সিরিয়ায় নতুন সকাল

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৮:২৯ এএম

বিদ্রোহীদের আচমকা আক্রমণে পতন হয়েছে সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের। অবসান হয়েছে তার ২৪ বছরের কথিত দুঃশাসনের। ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে করে রাজধানী দামেস্ক ছেড়ে পালিয়েছেন তিনি। গতকাল রবিবার দিনের শুরুতে বাশারের দপ্তর তার পালিয়ে যাওয়া নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলেও, দিনের শেষ ভাগে এসে তার পতন ও পলায়নের খবর নিশ্চিত করে মিত্র দেশ রাশিয়া। এরপর রাশিয়ার বার্তা সংস্থা তাস ও রিয়া নভস্তির বরাত দিয়ে রাতে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাশার তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মস্কোয় পৌঁছেছেন। মানবিক দিক বিবেচনা করে রাশিয়া তাদের রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে।

এর আগে দিনের প্রথম ভাগে সিরিয়ার সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেও বাশারের দামেস্ক ছাড়ার তথ্য রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছিলেন দুই সেনা কর্মকর্তা। তবে তিনি কোথায় গেছেন সে ব্যাপারে তখন কিছু বলা হয়নি। অবশ্য কিছুদিন আগেই বাশার তার স্ত্রী-সন্তানদের রাশিয়ায় পাঠিয়ে দেন বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। অবশ্য বাশার সরকারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ ঘাজি আল-জালালি এখনো দেশে আছেন এবং তিনি নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর ও নির্বাচনের কথা বলেছেন।

গতকাল বিদ্রোহীরাও জানিয়েছে, দামেস্ক এখন আসাদমুক্ত। তারা রাজধানী দামেস্কে প্রবেশ করেছে, যেখানে সেনার কোনো উপস্থিতি দেখা যায়নি। শহরের সেদনায়া এলাকায় একটি বড় কারাগার থেকে বহু বন্দিকে মুক্ত করেছে তারা। বিবিসি বলছে, দামেস্কে ইরানের দূতাবাসেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। বাশারের বাসভবনেও বিদ্রোহীরা লুটপাট চালিয়েছে। অবশ্য বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শামের (এইচটিএস) প্রধান আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে হামলা না চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন। নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরই দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলেন তিনি।

এদিকে বাশারের আকস্মিক পতনের পর ইরান সিরিয়ায় থাকা তার সেনাসদস্য ও কর্মকর্তাদের নিজ দেশে ফিরতে বলেছে। রাশিয়াও হয়তো শিগগিরই সিরিয়া থেকে তাদের গুটিয়ে নেবে। কারণ সিরিয়ার বিদ্রোহীরা মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মদদ পেয়েছে। তাই রুশ বা ইরানি সেনাদের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক হবে না বলেই ধরে নেওয়া যায়। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিতে যাওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, সিরিয়ার সংঘাত বা সংকটে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের খুব বেশি জড়াবে না।

বিবিসি বলছে, গতকাল সকালেই বিদ্রোহীরা ঘোষণা দেয়, তারা সিরিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হোমস দখল করেছে। এরপর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো নাতাশা হল বিবিসিকে বলেছিলেন, এর মাধ্যমে ১৯৭০-এর দশকে শুরু হওয়া আসাদের পরিবারের ৫৪ বছরের স্বৈরশাসনের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেছিলেন, ‘এ পরিস্থিতি একাধিক কারণের ফল। আসাদের মিত্র ইরান ও রাশিয়া বৈশ্বিক ঘটনাবলির চাপে দুর্বল ও মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে এবং অনেকেই উদ্বাস্তু শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছে। আসলে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।’

সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের শাসনের শুরু হয় ১৯৭০ সালে। ৫৪ বছর ধরে এ পরিবার দেশটির রাজনীতিতে একক আধিপত্য ধরে রেখেছে। তাদের শাসনামল চিহ্নিত হয়েছে গৃহযুদ্ধ, গণহত্যা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য। বাশারের বাবা হাফিজ আল-আসাদ ১৯৭০ সালে একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। সিরিয়ার বাথ পার্টির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা এবং সামরিক বাহিনীতে শক্তিশালী অবস্থানের কারণে তিনি ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেন। তার শাসন ছিল কেন্দ্রীয়করণ এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। ১৯৮২ সালে হামা শহরে মুসলিম ব্রাদারহুডের বিদ্রোহ দমনে তার আদেশে যে গণহত্যা চালানো হয়, তাতে ১০ থেকে ২০ হাজার মানুষ নিহত হয়। এ ঘটনা তার শাসনের এক কালো অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে লেখা রয়েছে।

২০০০ সালে বাশার ক্ষমতায় আসেন। পেশায় একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ বাশারকে প্রথমে একজন সংস্কারপন্থি নেতা হিসেবে দেখা হলেও, ক্ষমতায় আসার পর তিনি তার বাবার মতোই কঠোর নীতি অনুসরণ করেন।

২০১১ সালে আরব বসন্তের ঢেউ সিরিয়ায় পৌঁছানোর পর বাশারের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং মুক্তির দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে, যা আসাদের শাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। তবে আসাদ সংলাপের পরিবর্তে কঠোর দমননীতি গ্রহণ করেন। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর সামরিক অভিযান, বোমাবর্ষণ এবং রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের কারণে দেশটি ধীরে ধীরে গৃহযুদ্ধের মধ্যে ডুবে যায়। গতকাল রাজধানী দামেস্কে ঢুকে পড়ে বিদ্রোহীরা।

বিদ্রোহীরা জানিয়েছে, তারা বিনা বাধায় রাজধানীতে প্রবেশ করেছে। সরকারের সেনাবাহিনীর কাছ থেকে কোনো ধরনের প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়নি তাদের। বিদ্রোহীরা বলছিল, আমরা সিরিয়ার মানুষদের একটি সুসংবাদ জানিয়ে উদযাপনে মেতে উঠতে চাই। বন্দিদের শৃঙ্খল খুলে মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। আমরা সেদনায়া কারাগারে অন্যায়ভাবে মানুষকে বন্দি রাখার কালো যুগের অবসান ঘোষণা করছি। এই কারাগারে আসাদের সরকার হাজারো মানুষকে বন্দি রেখেছিল।

গত শনিবার বিদ্রোহীরা ঘোষণা দেয়, তারা গুরুত্বপূর্ণ শহর হোমসের দখল নিয়েছে। মাত্র এক দিনের যুদ্ধেই এ শহর দখল করে নেয় তারা। সে সময়ই বাশারের ২৪ বছরের ইস্পাতকঠিন শাসনের ভাগ্য সুতোয় ঝুলতে শুরু করে। গতকাল সকালে দামেস্কের কেন্দ্রে বিচ্ছিন্নভাবে গুলির শব্দ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন বাসিন্দারা। তবে গোলাগুলির উৎস সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হতে পারেনি রয়টার্স। হোমস শহরে সরকারি বাহিনীর পতন ও সেনা প্রত্যাহারের পর হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে এসে নেচে-গেয়ে উল্লাস প্রকাশ করে।

বিদ্রোহীরা আকাশে গুলি ছুড়ে উদযাপন করে। তরুণ-তরুণীরা সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের পোস্টার ছিঁড়তে থাকেন। হোমসের পতনেই আসাদের নিয়তি নির্ধারণ হয়। কৌশলগত দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ অঞ্চলের মধ্য দিয়েই আসাদের মূল শক্তির কেন্দ্র থেকে দামেস্কের যোগাযোগ ছিল। হোমস হাতছাড়া হওয়ায় রুশ মিত্রদের নৌ ও বিমানঘাঁটির সঙ্গে দামেস্ক কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শামের নেতা আবু মোহাম্মদ আল-জালোনি হোমস দখলের ঘটনাটি এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে আখ্যা দেন এবং তার গোষ্ঠীর যোদ্ধাদের অহেতুক রক্তপাতে না জড়ানোর এবং যারা অস্ত্রত্যাগ করেছে, তাদের কোনো ধরনের আঘাত না দেওয়ার নির্দেশ দেন।

সিরিয়া পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যুক্তরাষ্ট্র : হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সিরিয়ার নজিরবিহীন পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মুখপাত্র শন স্যাভেট এক বিবৃতিতে বলেন, প্রেসিডেন্ট বাইডেন ও তার দল সিরিয়ার নজিরবিহীন ঘটনাগুলোর ওপর নজর রাখছেন। তিনি আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন।

তবে দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট হতে যাওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘সিরিয়ার অবস্থা জগাখিচুড়ি, তবে দেশটি আমাদের বন্ধু নয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের এ বিষয়ে কিছুই করার নেই। এটি আমাদের লড়াই নয়। বিষয়টি তাদের ওপরই ছেড়ে দিন। এর সঙ্গে জড়াবেন না!’ সিরিয়ান বিদ্রোহীরা গত মাসের শেষ থেকে এবারের আক্রমণ শুরু করার পর, প্রথমবার স্থানীয় সময় শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ‘রাশিয়া ইউক্রেনে এতটাই জড়িয়ে পড়েছে, যে দেশটিকে তারা এত বছর ধরে সুরক্ষা দিয়ে এসেছে, সেই সিরিয়ায় এই সহজ বিদ্রোহ থামাতেও তারা অক্ষম বলে মনে হচ্ছে।’

জো বাইডেনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান ক্যালিফোর্নিয়ায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র... সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে সামরিকভাবে জড়াবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে যাতে ইসলামিক স্টেট (আইএস) যুদ্ধের ফলে উদ্ভূত সুযোগগুলো কাজে লাগাতে না পারে।’

দেশ নিরাপদ ধরে ফিরছেন শরণার্থীরা : কথিত আরব বসন্ত ব্যর্থ হওয়ার পর সিরিয়া গত ১৩ বছরের বেশি সময় ধরে ছিল গৃহযুদ্ধের জ¦লন্ত উনুন। প্রাণ বাঁচাতে এ সময়ে প্রায় এক কোটি মানুষ প্রতিবেশী দেশ লেবানন, জর্ডান, তুরস্কসহ বেশ কয়েকটি দেশে আশ্রয় নেয়। এর মধ্যে কিছু মানুষ অবশ্য দেশে ফিরেছে। দুই বছর আগে তুরস্কে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর সেখানকার আশ্রয় হারানো কয়েক লাখ শরণার্থী দেশে ফিরে আসে। এরপর গত বছর লেবাননের হিজবুল্লাহ গোষ্ঠী ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানোর পর সেখান থেকেও কিছু শরণার্থী সিরিয়ার পথ ধরে; যা গত কয়েক মাস ধরেই চলমান ছিল। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, মাতৃভূমিতে ফেরা অনেক শরণার্থীও যোদ্ধা হিসেবে বাশারের পতনে ভূমিকা রাখে। গতকাল বিবিসি বলেছে, সংশ্লিষ্ট দেশের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, নিজ দেশে ফেরার জন্য লেবানন ও জর্দান সীমান্তে জড়ো হচ্ছে হাজার হাজার সিরিয়ার শরণার্থী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত