ক্যাডার কর্মকর্তাদের এ কী আচরণ!

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৭:২৩ এএম

কেউ পা ছড়িয়ে বসে আছেন, কেউ পেপারে শুয়ে আছেন, কেউ বা দেয়ালে আধশোয়া! তারা সবাই অবসরপ্রাপ্ত বিসিএস কর্মকর্তা। এই চিত্র গতকাল রবিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোখলেস উর রহমানের কক্ষের সামনে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পদোন্নতিবঞ্চিত অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা গেজেট প্রকাশের দাবিতে এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ১৯৮২ ব্যাচের বিসিএসের কর্মকর্তারাও আছেন এই আন্দোলনে। গত ১৫ বছরে জনপ্রশাসনে বঞ্চিত হয়েছেন দাবি করে মূল্যায়নের জন্য আবেদন করেন ১ হাজার ৫৪০ জন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে ৭৬৪ জন সাবেক কর্মকর্তাকে সম্প্রতি পদমর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা দেওয়া হবে জানিয়ে ‘ভূতাপেক্ষ’ পদোন্নতির সুপারিশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত কমিটি।

এদিকে সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। একই সঙ্গে অবসরে গিয়ে পেনশন ভোগরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও পাবেন এই সুবিধা। পিয়ন থেকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব পর্যন্ত সবাই এই মহার্ঘ ভাতা পাবেন। তবে এর দুটি ধাপ হতে পারে। এর মধ্যে কর্মকর্তাদের জন্য একটু কম এবং কর্মচারীদের জন্য একটু বেশি দেওয়া হতে পারে। সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোখলেস উর রহমান।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, দপ্তর, করপোরেশন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে সাড়ে ১৪ লাখের বেশি কর্মকর্তা ও কর্মচারী কর্মরত আছেন। সর্বোচ্চ ধাপ ও সর্বনিম্ন ধাপ এবং কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য ধাপ কীভাবে ঠিক করা হবে, তার কৌশল বের করা হবে বলে জানিয়ে সচিব বলেন, এবার যাতে এই মহার্ঘ ভাতার সুবিধা পেনশনভোগীরাও পান, সে ব্যাপারে সরকার একমত।

আন্দোলনে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, গত সপ্তাহে সুপারিশ জমা দেওয়া হয়েছে, প্রধান উপদেষ্টা সম্মতিও দিয়েছেন। তারপরও গেজেট হবে না কেন? কারা পদোন্নতি পেলেন, কে কোন ধাপ পদোন্নতি পেলেন, কী বিবেচনায় পেলেন, তালিকা প্রকাশ না করা হলে এর কিছুই জানা যাবে না? আমরা দ্রুত গেজেট প্রকাশের দাবি জানাচ্ছি। ফ্যাসিস্ট সরকারের মতো এখানেও পছন্দের কাউকে দেওয়া হোক, তা চাই না। একটি মহলের পছন্দের প্রায় ২০০ জন কর্মকর্তার নাম এই তালিকায় ঢোকানো হতে পারে এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন বিক্ষোভকারীরা।

১৯৮২ বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, পদোন্নতি সুপারিশ তালিকা যারা প্রকাশ করবেন, তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে শুনেছি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেউ কেউ প্রভাবিত করে নিজেদের পছন্দের লোকজন এই তালিকায় নাম দিতে চাচ্ছেন, সেটিই আসলে মূল্য উদ্বেগের বিষয়।

এ বিষয়ে সিনিয়র সচিব মো. মোখলেস উর রহমান সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তখনো তার কার্যালয়ের সামনে বারান্দায় কিছুসংখ্যক বঞ্চিত কর্মকর্তা দাবি আদায়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন। তিনি বলেন, ‘চাকরি যারা করেন, তারা জানেন, ন্যূনতম একটি প্রক্রিয়ার ব্যাপার আছে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের একটি নির্দেশনা লাগবে। তবে ইতিবাচক। চাকরির কিছু বিধিবিধান আছে। এটি মানতে হবে। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।’

তবে সংক্ষিপ্ত সময়ে এ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘এটি ঠিক পদোন্নতি নয়। এটি হলো সামাজিক মানমর্যাদা। আর্থিক সুবিধা ও পদপদবি দিয়ে একটি সরকারি আদেশ জারি হবে। এর ভিত্তিতে অর্থনৈতিক আদেশে তারা এই টাকা পাবেন। সরকার নীতিগতভাবে একমত। একটু সময়ের ব্যাপার।’

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে জনপ্রশাসনের জ্যেষ্ঠ সচিব বলেন, ‘পদে বসানো এক বিষয় আর পদমর্যাদা এক বিষয়। এটি হলো ওই পদে মর্যাদা দিয়ে সরকারি আদেশ দেওয়া হবে। হিসাবটি করবে এজি অফিস। তাদের বিজ্ঞানসম্মত নিয়ম আছে।’ পেনশনের ক্ষেত্রেও এই সুবিধা হবে বলে জানান সচিব।

গত মঙ্গলবার জনপ্রশাসনে পদোন্নতিবঞ্চিত অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের আবেদন পর্যালোচনা কমিটি তাদের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দিয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গত ১৬ সেপ্টেম্বর সাবেক অর্থসচিব এবং বিশ^ব্যাংকে বাংলাদেশের সাবেক বিকল্প নির্বাহী পরিচালক জাকির আহমেদ খানকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছিল। আওয়ামী লীগের আমলে ২০০৯ সাল থেকে গত ৪ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে সরকারি চাকরিতে নানাভাবে বঞ্চনার শিকার এবং এ সময়ের মধ্যে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের আবেদন পর্যালোচনা করে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য এ কমিটি গঠন করা হয়।

যাদের পদোন্নতির সুপারিশ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে সচিব পদে ১১৯ জন, গ্রেড-১ (সচিবের সমান বেতন গ্রেড)-এ ৪১ জন, অতিরিক্ত সচিব পদে ৫২৮ জন, যুগ্ম সচিব পদে ৭২ ও উপসচিব পদে চারজনকে পদোন্নতির সুপারিশ করেছে। যেহেতু তারা অবসরে গেছেন, সেজন্য তাদের ‘ভূতাপেক্ষ’ পদোন্নতি দেওয়া যেতে পারে। ৭৬৪ কর্মকর্তার মধ্যে কমিটি ৯ জনকে চার ধাপ, ৩৪ জনকে তিন ধাপ, ১২৬ জনকে দুই ধাপ ও ৫৯৫ জনকে এক ধাপ পদোন্নতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত