চোখধাঁধানো রূপ টেনে নিচ্ছে মৃত্যুকূপে

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৭:১৯ এএম

কনে দেখার ক্ষেত্রে কথাটা খুব শোনা যায়। যেমন রূপ তেমন গুণ। কুড়িল-কাঞ্চন ৩০০ ফুট রাস্তারও রূপ আছে, গুণও। চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা এর রূপ। আর গুণ হচ্ছে মসৃণতা। এ দুটোর কারণে যুুবক-কিশোর-কিশোরীরা ছুটে যান। ঠিক যেন পতঙ্গের আগুনে ঝাঁপ দেওয়া।

আধুনিক সেই রাস্তায় তরুণদের প্রচন্ড গতিতে মোটরসাইকেল চালানো দেখে তাজ্জব হয়ে যায় পুলিশ। তারাও তাকিয়ে দেখে। দেখা ছাড়া তাদের কি কিছু করার নেই? এ প্রশ্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আছড়ে পড়ে একেকটি দুর্ঘটনার পর। গত বৃহস্পতিবার বুয়েট শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন লিখেছেন ‘চোখ বুজে থাকার পাপেই গেল ছেলেটা।’ এর সঙ্গে চোখ বুঝে থাকার সংযোগ কোথায়? পাল্টা প্রশ্ন এসেছে। জবাব দিতেও বিলম্ব হয় না মাধ্যমগুলোতে। তাদের কথায় যা মেলে তা হচ্ছে মোটরসাইকেল যেন শূন্যে উড়ছে। সাঁই করে চোখের পলকে আড়াল হয়ে যায় সিডান বা জিপ। ভারী বাস-ট্রাক-লরিও ভোঁ ভোঁ করে ছুটতে থাকে। সবাইকে যেন গতির নেশায় পেয়ে বসে। কিন্তু সেই নেশা নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, তার তদারকি নেই। যারা তদারকি করবে সেই পুলিশের গতি নিয়ন্ত্রণে মন নেই। তাদের মন আছে কাগজপত্র পরীক্ষায়। তাও দুই মেরু দূরত্বের মতো দুই প্রান্তে। যাদের মধ্যে আবার সমন্বয় নেই। কারণ একপ্রান্তের নিয়ন্ত্রণ ঢাকা মহানগর পুলিশের কাছে। অন্যপ্রান্তের নিয়ন্ত্রণ রূপগঞ্জ পুলিশের হাতে। ফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে। বেঘোরে প্রাণ যাচ্ছে তরুণ-তরুণীদের। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে অন্যান্য অপরাধেরও।

রাজধানীর কাছেই পূর্বাচলে কুড়িল-কাঞ্চন ৩০০ ফুট সড়ক। ঢাকা শহরে মোটরসাইকেল বা প্রাইভেট কার চলে ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার গতিতে। সেখানে ৩০০ ফুট সড়কে চলে ১৩০ থেকে ১৫০ গতিতে। এ সড়কে একাধিক পুলিশের চেকপোস্ট থাকলেও গতি নিয়ে তাদের নেই কোনো মাথাব্যথা। গতির চেয়ে গাড়ির কাগজ ও অবৈধ মালপত্র পরীক্ষায় মন তাদের। কারণ এসব করলেই তাদের দক্ষিণা মেলে। তাছাড়া তাদের নেই প্রয়োজনীয় স্পিডগানসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি।

পুলিশ জানায়, এ সড়কে প্রতিনিয়ত ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে। গত এক সপ্তাহে ৩০০ ফুট সড়কের ঢাকা মহানগর অংশে তিনজন মারা গেছেন। আর রূপগঞ্জ অংশে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এই সড়কে গত পাঁচ বছরে ৭৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশই মোটরসাইকেলে। গতিসীমা ৮০ দেওয়া থাকলেও এখানের প্রায় সব গাড়িই ১৩০ থেকে ১৫০ গতিতে চলে। এই সড়কে পুলিশের পাশাপাশি যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানও দেখা যায়। তবে সব চেকপোস্টেই গাড়ির কাগজপত্র নিয়ে পরীক্ষা চলে। চালকদের গতির কারণ জিজ্ঞাসা করলেও ‘রাস্তা ফাঁকা তাই একটু গতি দিয়ে গাড়ি চালানো হচ্ছে’ বলে উড়িয়ে দেন।

গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সড়কের নীলা মার্কেট এলাকায় পুলিশের চেকপোস্টে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় প্রাইভেট কারের ধাক্কায় নিহত হয়েছেন মুহতাসিম মাসুদ (২২) নামে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন ওই বিশ^বিদ্যালয়ের আরও দুই শিক্ষার্থী। শুধু বুয়েট শিক্ষার্থী মাসুদই নয়, প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটে। গত মঙ্গলবার সকালে সড়কের বউরারটেক এলাকার ৪ নম্বর সেতুর নিচের লেকপাড় থেকে সুজানা (১৮) নামে এক কলেজছাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়। পরদিন সকালে একই স্থান থেকে সুজানার বন্ধু শাইনুর রশিদ কাব্যর (১৬) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। একইদিন দুপুরে ৩০০ ফুট সড়কের ভূঁইয়াবাড়ী ব্রিজ এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আবদুর রউফ ও শিপন নামে দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে রূপগঞ্জ থানার ওসি লিয়াকত আলী জানান, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে তাদের (কাব্য ও সুজানা) মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারা মূল সড়ক দিয়ে না গিয়ে পাশের পুরনো সড়ক ধরে বাইক নিয়ে যাওয়ার পথে ঘন কুয়াশায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মোটরসাইকেলসহ লেকে পড়ে যায়। এর আগে গত ৮ ডিসেম্বর ৩০০ ফিট সড়কে মুরগি বহনকারী একটি গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অন্য একটি গাড়ির পেছনে ধাক্কা লেগে সাকিবুল হাসান সাকিব (১৪) নামে এক মাদ্রাসাছাত্র নিহত হয়। এ সময় আহত হয় আরও তিনজন।

এসব দুর্ঘটনার বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের বাড্ডা জোনের সহকারী পুলিশ সুপার (এসি) শারমিন আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৩০০ ফুট সড়কের অর্ধেক পড়েছে আমাদের এলাকায়। আর বাকি অর্ধেক রূপগঞ্জ থানার আওতায়। আমরা প্রতিনিয়ত চেকপোস্ট বসাই। কিন্তু গাড়ির অতিরিক্ত গতির কারণে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। প্রায়ই গভীর রাতে বেপরোয়া গাড়ি চালান চালকরা। এ কারণে কিছু মামলাও দেওয়া হয়। এ ছাড়া অবৈধ মালামাল আছে কি না, তাও পরীক্ষা করা হয়। রাতে ওই সড়কে এত গাড়ি থাকে যে, সব গাড়িকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তবে আমাদের সবার উচিত সচেতন হওয়া। সবাই যদি সচেতন হয়ে গাড়ি চালাই তাহলে দুর্ঘটনা হবে না।’

বেসরকারি চাকরিজীবী মাহমুদুল হাসান তার মোটরসাইকেল নিয়ে প্রায় রাতেই ৩০০ ফুটে ঘুরতে যান। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকার মধ্যে ৩০ থেকে ৪০-এর ওপর মোটরসাইকেল চালানো যায় না। তাই ৩০০ ফিটে আসি। এখানে ১০০ থেকে ১২০ গতিতে চালাতে ভালো লাগে। তবে কিছু গাড়ি আমাদের চেয়েও বেশি গতিতে চালায়। নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে অনেক সময় তারা দুর্ঘটনার শিকার হয়। আবার আন্ডার বাইপাসে অনেকে গাড়ি থামিয়ে ছবি তোলেন। একপাশ থেকে অন্যপাশ দেখা যায় না বলে দুর্ঘটনায় পড়তে হয়।’

আপনি (মাহমুদুল) কখনো দুর্ঘটনায় পড়ছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বড় কোনো দুর্ঘটনায় না পড়লেও ছোট ছোট দুর্ঘটনায় পড়েছি। কিন্তু অনেক বাইক দুর্ঘটনা দেখেছি। মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরতে আসা যুবকরা প্রতিযোগিতা করেন। তাদের মোটরসাইকেলে চালকসহ তিনজন থাকেন। এসব মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। সেসব বাইকাররাই বেশি দুর্ঘটনায় পড়েন।’

রাজধানীর কলাবাগান থেকে গত শনিবার ৩০০ ফুট সড়কে গিয়েছিলেন অনন্ত সালাম। কেন সেখানে মোটরসাইকেল চালাতে এসেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রাতের মায়াবী দৃশ্য দেখতে আসি। সুন্দর লাইটিং, স্ট্রিট লাইট, ওভারপাস সবকিছুই সুন্দর। তাছাড়া এত উন্নতমানের পিচ আর কোনো রাস্তায় নেই। রাস্তা ভাঙা নয়, এবড়োখেবড়োও না। এগুলো উপভোগের জিনিস বলে বোঝানো যাবে না। মনে হয় বিদেশের রাস্তায় বাইক চালাচ্ছি।’

কিন্তু মনোরম পরিবেশের সঙ্গে দুর্ঘটনাও যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে তা ফুটে উঠেছে বিশেষজ্ঞদের কথায়। তাদের মতে, বেপরোয়া গতি আর বাইকারদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণে দিন দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে সড়কটি। অবৈধ গাড়ি পার্কিং, লাইসেন্সবিহীন গাড়িচালক, ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও হেলমেটবিহীন মোটরসাইকেল চালানোও দুর্ঘটনার কারণ।

৩০০ ফুট এলাকায় দুর্ঘটনা রোধে পুলিশের কাছে পর্যাপ্ত যন্ত্রাংশ নেই উল্লেখ করে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, “এই সড়কে সড়ক দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশই হয় মোটরসাইকেলে। একটি মোটরসাইকেলে দুই-তিনজন থাকেন, আবার গতিও থাকে ১০০-এর ওপর। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনাগুলো হয়। গতি পরিমাপের যে যন্ত্র ‘স্পিড গান’ সেটি থাকে না চেকপোস্টে থাকা পুলিশের কাছে। আবার চালকরা মদ্যপ অবস্থায় রয়েছে কি না, তাও পরিমাপ করা যায় না। কারণ তাদের কাছে মাদক পরিমাপক ‘ব্রেথ এনালাইজার’ থাকে না। তাই ওই সড়কে পুলিশের চেকপোস্ট থাকলেও দুর্ঘটনা রোধে তেমন কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না।”

রূপগঞ্জ থানা পুলিশ জানিয়েছে, ২০২৩ সালের নভেম্বরে পূর্বাচলের ৩০০ ফুট সড়কে যৌথ বাহিনীর অভিযানে ১১৯টি গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। এ ছাড়া জরিমানা আদায় করা হয়েছিল ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা। গত বছর পুলিশ অভিযান চালিয়ে ২০০ গাড়িকে অতিরিক্ত গতির জন্য সতর্ক করেছিল। রূপগঞ্জ থানার ওসি লিয়াকত আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চেকপোস্টের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী যথেষ্ট পরিমাণে নেই। একসঙ্গে যখন ১৫ থেকে ২০ জন বাইকার আসে, তখন তাদের থামানোও সম্ভব হয় না। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যানবাহনের চাপ কমে যায়। তখন বাইকার বা অন্য গাড়িচালকরাও বেপরোয়া চালান। এসব কারণে প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনা ঘটছে।’

নারায়ণগঞ্জ জেলার সহকারী পুলিশ সুপার (গ-সার্কেল) মেহেদী ইসলাম বলেন, ‘সড়কে চেকপোস্ট রয়েছে। তার পরও সম্ভব হচ্ছে না। বেশিরভাগ দুর্ঘটনা বাইকারদের। শিগগিরই সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হবে।’

৩০০ ফুট সড়কটির অবস্থান রাজধানীর উত্তর-পূর্ব কোনায়। গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানায়ও কিছু অংশ পড়েছে। শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর মাঝখানে প্রায় ৬ হাজার ২১৩ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে মনোরম সড়কটি। ঢাকার সঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের সংযোগ স্থাপন করেছে সড়কটি। সড়কে কোনো ট্রাফিক সিগন্যাল নেই। সার্ভিস লেন থেকে এক্সপ্রেসওয়েতে যাওয়ার জন্য সড়কটিতে রয়েছে পাঁচটি অ্যাটগ্রেড ইন্টার-সেকশন। এগুলোর নিচের আন্ডারপাস বা পাতাল সড়ক দিয়ে গাড়িগুলো চলে যেতে পারে এক্সপ্রেসওয়েতে। এরকম পাতাল সড়ক রয়েছে ১২টি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত