মিয়ানমার সীমান্তে অস্থিরতা

বাংলাদেশে কী প্রভাব পড়তে পারে

  • বাংলাদেশ-মিয়ানমার ২৭০ কিমি সীমান্তের পুরোটাই আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে
  • নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ আশঙ্কা
  • প্রত্যাবাসন নিয়ে আরাকান আর্মির সঙ্গে সংলাপ হতে পারে
  • মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্যিক বিষয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে
আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪, ১০:০৫ এএম

আরাকান আর্মির বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা ২৭১ কিলোমিটার রাখাইন এলাকা দখল করায় বাংলাদেশের জন্য নতুন সমস্যা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা, নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ও চলমান প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আবারও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও রোহিঙ্গাবিষয়ক গবেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল নাঈম আশফাক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আরাকান আর্মির সঙ্গে আমাদের এখন যোগাযোগ ও সম্পর্ক বাড়াতে হবে। কারণ এর আগে গত বছর আরাকান আর্মির আক্রমণে বিরোধী একটি গ্রুপ যখন বাংলাদেশে আসে, সেই সময় আরাকান আর্মি তাদের ফেরত চেয়েছিল। যেখানে রাখাইনের রোহিঙ্গারাও ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ তাদের আরাকান আর্মিদের বিরোধীদের কাছে হস্তান্তর করেছে। ফলে এখন আরাকান আর্মি এ বিষয়টা মনে রাখতে পারে। আবার রাখাইনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা যেহেতু আরাকান আর্মি দখলে নিয়েছে, এতে রোহিঙ্গাদের ওপর আবার চাপ আসবে। ফলে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের সম্ভাবনা এবং প্রত্যাবাসনও এখন তাদের ওপর নির্ভর করছে।’

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং সীমান্ত এলাকাগুলোর করণীয় ঠিক করতে মিয়ানমারের আশপাশের দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের কথা রয়েছে ব্যাংককে। ওই বৈঠকে বসছে বাংলাদেশ-ভারত ও চীন। সেখানে পূর্ব তিমুরও অংশ নিতে পারে বলে জানা গেছে। তবে ওই বৈঠকের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো হয়নি। এটি ব্যাংককে ১৯ ডিসেম্বর হতে পারে। হোস্ট থাইল্যান্ডের তরফে ইনফরমাল সেই বৈঠকে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর থাকবেন, এ বিষয়েও নিশ্চিত হয়েছে বাংলাদেশ।

গত ফেব্রুয়ারিতে হামলার মুখে কয়েকটি রোহিঙ্গা সংগঠনের নেতাকে অস্ত্রসহ বাংলাদেশে আশ্রয়ের পর তাদের আটকও করেছিল পুলিশ। নতুন করে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের শঙ্কা রয়েছে। সে বিবেচনায় কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ যাতে না ঘটে, সে বিবেচনায় সীমান্তে টহল জোরদার করেছে বিজিবি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে রোহিঙ্গারা জান্তা বাহিনীর পক্ষ নেওয়াতে এখন এই সংকট আরও বাড়ল। এ ছাড়া যেসব সশস্ত্র রোহিঙ্গা সংগঠন আরাকান আর্মির সঙ্গে পরাজিত হয়ে পালিয়েছে তাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের জোর শঙ্কা রয়েছে। এর ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের ভরসা করতে হবে নেপিদোর ওপর। কূটনৈতিক সম্পর্কের বাইরে এ সংকট সমাধান সম্ভব নয়। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় এ সংকট আরও দীর্ঘায়িত হলো।

নাফ নদে নিরাপত্তা জোরদার : মংডু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরই বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী নাফ নদের মিয়ানমারের অংশে অনির্দিষ্টকালের জন্য নৌ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে আরাকান আর্মি। ওই ঘোষণার পর নাফ নদে নৌ চলাচলে সতর্কতা জারি করে বাংলাদেশও। বাড়ানো হয়েছে বিজিবির টহল। সীমান্তে অযাচিত যাতায়াত বন্ধে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জনসাধারণকে সতর্ক করে মাইকিং করা হচ্ছে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে। যদিও এরপর থেকে টেকনাফ সীমান্তে সে দেশে থেকে কোনো ধরনের গোলার বিকট শব্দ ভেসে আসেনি।

এ ছাড়া নাফ নদে মিয়ানমার সীমান্তের ওপারে যেন কোনোক্রমেই কোনো নৌকা না যায়, সেজন্যও সতর্কতা জারি রেখেছে প্রশাসন। কেউ যেন সীমানা ক্রস করে এদিকে না আসে সেদিকে নজর রাখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ক্ষেত্রে ছোট ছোট নৌকাগুলোকে নাফ নদে বাংলাদেশ অংশে সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হলেও বড় ট্রলার, বড় জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সীমান্তের নাফ নদে টহল তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে এবং বাংলাদেশের জলসীমায় বিদ্যমান দ্বীপের আধিপত্য বিস্তারের জন্য নৌ টহলও জোরদার করা হয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে চাইলে বাংলাদেশ সরকারকে বিদ্রোহী সেনাবাহিনীর সঙ্গে অর্থপূর্ণ সংলাপ করতে হবে। আবার কেউ কেউ বলছেন, রোহিঙ্গা বিষয়ে নতুন সংকটের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে প্রথমত আশঙ্কা হলো সীমান্ত দিয়ে আবারও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ। আবার বাংলাদেশে আশ্রয়ে থাকা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসন। আরও একটি বিষয় যুক্ত হচ্ছে, সেটা হলো মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্য ইস্যু।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত