ঢাকা নগরের বয়স আড়াই হাজার বছরের বেশি। কিন্তু রাজধানী হিসেবে ঢাকার বয়স ৪০০ বছর চলছে। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও আদর্শ নগর হিসেবে গড়ে ওঠেনি এই মেগাসিটি। একটি শহরে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু রাখার জন্য অন্তত ২৫ শতাংশ রাস্তা প্রয়োজন। আর ঢাকায় রাস্তা আছে ৯ শতাংশ। এই ৯ শতাংশের মধ্যেই বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করছে। কিন্তু গণপরিবহন চলাচলের রাস্তার দুই পাশ ক্রমাগত সরু হয়ে আসছে। বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়ী রাস্তা দখল করে তাদের ব্যবসা চালাচ্ছেন। আর গাড়ির চালকরা ট্রাফিককে ‘ম্যানেজ’ করে লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি নিয়ে দাপটের সঙ্গে রাজধানীর বুক চষে বেড়াচ্ছেন।
গাড়ির ফিটনেস, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং ট্রাফিক আইন চালকরা মানছেন কি না, তা পর্যবেক্ষণ করার কথা ট্রাফিক পুলিশের। কিন্তু তা হারিয়ে গেছে অনেক দিন। কারণ অবাধে চলছিল ঘুষবাণিজ্য। আগে রাজধানীর গণপরিবহনে টোকেন বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ ছিল ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে। সরকার পরিবর্তনের পর তিন মাসের বেশি সময় ধরে বেশিরভাগ জায়গায় বন্ধ টাকা তোলা। দিন যত যাচ্ছে, ঘুষগতি বাড়ানোর জন্য ট্রাফিক পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ফের ‘টোকেন বাণিজ্য’ চালুর জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যার অংশ হিসেবে ভীতি ছড়াতে গণপরিবহনের বিরুদ্ধে গণহারে মামলা দেওয়া হচ্ছে। এমনটিই দাবি করছেন পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে শনিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হতো। এই চাঁদার ভাগ যেত বিআরটিএ কর্মকর্তা-কর্মচারী, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশের সদস্য, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতা, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের পকেটে। গত মার্চ মাসে ‘ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস পরিবহন ব্যবসায় শুদ্ধাচার’ শীর্ষক ওই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল টিআইবি।
আগে ব্যক্তিগত যানের তুলনায় গণপরিবহনের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ছিল অনেক কম। কিন্তু আগের মতো টাকা না উঠানোর ফলে এখন গণপরিবহনের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া বেড়েছে। জানা গেছে, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৬৬ হাজার ১০১টি। যার মধ্যে গণপরিবহনের সংখ্যাই বেশি বলে দাবি করেছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। একজন বাস মালিক জানাচ্ছেন ‘কিছু কিছু ট্রাফিক পুলিশ আছে, তারা আগের মতো সড়ক থেকে বাসপ্রতি টাকা না পাওয়ায় ইচ্ছামতো মামলা দিচ্ছে। আমার বেশিরভাগ গাড়ির কাগজ এখন পুলিশের কাছে। প্রায় সব গাড়ির নামে মামলা দেওয়া। এখন সড়ক থেকে যে টাকা আয় হয়, তার বেশিরভাগই মামলায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে পরিবহন ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারব না।’ আরেকজন বলেছেন ‘সড়ক থেকে গাড়িপ্রতি বিভিন্ন পয়েন্টে টাকা তোলা বন্ধ আছে। যার জন্য ট্রাফিক পুলিশের কিছু অসাধু সদস্যের আয় বন্ধ। বেশিরভাগ বাস চুক্তি হিসেবে মালিকের কাছ থেকে নেন শ্রমিকরা। কিন্তু যে হারে মামলা দেওয়া হচ্ছে তাতে আয়ের পুরো টাকা শ্রমিককে মামলার পেছনেই দিতে হচ্ছে। শ্রমিকদের এখন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা দশা হয়েছে।’ এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) খোন্দকার নাজমুল হাসান যা বলেছেন, অতীতেও একই রকম কথা অনেকবার জানা গেছে। কিন্তু ঘুষবাণিজ্য বন্ধ হয়নি।
এক সময় দেখা গেছে, ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে ট্রাফিক বক্সের সামনে প্রতিদিন সারিবদ্ধভাবে ব্যাটারিচালিত অটো-সিএনজি এবং পণ্য পরিবহনকারী ট্রাক। এসব গাড়ি থেকে রেকারিং এবং ডাম্পিংয়ের বিল আদায় করা হতো। আর যাদের মান্থলি করা রয়েছে কয়েক ঘণ্টা আটকে রেখে তাদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। পরে এসব অবৈধ গাড়ি আবার সড়কে চলছে। এসব লোকদেখানো ডাম্পিং আর রেকার বিল শুধু সিএনজি, অটোরিকশা এবং ট্রাকের বেলায়। পাবলিক বাস, লেগুনার ক্ষেত্রে কোনো ডাম্পিং বা রেকার জরিমানা হচ্ছে না। কারণ এসব পরিবহনের মালিকরা সময়মতো সপ্তাহ (চাঁদার টাকা) পরিশোধ করছেন। সড়কে অনেক বছর ধরে বন্ধ আছে নতুন গাড়ি নামানো। আবার পুরনো গাড়ি থাকায় অনেকে গণহারে মামলার শিকার হচ্ছেন। ‘ঘুষ’ বাণিজ্যই যদি হয় নিয়মের নাম তাহলে দুর্নীতির শ্রেষ্ঠ শহর হিসেবে খ্যাতি পাবে ঢাকা। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে, এই ‘ঘুষস্রোত’ কে আটকাবে?
