কটু কথা শুনেও শৃঙ্খলা ফেরাতে রাস্তায় ওরা

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ০১:১৮ পিএম

ইডেন মহিলা কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী তাসলিমা রহমান। পার্ট টাইম হিসেবে গত ১ মাস ধরে চার ঘণ্টা করে ট্র্যাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করছেন। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাকে নানা কটু কথা শুনতে হচ্ছে। প্রায়শই চালকরা তাকে নানা বাজে কথা বলেন। তবুও দেশের কথা চিন্তা করে তিনি এই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

রাজধানীর আসাদ গেট এলাকায় ট্র্যাফিক দায়িত্ব পালন করছেন দুই শিক্ষার্থী

আজ রবিবার (৮ ডিসেম্বর) রাজধানীর আসাদ গেটে তাকে ট্র্যাফিক সামলাতে দেখা গেছে। মূল সড়কে রিকশা উঠতে না দেওয়া, নির্দিষ্ট স্থানে বাস থামানো, হেলমেট ছাড়া বাইক চলাচল এসব বিষয়ে তাকে তদারকি করতে দেখা যায়। এসময় ট্র্যাফিক পুলিশের এই কাজ সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি গত একমাস ধরেই আসাদ অ্যাভিনিউ ও আসাদ গেটে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। দায়িত্ব পালনে অনেক সময় বাস ও বাইক চালকরা আমাকে কটু কথা শোনান। তারা আমাদের এই কাজকে ভালো ভাবে নেন না। কারণ আমরা থাকলে তাদের আইন মানতে বাধ্য করি। ফলে অনেক সময় তারা আমাদের উপর রাগান্বিত হন। এসব শুনেও আমরা দেশের স্বার্থে এই কাজ করে যাচ্ছি।’

ট্রাফিকে গত এক মাসের অভিজ্ঞতার বিষয়ে জানতে চাইলে তাসলিমা রহমান আরও বলেন, ‘এই দায়িত্ব পালন অনেক কঠিন। কারণ রাস্তায় সব ধরনের যানবাহন চলাচল করে। যাত্রী থেকে চালক সবার মধ্যেই আইন মানার বিষয়ে এক ধরনের অনীহা রয়েছে। রাজধানীর সব গুরুত্বপূর্ণ মোড়েই যাত্রীছাউনি রয়েছে। তবুও যাত্রীরা রাস্তায় মাঝেই দাঁড়িয়ে বাসে উঠার চেষ্টা করেন। এই সুযোগে বাস চালকরাও রাস্তায় মধ্যে বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী উঠানামা করান। যেটা আইনের লঙ্ঘন। আমার মতে, যাত্রী ও চালক দুই পক্ষকেই আইন মানার বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে। তাহলে রাজধানীর যানজট এমনিতেই কমে যাবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে দুই শিফটে ২৯০ জন শিক্ষার্থী ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত এক শিফট, আর বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এই দুই শিফটে শিক্ষার্থীরা কাজ করে যাচ্ছেন। একজন শিক্ষার্থী এক সপ্তাহ এক স্থানে কাজ করার পর তাদের স্থান পরিবর্তন করা হয়। প্রতিদিন সকালে কাজে যোগদান করার সময় ও কাজ শেষে যাওয়ার সময় নির্দিষ্ট খাতায় সিগনেচার করতে হয়। আর এই কাজের জন্য শিক্ষার্থীদের দৈনিক ৫০০ টাকা সম্মানী দেওয়া হবে। এই টাকা মাস শেষে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে।

এদিকে গত ৩০ অক্টোবর শিক্ষার্থীরা পার্ট টাইম হিসেবে চার ঘণ্টা করে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানান যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ। তিনি ওইদিন সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, ট্র্যাফিক পুলিশের সহায়ক হিসেবে দৈনিক চার ঘণ্টার জন্য শিক্ষার্থীদের সহায়ক পুলিশ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণে ৭০০ ছাত্রকে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে ৩০০-৪০০ জন নেওয়া হবে। তারা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে কাজ করবে। সকাল এবং বিকেল এই দুই সময়ে যানজট বেশি থাকে, তাই চার ঘণ্টা করে তারা এই কাজ করবেন।

ফুল টাইম নিলে সরকারের অর্থ বেশি লাগবে। পার্ট টাইম হিসেবে নিলে শিক্ষার্থীদেরও আয়ের ব্যবস্থা হলো। বিশ্বের উন্নত অনেক দেশেই শিক্ষার্থীদের সরকারি বিভিন্ন কাজে সুযোগ দেওয়া, যোগ করেন যুব উপদেষ্টা।
এই শিক্ষার্থীদের পরে মূল বাহিনীতে তাদের যুক্ত করা হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সুযোগ থাকলে পরে এটি ভাবা হবে।’

বরিশালের সিয়াম মৃধা উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্তুতি নিতে ঢাকায় এসেছেন। আর্থিক অনটনের কারণে সকালের শিফটে ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। আজ আসাদ গেটে তার সঙ্গে এই দায়িত্বের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তেজগাঁও জোনের হয়ে এই দায়িত্ব পালন করছি। এই দায়িত্ব পালন বেশ কঠিন। কারণ আমাদের দেশে আইন না মানার প্রতিযোগিতা চলে। ফলে রাস্তায় যানজট লেগেই থাকে। তবে ৫ আগস্ট পরের অবস্থার তুলনায় এখন রাস্তায় কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরেছে।’

এই কাজ কেন করছেন জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, এটা দেশের স্বার্থেই করছি তবে আমিও কিছুটা আর্থিকভাবে উপকৃত হচ্ছি। এছাড়াও এই কাজ করতে গিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা হচ্ছে আমার। যা ভবিষ্যতে কাজে লাগবে বলে আমি প্রত্যাশা করছি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই উদ্যোগ খুবই কার্যকরী বলে আমার মনে হয়। কারণ অন্যান্য দেশে পার্ট টাইমে এসব কাজের সুযোগ রয়েছে। এতে দেশ যেমন উপকৃত হয়, তেমনি অস্বচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীরাও উপকৃত হয়। তাই এ ব্যবস্থা যাতে অব্যাহত থাকে সেই প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করেছেন।’

এসব বিষয় নিয়ে আসাদ অ্যাভিনিউ দায়িত্বরত পুলিশের সার্জেন্ট মোছাদ্দেক রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসাদ অ্যাভিনিউতে বিকেলের শিফটে শিক্ষার্থীরা ট্র্যাফিক দায়িত্ব পালন করেন। তবে সকালে আসাদ গেট, মোহাম্মদপুর সহ কয়েকটি স্থানে শিক্ষার্থীরা দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষার্থীরা আমাদের সঙ্গে কাজ করায় অনেক উপকার হচ্ছে। এছাড়াও ট্র্যাফিক পুলিশের দায়িত্ব সম্পর্কে তারা বিস্তারিত জানার সুযোগ পাচ্ছে। এই বিষয়গুলো তারা সহপাঠীদের সঙ্গে  েশয়ার করছে, এতে ট্র্যাফিক মানার বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একধরনের আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। তাই সবমিলিয়ে এই কার্যক্রম প্রশংসার সঙ্গেই এখন পর্যন্ত পালিত হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত