পরিবারের ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তার স্বপ্নে রাজধানীর পুরান ঢাকার আরমানিটোলার রূপালী সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেডে প্রায় আড়াই কোটি টাকা সঞ্চয় করেছিলেন ওই এলাকার বাসিন্দা আবুল কামাল দর্জী। টাকাগুলো শুধু তার একারই নয়, ছিল পরিবারের সবার জমানো শেষ সম্বল। কথা ছিল সঞ্চিত টাকার ওপর প্রতি মাসে পাবেন ৩০ শতাংশ হারে মুনাফা। সেই লাভের টাকা আবার দেওয়া হবে প্রতি মাসের প্রথম ১০ দিনের মধ্যে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রথম দিকে মুনাফার কিছু অংশ বুঝেও পান। কিন্তু গত ২৯ সেপ্টেম্বর কামালসহ আরও বেশ কয়েকজন গ্রাহক ওই সমবায় সমিতির অফিসে যাওয়ার পর তাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। দেখতে পান কার্যালয়টিতে ঝুলছে বড় এক তালা, কর্মকর্তাদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের বহু চেষ্টা করেও হন ব্যর্থ।
আবুল কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছেলেমেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা যা সম্বল ছিল তার সবই সঞ্চয় করে রেখেছিলাম সমিতিতে। সঞ্চয়ের প্রথম দিকে কিছু লাভের অংশও পেয়েছি। কিন্তু সরকার পতনের পরবর্তী সময়ে তাদের আর তেমন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। গত ৫ আগস্টের পর সঞ্চয়ের টাকা চাওয়া হলে তারা টাকা দেবে দিচ্ছি বলে সময়ক্ষেপণ করছিল। শেষে অফিসে তালা দিয়ে পালিয়ে যায়। এরপর আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি।’ আবুল কালামের মতো এই রূপালী সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতির লোভনীয় মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাতা প্রতারণার ফাঁদে পড়ে এখন দিশেহারা পাঁচশর বেশি মানুষ।
তবে চক্রটির প্রতারণার গল্পের এখানেই শেষ নয়, রূপালী সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি ছাড়াও আরও দুটি নামসর্বস্ব সমবায় সমিতি গড়ে দুই সহোদর ও এক ভাগ্নে মিলে পথে বসিয়েছেন হাজারের বেশি গ্রাহককে। দুই ভাই আর ভাগ্নে মিলে চালাতেন কথিত সমিতিগুলো। নানা চটকদার সুযোগ-সুবিধার প্রতিশ্রুতির ফাঁদে ফেলে সঞ্চয়কারীদের আকৃষ্ট করে হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা। আর এ চক্রের ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব খুইয়ে ফেলাদের তালিকা থেকে বাদ যাননি সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা থেকে শুরু করে শ্রমজীবীসহ কোনো পেশার মানুষই। কষ্টার্জিত টাকা ফিরে পাওয়ার আশায় তারা এখন প্রতারক মামা-ভাগ্নেকে খুঁজে বের করার চেষ্টার পাশাপাশি থানা পুলিশসহ ঘুরছেন সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে।
নামসর্বস্ব অন্য দুটি সমবায় সমিতি হলো পুরান ঢাকারই সোনালী শ্রমজীবী সমিতি এবং মধুমতী কো-অপারেটিভ লিমিটেড। এর মধ্যে রূপালীর ম্যানেজার (ব্যবস্থাপক) সৈয়দ জাফর আলী ও মধুমতীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. হারুন আর রশীদ দুই সহোদর। আর তাদের ভাগ্নে (বড় বোনের ছেলে) রাকিবুল হলেন সোনালী শ্রমজীবী সমিতির এমডি। পারিবারিক এ তিন সমিতির মাধ্যমে এক হাজারের বেশি গ্রাহকের অন্তত ৫০ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে।
এ সমিতিগুলোর গ্রাহকের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তিনামায় উল্লেখ রয়েছে, গ্রাহকরা যে টাকা জমা রাখবেন সেই টাকার ওপর প্রতি মাসে ৩০ শতাংশ হারে লাভ দেওয়া হবে। অথচ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো জমা থাকা আমানতে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ মুনাফা দেয়। কিন্তু ওই তিনটি সমিতির কর্মকর্তারা ৩০ শতাংশ মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষদের ফাঁদে ফেলে বিপুল পরিমাণ টাকা লোপাট করেছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, লাভের অংশ মাসের প্রথম ১০ দিনের মধ্যে দেওয়া হবে। এ ছাড়া গ্রাহকের যখন টাকার প্রয়োজন হবে তখন টাকা তোলা যাবে। কিন্তু গ্রাহকরা যখন টাকা তোলার কথা বলেন তারপর থেকেই দফায় দফায় সময় নিয়ে গ্রাহকদের ঘোরাতে থাকেন সমিতির কর্মকর্তারা।
এসব ঘটনায় রাজধানীর বংশাল থানায় পৃথক পৃথক মামলাও করেন ভুক্তভোগীরা। মামলার পর রূপালী সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতির এমডি সাজ্জাদ ও ম্যানেজার জাফর আলী গ্রেপ্তার হলেও এখনো অধরা সমিতির অন্য অংশীদার ও কর্মকর্তারা। তবে সমিতির টাকায় খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি ও দোকান কেনার তথ্য রয়েছে।
যেকোনো সমিতি গঠন করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন সমবায় অধিদপ্তরের অনুমোদন। পুরানা ঢাকার ওই তিনটি সমিতিরও সরকারি রেজিস্ট্রেশন রয়েছে। সরকারি অনুমোদন সত্ত্বেও সমিতির নামে টাকা আত্মসাতের বিষয় জানতে চাইলে সমবায় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘কোনো সমিতি যদি টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় বা টাকা জমা দেওয়ার পরেও টাকা না দেয়, তাহলে সমবায় অধিদপ্তরে অভিযোগ করলে একজন পরিদর্শক নিয়োগ করে সমবায় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। নিয়োগকৃত পরিদর্শক যে সুপারিশ করবে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনেক ক্ষেত্রে সমবায় অধিদপ্তরের কোনো রেজিস্ট্রেশন না নিয়ে সমিতি করে অনিয়মের অভিযোগ ওঠা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ ছাড়া সমিতির নামে প্রতারাণা দূর করতে অডিট বাড়ানোসহ নানা পরিকল্পনা রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করলে প্রতারণার কবল থেকে বের হতে পারব।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কেউ কেউ তাদের সারা জীবনের সঞ্চয় এ তিন সমিতিতে জমা দিয়ে পথের ফকির হয়েছে। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে, প্রথম দিকে লাভ দিয়ে এ চক্রটি সমবায় সমিতির নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। সমিতির নামে টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে যাওয়া চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বেশিরভাগ গোপালগঞ্জ জেলার। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরে তারা কিছুদিন চুপচুাপ থাকলেও পরে তিনটি সমিতিতেই তালা দিয়ে পালিয়ে গিয়েছে।’
জানা গেছে, সমিতির নামে টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগে থানায় মামলা হলে রূপালী সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতির এমডি সাজ্জাদ ও ম্যানেজার জাফর আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু রূপালী সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতির চেয়ারম্যান আজিজ খান এখনো রয়েছেন অধরা। অভিযোগ উঠেছে, আজিজ খানের মেয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হওয়ায় তাকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না। আজিজের মালিবাগের বাসায় খোঁজ নিলেও তার দেখা মেলেনি। দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে রয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে একটি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বংশাল থানার এসআই সজল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সমিতির টাকা আত্মসাতের মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়ছে। সমিতির চেয়ারম্যান আজিজকে গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে।’
তবে ভুক্তভোগী এক গ্রাহক জানিয়েছেন, থানা পুলিশ এ মামলায় তেমন অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। যে কারণে মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
ভুক্তভোগী আবুল কালাম দর্জীর করা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, আরমানিটোলার আমানকোর্টের তৃতীয় তলার রূপালী সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেড ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। যার রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৬১৭। এই সমিতিতে আবুল কালামের পরিবারের সদস্যরা এফডিআর হিসেবে ২ কোটি ১৭ লাখ এবং ডিপিএস হিসেবে ২২ লাখ টাকা (বিভিন্ন মেয়াদের) জমা রাখেন। প্রথমে লাভের অংশের টাকা দেওয়া হলেও সরকার পরিবর্তনের পর কর্মকর্তাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যায়নি।
গ্রাহকদের টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে বক্তব্য জানতে মামলার নথিতে থাকা আসামিদের মোবাইল ফোন নম্বরে কল করলে সবকটিই বন্ধ পাওয়া যায়।