২৩ লাখ আয়ে ১৩ কোটি ব্যয়

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৮:১৮ এএম

একদিকে চলছে নদীতীর রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জিও ব্যাগ ফেলার কাজ। আর তার অদূরেই সারি সারি ড্রেজার। যেগুলো দিয়ে ব্যবসায়ীরা ইজারার শর্ত ভেঙে অপরিকল্পিতভাবে ইচ্ছেমতো তুলছেন বালু। এমনকি নদীতীরের বাঁধের মাত্র ১০০ মিটার দূর থেকেও তোলা হচ্ছে বালু। আর অপরিকল্পিত এ বালু উত্তোলনের প্রভাবে ভাঙছে নদীর পাড়, ধস নামছে তীর রক্ষা বাঁধে। বালু উত্তোলন দেখলেই নদী তীরবর্তী মানুষের চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ তৈরি হচ্ছে। তারা চিন্তিত হয়ে পড়ছেন ঘরবাড়ি সরানোর চিন্তায়। বালু ব্যবসায়ীরা প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ প্রতিবাদেরও সাহস পান না। এ চিত্র খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নের দক্ষিণ তেঁতুলতলা গ্রামের।

শুধু দক্ষিণ তেঁতুলতলা গ্রামই নয়, রূপসা ও কাজিবাছা নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে এর আশপাশের আরও অন্তত নয়টি গ্রামের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মৎস্য ঘের ও বিভিন্ন স্থাপনা নদীতে বিলীন হচ্ছে। সহায়সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে শত শত মানুষ। দিনের পর দিন এভাবে বালু উত্তোলন চললেও তা রোধে স্থানীয় প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। অন্যদিকে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের প্রভাবে সৃষ্ট ভাঙন রোধে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। বিপুল অর্থ খরচে মেরামত হচ্ছে নদীতীর রক্ষা বাঁধ। তবে মেরামতের অল্প সময়ে ফের ধসে পড়ছে সেই বাঁধ। এতে সরকারের ব্যয়িত অর্থ ভেসে যাচ্ছে নদীর জলে।

যদিও স্বয়ং পাউবো কর্মকর্তারাই বলছেন, অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র বালু তোলা বন্ধ না হলে ভাঙন রোধে ব্যয় করা অর্থ কোনো কাজেই আসবে না। আর স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা বলছেন, পাউবো ও জেলা প্রশাসনের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। জেলা প্রশাসন বালু তোলার জন্য নদী ইজারা দিয়ে তাদের তহবিল ভারী করছে। অন্যদিকে বালু তোলার জন্য ভাঙনের মুখে পড়া নদীতীর রক্ষায় পাউবো মোটা অঙ্কের টাকা ঢালছে। এতে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। শুধুই সরকারের অর্থের অপচয় হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বটিয়াঘাটায় রূপসা ও কাজিবাছা নদীর বালু মহাল থেকে দিন-রাত অন্তত ২০টি ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। এর মধ্যে কোনো কোনো ড্রেজার নদী তীরের ১০০ মিটার দূর থেকেও বালু তুলছে। যদিও বালু উত্তোলন ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী, কালভার্ট, বাঁধ, ব্যারেজ, সেতু, বাঁধ, মহাসড়ক, রেললাইন, জনবসতি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোর এক কিলোমিটারের মধ্যে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ।

জেলা প্রশাসন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রূপসা ব্রিজের দক্ষিণ থেকে চালনা পূর্বপাশ পর্যন্ত খুলনা জেলা প্রশাসনের আওতাধীন একমাত্র সরকারি বালুমহাল। চলতি বাংলা ১৪৩১ সনের জন্য এই বালুমহালটি ইজারা নেওয়া হয় আলী রেজা হায়দারের নামে। ইজারা মূল্য ছিল মাত্র ২৩ লাখ ১০ হাজার টাকা। তবে খাতা-কলমে ইজারাদার হিসেবে আলী রেজা হায়দারের নাম থাকলেও বালুমহালটি নিয়ন্ত্রণ করতেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ সোহেল। গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ সোহেল আত্মগোপনে চলে গেলে বালুমহালটির নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন বিএনপি নেতারা। সরকারের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে ইজারা নিয়ে এই বালুমহালটি থেকে প্রতি বছর কয়েক কোটি টাকার বালু উত্তোলন করছেন ব্যবসায়ীরা। ইজারার শর্ত ভেঙে নির্দিষ্ট জায়গা থেকে না তুলে দিন-রাত ইচ্ছেমতো জায়গা থেকে তোলা হচ্ছে বালু।

বটিয়াঘাটার জলমা ইউনিয়নে রূপসা ও কাজিবাছা নদীর তিন কিলোমিটার অংশ ভাঙনের কবলে পড়েছে। এর মধ্যে পূর্ণের খেয়া, দক্ষিণ তেঁতুলতলা ও কচুবুনিয়া গ্রামের অংশ এবং নেভি অফিসের ও সোলামের সামনেসহ অন্তত এক কিলোমিটার নদীতে চলে গেছে।

বটিয়াঘাটার তেঁতুলতলা গ্রামের বাসিন্দা একরামুল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নদীতে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বছর জুড়ে চলে বালু উত্তোলন। তাদের কিছু বলাও যায় না। এসব ব্যবসায়ী অনেক প্রভাবশালী।’

কচুবুনিয়ার বাসিন্দা মধুসূদন রায় বলেন, ‘নদীতে ড্রেজার বছর জুড়ে নির্যাতন চলে। উত্তোলন করা বালু ছোট-বড় সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়। যার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লুফে নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু আমরা নদীতীরের বাসিন্দারা পথে বসছি।’

আরেক ভুক্তভোগী বটিয়াঘাটা উপজেলার তেঁতুলতলা গ্রামের বাসিন্দা খোকন মণ্ডল বলেন, ‘বালু উত্তোলনের কারণে নদীতে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়। পরে সেই গর্তে ভেঙে পড়ছে স্থলভাগ। ইতিমধ্যে তিন কিলোমিটার জুড়ে ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙনে কচুবুনিয়া ও জলমা গ্রামের শত শত বিঘা জমি, জমির ফসল, গাছপালা ও বসতভিটা নদীতে চলে যাচ্ছে। এখন বেড়িবাঁধও ভাঙছে। হুমকিতে পড়েছে নদীর আশপাশের ১০ গ্রামের মানুষ।’

জলমা ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) আশরাফুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নদীর যেখানেই বালু বেশি সেখানেই ড্রেজার দিয়ে বালু কাটা হচ্ছে। এতে বটিয়াঘাটার পুটিমারী, মাথাভাঙা, তেঁতুলতলা, কচুতলা, বিরাট ও পূর্ণের খেয়া এলাকায় নদীপাড় তিন থেকে চার কিলোমিটার জুড়ে ভাঙন ধরেছে। ভাঙনে বসতভিটা, ঘরবাড়ি ও অনেক স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বালু উত্তোলন বন্ধ না হলে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়।’

পাউবো থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রূপসা ও কাজিবাছা নদীতীর রক্ষা বাঁধ মেরামতে ১৩ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মধ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কাজিবাছা নদীর বাম তীরে আমীরপুর ইউনিয়নের পূর্ণের খেয়া এলাকায় ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে ২১০ মিটার বাঁধ মেরামত হয়। তবে বালু উত্তোলনের কারণে বছর না ঘুরতেই সেই ২১০ মিটারের মধ্যে ১১০ মিটারই ধসে পড়েছে নদীতে। ২০২২ সালের ২ অক্টোবর কচুবুনিয়া অংশে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নদীশাসন ও ব্লক দিয়ে তীর রক্ষার কাজ শুরু হয়। প্রকল্পটির মেয়াদ গত মে মাসে শেষ হয়েছে। তবে কাজের অগ্রগতি ৯৫ শতাংশ। সেই বাঁধও রয়েছে চরম ঝুঁকিতে। এ ছাড়া দক্ষিণ তেঁতুলতলায় সড়ক ধসে পড়ছে। সেই সড়ক রক্ষায় ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন করে ফেলা হচ্ছে জিও ব্যাগ। যার কাজ চলমান রয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বলেন, ‘নদীতে সুষমভাবে বালু উত্তোলন হচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা যত্রতত্র দেদার বালু তুলছে। দেখা যায় বাঁধের মাত্র ১০০ মিটার দূর থেকেও বালু উত্তোলন হচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে সেখানে বড় ধরনের গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে। সেই গর্তে বেড়িবাঁধ ধসে ভাঙন সৃষ্টি হচ্ছে। বেড়িবাঁধ টিকিয়ে রাখতে অর্থ খরচ করা হচ্ছে সত্য। কিন্তু বালু তোলা বন্ধ না হলে এ অর্থ ব্যয় কোনো কাজে আসবে না। তাই ইতিমধ্যে এসিল্যান্ড ও জেলা প্রশাসনকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছে।’

এ বিষয়ে বটিয়াঘাটা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) শরীফ শাওন বলেন, ‘পুরো নদীতে বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙন ও পরিবেশগত ক্ষতি হচ্ছে। এ কারণে যেখানে বালু উত্তোলনে করলে পরিবেশের ক্ষতি হবে না এমন জোন ঠিক করে দেওয়ার ব্যাপারে জেলা প্রশাসক নির্দেশনা দিয়েছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবশে অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসন সরেজমিন দেখে আগামী বৃহস্পতিবার সিদ্ধান্ত জানাবে।’

তবে খুলনা পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক সুতপা বেদজ্ঞ মনে করেন, প্রকৃতপক্ষে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জেলা প্রশাসন বালু তোলার জন্য নদী ইজারা দিচ্ছে। অন্যদিকে বাঁধ রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড মোটা অঙ্কের টাকা ঢালছে। এতে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। শুধুই সরকারের অর্থের অপচয় হচ্ছে। তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চিন্তার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। সবকিছুর আগে মানুষের জন্য প্রকৃতি ও পরিবেশ বাঁচাতে হবে। তারপর নদী ইজারা দেওয়ার প্রসঙ্গ আসবে। বিষয়টি নিয়ে সবাইকে এগিয়ে এসে কথা বলা দরকার।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে খুলনার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি নজরে এলো। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত