সিরিয়ার ভাগ্যাকাশে অনিশ্চয়তা

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ০১:৩৭ এএম

সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটেছে। তবে অনিশ্চয়তা বেড়েছে আরও। লিখেছেন অসিত রায়

সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের কয়েক দশকের নৃশংস শাসনের অবসান ঘটেছে। বাশার আল আসাদকে উৎখাতের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে হায়াত তাহরির আল-শামের (এইচটিএস)। ক্ষমতা দখলের পর এইচটিএস নেতা আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি সিরিয়াকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যদিও খবরে উঠে এসেছে আসাদ সরে যাওয়ার পর ইসরায়েল বিভিন্ন স্থান দখল করে নিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে গোলান মালভূমি। তবে আগে থেকেই সিরিয়া বহু গোষ্ঠীতে বহু এলাকায় বিভক্ত হয়ে আছে। ফলে এইটিএস সবাইকে এক রাখার লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে কি না তা এখনো নিশ্চিত না।

সিরিয়াবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত গেয়ার পেডারসন সব গোষ্ঠীর মধ্যে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেছেন, এইচটিএস অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীকে আশ্বস্ত করে বিবৃতি দিয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। যে কারণে বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি যে বেগে পরিবর্তিত হচ্ছে তাতে করে আগে থেকে সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনুমান করা কঠিন। বিবিসি তাদের এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে কয়েকজন বিশ্লেষকের মত তুলে ধরেছে।

পরিস্থিতি অস্থিতিশীল

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, আসাদের পতনের পর সবচেয়ে ভালো যে বিষয়টি ঘটতে পারে তা হলো, দায়িত্বশীলভাবে দেশ শাসনের জন্য এইচটিএস যদি অন্য রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোকে কাজ করতে দেয়। তাহলে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তারা জাতীয় মীমাংসার পথ তৈরি করতে পারে। এখন পর্যন্ত জোলানি সিরিয়ার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য ও পারস্পরিক সম্মানের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে সিরিয়ার অনেকগুলো গোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন এজেন্ডা রয়েছে। যুক্তরাজ্যের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক ক্রিস্টোফার ফিলিপস বলেন, বাস্তবে আমরা এমন এক অনিশ্চিত জায়গায় আছি যেখানে এইচটিএস একটি কার্যকর ও শান্তিপূর্ণ পালাবদলের চেষ্টা করছে কিন্তু পরিস্থিতি খুবই অস্থিতিশীল। বিবিসি জানাচ্ছে, এমন আশঙ্কাও আছে যে আসাদ শাসনের মতো করে স্বৈরাচারী উপায়ে এইচটিএস ক্ষমতা দখল করে রাখবে।

জোলানি ইতিমধ্যেই ইদলিবে তার শক্তিশালী ঘাঁটি তৈরি করেছে, যা একসময় উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার সবচেয়ে বড় বিদ্রোহী ঘাঁটি এবং অন্যান্য সিরিয়ান প্রদেশ থেকে বাস্তুচ্যুত প্রায় ৪০ লাখ মানুষের আবাসস্থল ছিল। এইচটিএসের অধীনে ন্যাশনাল স্যালভেশন গভর্নমেন্ট ইদলিবের বেসামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সেখানে শরিয়া আইন অনুসরণ করা একটি ধর্মীয় পরিষদও রয়েছে। জোলানি দেখানোর চেষ্টা করছেন যে স্থিতিশীলতা এবং জনসেবাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এইচটিএস সুশাসন করতে পারে। তবে সমালোচকরা বলছেন, ইদলিব নিয়ন্ত্রণ করার সময় তার দল প্রতিদ্বন্দ্বী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে কোণঠাসা করেছে এবং ভিন্নমত দমন করেছে। এইচটিএসের নেতৃত্বে ২৭ নভেম্বর চালানো আক্রমণের আগে ইদলিবে বিক্ষোভ শুরু হয়। সেখানকার কট্টর ইসলামপন্থি ও সিরিয়ান অ্যাক্টিভিস্টরা এইচটিএসের স্বৈরাচারী আচরণের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিল। দাহের বলেন, এইচটিএস মূলত দমন-পীড়নের মাধ্যমে ক্ষমতাকে সুসংহত করেছে। যদিও পরে ইদলিবের সমস্ত বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং সেবা দিয়ে ক্ষমতা একত্র করেছে। তবে তাদের শাসনেও কঠোর দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক বিরোধীদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এসব সমালোচনার জবাবে, এইচটিএস কিছু সংস্কার বাস্তবায়ন করেছে, যেমন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকা একটি বিতর্কিত নিরাপত্তা বাহিনীকে ভেঙে দিয়েছে এবং নাগরিকদের অভিযোগ জমা দেওয়ার জন্য একটি বিভাগ তৈরি করেছে। তবে সমালোচকদের মতে, এই সংস্কারগুলো আসলে ভিন্নমত দমনে নিছক এক মুখোশ মাত্র। এইচটিএসের দাবি, সিরিয়ার অগ্রগতি এবং আসাদ সরকারের শাসনকে চূড়ান্তভাবে অপসারণের জন্য ইদলিবে ক্ষমতা সুসংহত করা প্রয়োজন ছিল। তবে দাহেরের মতে, এইচটিএস এই মুহূর্তে একটি অভূতপূর্ব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। তিনি বলেন, কিছুটা আশার আলো আছে যে এইচটিএস দামেস্ক পর্যন্ত তার বিস্তৃত শক্তি সম্প্রসারিত করলেও এই সমস্ত অঞ্চল পরিচালনা করার জন্য তাদের কাছে পর্যাপ্ত সামরিক ও মানবসম্পদ নেই।

আরও বিপর্যয়!

সমালোচকদের মতে, স্বৈরাচারী শাসকদের পতনের ফলে তৈরি হওয়া শূন্যতা কখনো কখনো পূরণ হয় লুটপাট, প্রতিশোধ, ক্ষমতার দখল এবং গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে। এমন প্রেক্ষাপটে সিরিয়ার বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা দেশটিকে ব্যাপক সহিংসতার দিকে নিয়ে যেতে পারে; যা কেবল সিরিয়া নয়, পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। বিবিসি আরবির বিশেষ সংবাদদাতা ফেরাস কিলানি জানিয়েছেন, নতুন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-বাশিরের প্রথম ভাষণ অনেকের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং নতুন সরকারের সম্ভাব্য দিকনির্দেশনার ইঙ্গিত দিয়েছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী যে দুটি পতাকা পেছনে রেখে ভাষণ দিয়েছেন তার একটি ছিল ‘বিপ্লবের পতাকা’ এবং আরেকটি দেখতে তালিবানের পতাকার মতো যা অনেককে হতবাক করেছে। এটি নির্দেশ করে যে নতুন সরকার তালেবান মডেল অনুসরণ করে শরিয়া আইন দ্বারা পরিচালিত একটি ইসলামি রাষ্ট্র তৈরি করতে পারে। তিনি আরও বলেন, এটি দেশটির সংখ্যালঘু এবং বেসামরিক গোষ্ঠীগুলোর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নতুন চ্যালেঞ্জ এবং প্রশ্ন তৈরি করছে। এই ধরনের একটি গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশটি আরও বিপর্যয়ের দিকে যেতে পারে, যা জাতীয় সংহতি এবং শৃঙ্খলাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারে।

বিবিসি জানাচ্ছে, বিশ্লেষকরা বলছেন, এ তিন সম্ভাব্য পরিণতি বিদেশি শক্তির কার্যক্রমের ওপরও নির্ভর করবে। আসাদ দীর্ঘ সময় ধরে ইরান এবং রাশিয়ার সমর্থনের ওপর নির্ভর করেছেন। অন্যদিকে তুরস্ক, পশ্চিমা দেশ আর উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন বিরোধী গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়েছে। শেষ কয়েক দিন ধরে ইসরায়েল সিরিয়ার সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে আক্রমণ করেছে এবং সিরিয়ার নিরস্ত্রীকরণ অঞ্চলের বাইরে গোলান মালভূমিতে ইসরায়েল-অধিকৃত অঞ্চলে ইসরায়েলি সেনাদের কার্যক্রমের কথা স্বীকার করেছে। ইসরায়েলের দাবি, তারা আসাদের দেশত্যাগের পর থেকে সিরিয়ায় শত শত বিমান হামলা চালিয়েছে এবং সিরিয়ার বেশিরভাগ কৌশলগত অস্ত্র ভাণ্ডার ধ্বংস করেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হতে না দেওয়ার বিষয়ে সিরিয়ার বিদ্রোহী বাহিনীকে সতর্ক করেছেন। এর মাধ্যমে ইসরায়েল আসাদ সরকারের পতনের সুযোগ নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে তুরস্কসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলো। ফিলিপস সতর্ক করেছেন যে ইসরায়েলের এই ধরনের কার্যকলাপ সিরিয়ার সরকারকে দুর্বল করে বা কঠোরপন্থিদের সাহস জুগিয়ে সিরিয়াকে অস্থিতিশীল করতে পারে। ফিলিপস এবং দাহের উভয়ে এ বিষয়ে একমত যে সিরিয়ার ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া উচিত যাতে দেশটির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব হয় এবং বিদেশি শক্তিগুলো সহজে মানবিক সহায়তা দিতে পারে। দাহের বলেন, এখন যেহেতু আসাদ সরকারের শাসন আর নেই, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া উচিত। আমি মনে করি ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের উচিত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং মানবিক সহায়তার মাত্রা ধরে রাখা, সম্ভব হলে তা বাড়ানোও। তিনি আরও বলেন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি নতুন সংবিধান বা গণতান্ত্রিক সংস্কারের মতো ছাড় আদায় করতে পারে।

পরবর্তী সোমালিয়া!

বিশ্লেষকদের মতে, এটা অনেকটা নিশ্চিত যে সিরিয়া আপাতত স্থিতিশীল হচ্ছে না। যার ওপর নির্ভর করছে ইসরায়েলের অবস্থান। সিরিয়া শান্ত না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল গোলান মালভূমির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে। কারণ তারা চাইবে না যে, সিরিয়ার অশান্তি সীমানা পেরিয়ে ইসরায়েলে প্রবেশ করুক। ভয়েজ অব আমেরিকা জানাচ্ছে, সিরীয় সরকারের পতনের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলি সৈন্যরা ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যকার বাফার জোন দখল করে নিয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলছেন তারা আপাতত সেখানেই থাকবেন। যুক্তরাষ্ট্রের জো বাইডেন প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেইক সালিভানের সঙ্গে জেরুজালেমে এক বৈঠকের পর নেতানিয়াহুর দপ্তর জানায়, গোলান উপত্যকার পাশের বাফার জোনে ইসরায়েলি সৈন্যরা ততদিন থাকবে যতদিন না সিরিয়ার কোনো বাহিনী ইসরায়েলিদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করছে। তবে গোলান মালভূমিতে  হস্তক্ষেপ না করা নিয়ে ১৯৭৪ সালে হওয়া চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য জাতিসংঘ, ফ্রান্স এবং অন্যান্য দেশ ইসরায়েলকে অভিযুক্ত করেছে। আর ইসরায়েলি কর্র্তৃপক্ষ বলছে এই পদক্ষেপ সাময়িক। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন তারা আশঙ্কা করছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ উৎখাত হওয়ার পর বাফার জোন থেকে সিরীয় সৈন্যরা পালিয়ে যাওয়ায় একটা শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। নেতানিয়াহুর দপ্তর বলছে সেই জঙ্গি গোষ্ঠীদের দ্বারা সেই শূন্যতা পূরণ করতে এবং ৭ অক্টোবরের আক্রমণের মতো গোলান উপত্যকায় ইসরায়েলিদের হুমকি দিতে ইসরায়েল দেবে না। এ বিবৃতিতে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা থেকে হামাসের হামলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয় যে, হামলায় প্রায় ১২০০ ইসরায়েলিকে হত্যা করা হয় এবং ২৫০ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যাওয়া হয়, যাদের মধ্যে ১০০ জনকে, জীবিত কিংবা মৃত এখনো তারা মুক্তি দেয়নি। ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সন্ত্রাসবাদ বিরোধী ব্যুরোর সাবেক প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (রিজার্ভ) নিতজান নুরেইল বলেন ইসরায়েল, সিরিয়ার ঘটনাগুলোর দিকে খুব সতর্কতার সঙ্গেই নজর রাখছে। নুরেইল বলেন, সিরিয়ার জন্য সব চেয়ে খারাপ যা হতে পারে, তা হলো সিরিয়া মধ্যপ্রাচ্যের সোমালিয়া হয়ে উঠবে যার অর্থ হচ্ছে অনেক সংগঠনই পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়তে থাকবে। আগামী কয়েক বছর সিরিয়া স্থিতিশীল থাকবে না। সিরিয়া স্থিতিশীল না হলে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে তার অবস্থান হারাতে থাকবে। তাদের সমর্থক যেসব গোষ্ঠী রয়েছে, আসাদ সরে যাওয়ায় তারা প্রত্যেকে এখন দুর্বল। দুর্বল হলেও তারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পরস্পর সংঘাতে লিপ্ত হতে পারে। নতুন সিরীয় সরকার বিষয়টি কীভাবে মোকাবিলা করবে তার ওপর নির্ভর করছ অনেক কিছু। এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েলও তার পরিকল্পনা সাজাতে থাকবে সিরিয়াকে ঘিরে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত