হিসাবের গরমিল শুধরে নেওয়ার সুযোগ

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৫:৩৪ এএম

সেন্ট কিটসে তিন ওয়ানডের সিরিজের প্রথম ম্যাচটা শেষ পর্যন্ত হেরেই গেল বাংলাদেশ। আগে ব্যাট করে ৬ উইকেটে ২৯৪ রান তোলার পর, ২৭ রানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম দুটো উইকেট তুলে নেওয়ার পরও বাংলাদেশ ম্যাচটা হেরেছে ১৪ বল বাকি থাকতে। ম্যাচের অনেকটা সময় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারার পরও কেন হেরে গেল বাংলাদেশ? ২০ রান কম আর বেশি আফসোসের বাইরে নির্জলা সত্য হচ্ছে, আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুরই হারিয়েছে মেহেদী হাসান মিরাজের দলকে।

ম্যাচ হারের পর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে মিরাজ প্রথমেই বলেন, ‘আমরা যে রানটা করেছি তাতে আমরা সন্তুষ্ট। এই উইকেটে ২৯৪ রান খুবই ভালো সংগ্রহ।’ নির্জলা সত্যিটা হচ্ছে, ২০২৪ সালে এসে ব্যাটিং উইকেটে ২৯৪ রান নিরাপদ নয়, যেটা বুঝেও হয়তো বুঝতে চাইছেন না মিরাজ। কিংবা বছর জুড়ে বেশিরভাগ সময় মিরপুরের শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে খেলেন বলে সব উইকেটকেই মাপেন মিরপুরের নিক্তিতে। এখানে আগে ব্যাট করে অস্ট্রেলিয়া ৩৭৭ রান করেছে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে! এখানে আগে ব্যাট করা দলের ৩৫০ ছাড়ানো ইনিংসই আছে তিনটি, ৩০০ থেকে ৩৪০-এর ঘরে আছে আরও পাঁচটি। এবারের ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে ওয়ার্নার পার্ক যা সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের ঘরের মাঠ, সেখানে প্রথম তিন ম্যাচে উভয় ইনিংসেই ২০০ রানের বেশি হয়েছে। সেন্ট কিটস প্যাট্রিয়টসের ২০১ রান তাড়া করে জিতেছিল সেন্ট লুসিয়া, সেটাও ১৬ বল হাতে রেখে! এমন উইকেটে ৩০০ রানও করতে না পেরে ভালো খেলার দাবি করাটা বুফেতে গিয়ে ডায়েটিং করে

আত্মতৃপ্তি পাওয়ার মতোই!

দ্বিতীয় কারণ শারফেন রাদারফোর্ড। ইনিংসের গতিটা কীভাবে বাড়াতে হয় আর ওয়ার্নার পার্কে কীভাবে রান করতে হয় সেটা তার চাইতে ভালো আর কে জানবে! সিপিএলে সেন্ট কিটসের হয়েই খেলেন এই বামহাতি ব্যাটসম্যান, সেই ২০২১ সাল থেকে। আইপিএল, বিপিএল, পিএসএল, এলপিএল খেলে উপমহাদেশের বোলারদের ভালো করেই চেনা আছে তার। প্রথম ৫০ রান করতে নিয়েছেন ৪৭ বল, ৫ চার আর ২ ছক্কা। পরের ৫০-এ পৌঁছে গেছেন মাত্র ৩০ বলে, এবারে চারটি ছক্কা আর দুটি মাত্র চার। কখন গিয়ার বদলাতে হয় সেটা ভালো করেই জানেন রাদারফোর্ড, এই মাঠে খেলতে খেলতে যে মুখস্থ হয়ে গেছে বাতাসের দিক আর উইকেটের ধরন।

অন্যদিকে বাংলাদেশের ব্যাটিং আটকে ছিল ফার্স্ট গিয়ারেই, সেখান থেকে আর রান তোলার গতি বাড়াতে পারেননি ব্যাটসম্যানরা। তানজিদ হাসান তামিম বহুদিন পর রান পেয়েছেন, নিজে সাবধানী ব্যাটিং করতে গিয়ে পাওয়ার প্লের সুবিধাটা হাতছাড়া করে দিয়েছেন দলের। তামিম ৬০ বলে করেছেন ৬০, আউট হওয়ার আগে তার ইনিংসে ৩৩টি ডট বল। ছয়টি বাউন্ডারিতে ২৪ রান আর ৩ ছক্কায় ১৮ অর্থাৎ ৯ বলে নিয়েছেন ৪২ রান। ৫৯টা বল খেলে ৯ বলেই নিয়েছেন ৪২, ৩৩ বল ডট, বাকি ১৭ বলে নিয়েছেন ১৮ রান। এমন ব্যাটিং ১৯৯২’র বিশ্বকাপে করলে তামিম মারকুটে হিসেবেই খ্যাতি পেতেন, দুর্ভাগ্য তার যে এই ঘরানার ব্যাটিং মিরপুরের বাইরে বেশিরভাগ জায়গাতেই এখন অচল।

অধিনায়ক মিরাজের ৭৪ রানের ইনিংসটাও ১০১ বলের। টেস্টে বিপর্যয় সামাল দিতে যে পদ্ধতিতে ব্যাট করেন মিরাজ, ওয়ানডেতেও সেভাবেই খেলছেন। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের তৃতীয় ম্যাচটার মতোই, সেদিনও মিরাজ এবং মাহমুদউল্লাহ ১৪৫ রানের জুটি গড়ে বিপর্যয় থেকে হয়তো দলকে বাঁচিয়ে ছিলেন, কিন্তু বল খরচ করেছিলেন ১৮৮টি! ফল, ১০ বল আগেই ৫ উইকেটে আফগানদের জয় এবং বাংলাদেশের সিরিজ হার। সেন্ট কিটসেও একই পরিণতি। মিরাজ রান করেছেন, কিন্তু ৩০০ বলের ইনিংসে একাই খেলেছেন ১০১ বল! এই পরিমাণ বল একপ্রান্তে যদি একজন ব্যাটসম্যানই খেলেন, তাহলে অন্যদিকে কাউকে অন্তত দেড়শ স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করে সেটা পুষিয়ে দিতে হয়, না হলে দলের রানটা বাড়ে না। মিরাজের ইনিংসে বাংলাদেশের রান বাড়লেও শেষদিকের ব্যাটসম্যানরা চাপে পড়েছেন। মাহমুদউল্লাহ এবং জাকের আলি, দুজনেই ভালো রান করেছেন। একজন ৫০* আর অন্যজন ৪৮। তবে দুজনেই আরেকটু স্ট্রাইক রেট বাড়িয়ে খেললে বাংলাদেশের জন্য রানটা উপকারে আসত। মাহমুদউল্লাহ ৫০ করেছেন ৪৪ বলে, জাকেরের ৪৮ এসেছে ৪০ বলে। কেউ একজন যদি রানটা ২৫-৩০ বলে করতেন, কিংবা ইনিংসটাই যদি ৪৪ বলে ৫০ রানের না হয়ে ৬০-৭০ রানের হতো, তাহলে দলের রানটা আরেকটু বেশি হতে পারত। টেস্টে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করা জাকের যদি আরেকটু হাতখুলে খেলতেন, তাহলে বাংলাদেশের সংগ্রহটা কিছুটা বাড়ত।

ব্যাটিংয়ের এই ঘাটতিগুলোর সঙ্গে বোলিংয়ে মাঝের ওভারে উইকেট নেওয়ার দক্ষতারও অভাব। ২৭ রানেই ২ উইকেট তুলে নেওয়ার পর আস্তে আস্তে বড় জুটি গড়তে থাকে উইন্ডিজ। ৬৭, ৯৯ ও ৯৫; তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম উইকেটে এই রানগুলো এসেছে তাদের ইনিংসে। ওয়ানডেতে পাটা উইকেটে মাঝের ওভারে উইকেট নিতে পুরনো বল ব্যবহারের কার্যকারিতা চাই বোলিংয়ে। রিভার্স সুইং জানতে হবে পেসারদের, স্পিনারদের হতে হবে শিয়ালের মতোই কৌশলী। ফাঁদ পেতে উইকেট বের করতে হবে। বাংলাদেশের বোলিংয়ে সেই বুদ্ধিদীপ্ততা দেখা যায়নি। দুই স্পিনার, মেহেদী হাসান মিরাজ ও রিশাদ হোসেন, কেউই খুব একটা চাপে ফেলতে পারেননি ব্যাটসম্যানদের, আঁটসাঁট বোলিংয়ে বাঁধতে পারেননি।

একই মাঠে দ্বিতীয় ওয়ানডে আজ। এসব ভুলগুলো নিঃসন্দেহে অ্যানালিস্ট বা কোচের নজর এড়ায়নি। একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করলে ফলও একই হবে। তাই দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ব্যাটসম্যানদের হতে হবে আরেকটু আগ্রাসী, নিতে হবে ক্যালকুলেটিভ রিস্ক। তা না হলে আজই হয়তো সিরিজ খোয়াতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত