি একটু একটু করে পরিবর্তনটি অনুভব করতে পারবেন।’

হংকংয়ের অক্যুপাই মুভমেন্ট তরুণদের দ্বারা পরিচালিত হলেও এর নেপথ্যে ছিলেন অধ্যাপক বেনি তাই নামে এক ব্যক্তি। যিনি হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর কম্পারেটিভ অ্যান্ড পাবলিক ল-এর আইনের অধ্যাপক। অহিংস পদ্ধতিতে, অনেকটা গান্ধীবাদী নীতির আলোকে হংকংয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা তার লক্ষ্য। তার এই গান্ধীবাদী নীতি অনুসরণ করেই তরুণরা, যাদের বেশিরভাগই ছাত্র, এই অক্যুপাই মুভমেন্টের জন্ম দিয়েছে।

মূলত, ১৯৯৭ সালে সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশ হংকং যখন চীনের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তখন শহরটি ৫০ বছরের জন্য বাকস্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনসহ কিছু অধিকার রাখবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেইজিংয়ের কঠোর দমননীতির কারণে অঞ্চলটির মধ্যে অস্থিরতা বাড়তে থাকে।

এর ফলে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হয় গণতন্ত্রপন্থীদের আন্দোলন, যা একসময় তীব্র বিক্ষোভে রূপ নেয়। টানা ৭৯ দিনের বিক্ষোভে আন্দোলনকারীদের দমাতে পুলিশ মরিচের গুড়া স্প্রে করে। আন্দোলনকারীরাও পুলিশের মরিচ স্প্রে প্রতিহতে ছাতা ব্যবহার করে, যা একপর্যায়ে ‘ছাতা আন্দোলন’ নামে পরিচিতি পায়।

অকুপাই সেন্ট্রাল নামে পরিচিত এই আন্দোলনটি অনেক তরুণ হংকংবাসীর মধ্যে রাজনৈতিক জাগরণ সৃষ্টি করে। ২০১৯ সালে তা বিশাল সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নেয়। অঞ্চলটির এমন আন্দোলন বেইজিংয়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। এ আন্দোলন দমাতে বেইজিং একটি জাতীয় সুরক্ষা আইন আরোপ করেছে, যাকে সমালোচকরা বলছেন— ‘স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ’।

হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থীদের দমাতে বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে দমনপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। একদশকে এ আন্দোলনের নেতৃত্বস্থানীয়দের মধ্যে ছিলেন— জোশুয়া ওয়ং, বেনি তাই, এবং রেভারেন্ড চু। বেইজিংয়ের কঠোর দমননীতির ফলে ‘অকুপাই মুভমেন্টের’ সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত আইন বিষয়ক পণ্ডিত বেনি তাইসহ অনেক নেতাকেই কারাগারে যেতে হয়েছে।

অনেক নেতা-কর্মীকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে, যার মধ্যে ২০১৪ সালের আন্দোলনের কয়েকজন নেতা রয়েছেন। শহরের সবচেয়ে বড় জাতীয় নিরাপত্তা মামলায় সাজার অপেক্ষায় রয়েছেন বেনি তাই। এছাড়া আন্দোলনের তৎকালীন ছাত্রনেতা জোশুয়া ওং এবং লেস্টার শুমও কারাগারে রয়েছেন।

বেইজিংয়ের এমন দমননীতির কারণে সমালোচকরা চীনকে ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তি থেকে সরে আসার জন্য অভিযুক্ত করেছেন। তারা বলছেন, এটি অঞ্চলটির বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে এবং হংকংয়ে গণতন্ত্রের দাবিকে দমন করেছে।

বিবিসি বলছে, হংকংয়ের ৭০ লাখেরও বেশি মানুষের মধ্যে কতজন বেইজিংয়ের এই আধিপত্যকে স্বাগত জানিয়েছে তা জানা অসম্ভব। তবে ২০১৪ সালে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে গত এক দশকে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে।

সবাই হয়তো এ আন্দোলন সমর্থন করেনি, তবে খুব কম লোকই দাবি করবে যে বেইজিং এটিকে দমন করেছে। একটি অশান্ত দশক শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হংকংয়ের মুক্ত হওয়ার আশার প্রদীপ নিভে গেছে। তবে চীন বলছে, তারা একটি অস্থিতিশীল শহরকে টিকিয়ে রেখেছে।

এদিকে জাতীয় সুরক্ষা আইনের (এনএসএল) মাধ্যমে শত শত লোককে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া গ্রেপ্তারের ভয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে হাজার হাজার হংকংবাসী। কেনেথের মতো কিছু আন্দোলনকারী তাদের স্মৃতি আঁকড়ে এখনো থেকে গেছেন। যাদের অনেকের মধ্যেই মুক্ত হংকংয়ের স্মৃতি বাস করে, যে জায়গাটি তারা বেইজিংয়ের আধিপত্য থেকে মুক্ত করার জন্য লড়াই করছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত