জিয়ার নামে স্কুল জোটেনি বরাদ্দ

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৬:৩১ এএম

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম জড়িয়ে থাকায় গত প্রায় ১৬ বছরে মুন্সীগঞ্জের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মেলেনি কোনো সরকারি বরাদ্দ। ২০০৯ সাল থেকে চলতি বছরের ৫ আগস্ট পতনের আগে পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিদ্যালয়টির জন্য এক টাকাও বরাদ্দ জোটেনি। ফলে সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ বিদ্যালয় ভবনে ঝুঁকি নিয়েই চলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান।

ভবন সংস্কারে বরাদ্দ চেয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোতে চিঠির পর চিঠি দিয়েও সাড়া মেলেনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বরাদ্দের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের এমনই বৈষম্যের শিকার হয়েছে জেলা সদরের মিরকাদিম পৌরসভার রিকাবীবাজার এলাকার শহীদ জিয়াউর রহমান উচ্চবিদ্যালয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির তিনতলা অ্যাকাডেমিক ভবন ও দোতলা প্রশাসনিক ভবনটি জরাজীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। দিন দিন কমেছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। প্রথম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত সহস্রাধিক থেকে বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা নেমেছে ৪৫০ জনে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শ্রেণিকক্ষগুলোর দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। মেঝেতে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। দেয়ালে দেয়ালে ফাটল। বেশিরভাগ শ্রেণিকক্ষের জানালার গ্রিল থাকলেও নেই কপাট। শ্রেণিকক্ষগুলোতে নেই পর্যাপ্ত বেঞ্চ, বৈদ্যুতিক বাতি ও পাখা। প্রায় দেড় যুগে শ্রেণিকক্ষে পড়েনি রঙের প্রলেপ।

বিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ জানায়, সদর উপজেলার মিরকাদিম পৌর বিএনপির তৎকালীন সভাপতি মো. জসিমউদ্দিন ১৯৯৪ সালে বিএনপি সরকারের আমলে শহীদ জিয়াউর রহমান উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে এটি ছিল নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। পাঠদান শুরু হয় টিনশেড ভবনে। ২০০০ সালে জসিমউদ্দিনের অনুদানে বিদ্যালয়ের তিনতলা অ্যাকাডেমিক ভবন তৈরি হয়। ২০০২ সালে এটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে এমপিওভুক্ত (শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ যে অর্থ সরকার দিয়ে থাকে তাকে ইংরেজিতে বলা হয় মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার বা এমপিও) হয়। ২০০৩-২০০৪ অর্থবছরে বিএনপি সরকারের অর্থায়নে বিদ্যালয়ের দোতলা প্রশাসনিক ভবন হয়। 

বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিয়া আক্তার বলে, ‘জানালার কপাট না থাকায় বর্ষা মৌসুমে শ্রেণিকক্ষে বৃষ্টির পানি ঢোকে, শীতকালে হিমেল হাওয়া বয়ে যায়। প্রাচীর না থাকায় বিদ্যালয়ে বহিরাগতদের আনাগোনা হরহামেশা। এতে নিরাপত্তাহীন অবস্থায় পাঠদান চলে।’

আওয়ামী লীগ সরকারের বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জালালউদ্দিন বলেন, ‘এমন ঘটনাও ঘটেছে যে, শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার সামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠানে আমাদেরটিসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ডাকা হয়। অনুষ্ঠানে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে চারটি করে ফুটবল তুলে দেওয়া হয়। শেষে শুধুমাত্র বিদ্যালয়ের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের নাম থাকায় আমাদের জন্য বরাদ্দ ফুটবল চোখের সামনেই কেড়ে নেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, স্থানীয় এক ব্যবসায়ী আমাদের বিদ্যালয়ে একটি শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেন। তা আগেভাগে জেনে যান আওয়ামী লীগ দলীয় তৎকালীন সংসদ সদস্য মৃণাল কান্তি দাস। পরে ওই সংসদ সদস্যের চাপের মুখে শহীদ মিনারটি জেলা সদরের অন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্মাণ করে দিতে বাধ্য হন ওই ব্যবসায়ী।’

তবে অভিযোগের বিষয়ে মৃণাল কান্তি দাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। 

প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, গত ১৬ বছরে দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। শুধুমাত্র নামের সঙ্গে শহীদ জিয়াউর রহমান থাকায় এ বিদ্যালয়টি উন্নয়ন-বঞ্চিত হয়েছে। এ বিদ্যালয়ে ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এক টাকাও সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. জসিমউদ্দিন বলেন, ‘বিদ্যালয়ের নামকরণে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নাম থাকাটাই কাল হয়ে দাঁড়ায়।’

এ প্রসঙ্গে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি। কাজেই বিদ্যালয়টি সম্পর্কে আমি তেমন কিছু জানি না। তবে বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকলে আমি যথাযথ ব্যবস্থা নেব।’

আর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘বিদ্যালয়ে বরাদ্দের বিষয়টি দেখে থাকে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। এ ছাড়া জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ বরাদ্দ দিয়ে থাকে। শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের কার্যক্রম শুধু শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষার্থীদের বই দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। কাজেই ওই বিদ্যালয়ে সরকারি বরাদ্দ না পাওয়ার বিষয়ে আমি জানি না।’

পরে এ বিষয়ে জানতে গতকাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মুন্সীগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মৌরিন আক্তার মৌয়ের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত