যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান পেশায় ছিলেন অভিনেতা। অধিকাংশ গবেষণায় তিনি ১০ সেরা মার্কিন প্রেসিডেন্টের একজন। তার সাফল্যের কারণ ছিল একদল চৌকস ও পেশাদার আমলা। যারা সঠিক তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রেসিডেন্টকে সফল করার জন্য নিবেদিত ছিলেন। রিগ্যানের প্রশাসনবিষয়ক কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না।
কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশাসনবিষয়ক বিস্তর অভিজ্ঞতা থাকার পরও তিনি শেষপর্যায়ে এসে বিতর্কিত আমলাদের ওপর নির্ভর করেছিলেন। তারা যতটা না সরকারকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন, তার চেয়ে বেশি নিজেদের আখের গুছিয়েছেন। স্বার্থের জন্য একচোখা নীতি অনুসরণ করেছেন। কখনো কখনো তারা শেখ হাসিনার চেয়েও বড় আওয়ামী লীগার বলে দাবি করতেন। এ ধরনের আমলাদের কারণে প্রশাসনে বিভক্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
যাদের হাতে প্রশাসন সবচেয়ে দলীয়করণ হয়েছে, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সাবেক জনপ্রশাসন সচিব, পরে মুখ্যসচিব হওয়া কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। দল না করার কারণে বা নিজের মতাদর্শের অনুসারী না হওয়ায় বহু অফিসারকে তিনি পদোন্নতিবঞ্চিত করেছেন। জনপ্রশাসন সচিব পদাধিকার বলে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) সদস্য। এই অস্ত্র ব্যবহার করে তিনি কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করেছেন। বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদও তার রোষের শিকার। বিভাগীয় মামলায় তদন্তে নির্দোষ প্রমাণ হলেও গায়ের জোরে কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী তদন্ত প্রতিবেদন আটকে রেখে তাকে কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছিলেন। আটকে রেখেছিলেন তার পদোন্নতি।
প্রশ্ন উঠতে পারে, যাদের হাতে প্রশাসন দলীয়করণ হলো, বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তারা কি পদবঞ্চনার শিকার হয়েছিলেন? নাকি যোগ্যতার ভিত্তিতে স্বাভাবিক পদ পেয়েছিলেন।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে ২০০৪ সালে উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পান কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। এরপর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের সময় সরকারের শীর্ষপদগুলোয় ছিলেন তিনি। হয়েছেন তথ্য সচিব, শিক্ষা সচিব, সিনিয়র সচিব (জনপ্রশাসন) ও মুখ্য সচিব। এসব পদে থেকে তিনি প্রশাসনকে দলীয়করণে মুখ্য ভূমিকা রাখেন। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচনকালে মাঠে কারা কারা থাকবেন, সেই পরিকল্পনাকারীও তিনি। পরে মাঠপ্রশাসনের সহায়তায় রাতে ভোট করা হয়েছে।
কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী তার নিকট-আত্মীয়দের পদোন্নতির পথ সুগম করেছিলেন। প্রতিরক্ষা সচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরী ছিলেন তার আপন ভাই। ২০২০ সালের ২৯ জুন কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষাসেবা বিভাগের সাবেক সচিব আবদুল্লাহ আল মাসুদ চৌধুরীও কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীর আপন ভাই। সিভিল সার্ভিসে একই সময়ে তিন ভাই দাপটের সঙ্গে ছিলেন। মুজিব জন্মশতবার্ষিকীর দায়িত্ব নিতে তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট ডক ফেলোশিপে সুযোগ পেয়েও যাননি আর সেই জন্মশতবার্ষিকীতে হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ এখন সবচেয়ে চর্চিত।
কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীর স্ত্রী ইফফাত আরা কামালও ছিলেন অতিরিক্ত সচিব। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য কাজী সালাহউদ্দীন আকবরও কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীর নিকটাত্মীয় ছিলেন।
কামাল চৌধুরী এসবের পুরস্কার পেয়েছেন। ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেয়েছেন। সচিব থেকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হয়েছেন। এরপর মুখ্য সচিব পদমর্যাদায় বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদযাপন কমিটির সমন্বয়কারী হয়েছিলেন। সবশেষ নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করার পর শেখ হাসিনা তাকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা নিয়োগ করেন।
শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনে তার বিচরণ কামাল চৌধুরী নামে। অনেক কবি-সাহিত্যিককে ‘নিজের মতাদর্শী’ না হওয়ার অপরাধে তাদের ন্যায্যতা থেকে বঞ্চিত করেছেন। স্বাধীনতাপন্থি হওয়ার পরও শুধু কামাল চৌধুরীর পছন্দের না হওয়ায় তারা সরকারের কাছে ঘেঁষতে পারেননি। সাহিত্যে, বিশেষ করে কবিতার ওপর কাজের জন্য তিনি সাহিত্য মহলে পরিচিত। বাংলা কবিতায় অবদানের জন্য ২০১১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০২২ সালে একুশে পদক পান।
৫ জনের ১০ হাতে প্রশাসন দলীয়
দামেস্ক ছেড়ে পালালেন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ
একনজরে আজকের দেশ রূপান্তর (৮ ডিসেম্বর)