‘শুন রে আজব কথা, শুন বলি ভাইরে/ বছরের আয়ু দেখ বেশি দিন নাইরে।/ ফেলে দিয়ে পুরাতন জীর্ণ এ খোলসে/ নূতন বরষ আসে কোথা হতে বলো সে’! সুকুমার রায়ের এই ছড়া দিয়ে লেখাটা শুরু করি। আজসহ ২০২৪ সালের আর মাত্র ৪ দিন আছে। কিন্তু বছরের ফেলে আসা দিনগুলো আমরা কেমন কাটিয়েছি, কেমন আছি? আমাদের রাজনৈতিক অর্জনই বা কী? বছর জুড়ে মুদ্রাস্ফীতি, অর্থপাচার এবং দ্রব্যমূল্যের জ্যামিতিক ঊর্ধ্বগতির ফলে দেশে গণমানুষের মধ্যে অস্থিরতা ছিল ভীষণ। বছরের সমস্ত আলোচনাকে পেছনে ফেলে, প্রথম এবং প্রধান হয়েছে গত ৫ আগস্ট, ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা নিয়ন্ত্রিত আওয়ামী লীগ সরকারের পতন। যদিও বিগত সরকারের পতন আকস্মিক ছিল না তবু জনবিদ্রোহের যে দৃশ্য আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, তা আপাত পরিষ্কার করেছে ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। ঠিক আজকের দিনে প্রধান ভাবনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, ফেলে আসা দিনে কী পেয়েছি এবং চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কীভাবে, কোন বিন্দুতে রেখে পা রাখছি নতুন বছরে? ২০২৪ সাল রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে আমাদের পথচলা কি আরও কঠিন করে তুলল? নাকি বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস পেছনে ফেলে আমরা নতুন প্রাণশক্তি সঞ্চয় করেছি? যদি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পথচলা কঠিন না হয় তাহলে বলা যায়, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানই ২০২৪ সালের প্রধান অর্জন।
স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে ১৯৯০ সালে। সেটা ছিল, স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে। তখন বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং বাম দলগুলো এক হয়ে স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু তাদের তেজ বাড়ে তখন, যখন তৈরি হয় ‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য’। শুধু ইসলামী ছাত্রশিবির ছাড়া, সমস্ত ছাত্র সংগঠন একত্রিত হয় ‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য’র ব্যানারে। ছাত্রদল, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, জাসদ ছাত্রলীগ, বাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্রমৈত্রী, ছাত্র ফেডারেশনসহ সমস্ত ছাত্র সংগঠন একই প্ল্যাটফর্মে দেশব্যাপী দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে। পরিণতি কী হয়েছিল, আমরা জানি। স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতনের পর, দেশের ছাত্রসমাজ এক বুক স্বপ্ন এঁকেছিল বাংলাদেশ নিয়ে। কিন্তু তা হয়নি। উপরন্তু তারাই সময়ের প্রেক্ষিতে আবার ক্ষমতার পাশে চলে গেছে। মানুষ ভুলতে বসেছিল, স্বৈরাচারের সেই অত্যাচারের কাহিনি।
এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী গণতান্ত্রিক চেহারার রাজনৈতিক দলের মধ্যেও যে স্বৈরাচারের ভূত বাসা বাঁধবে, কে জানত? সময়ের পরিক্রমায় গণমানুষের আশা-আকাক্সক্ষাকে ধূলিসাৎ করে, নখ-দন্ত নিয়ে আবির্ভূত হলো নতুন স্বৈরাচার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। দীর্ঘ সময় দেশ শাসন করে, ক্রমান্বয়ে দৈত্য হয়ে ওঠা আওয়ামী লীকেও এই বছরই ভোগ করতে হয়েছে করুণ পরিণতি। ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো সরকারপ্রধানই শেখ হাসিনার মতো লুকিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হননি। অথচ গত ৫ আগস্ট তাই-ই হলো। শেখ হাসিনা গোপনে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। এরপরের ঘটনা সবাই জানেন। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, তারপর? এখানেই রয়েছে সর্বদলীয় ঐক্য নিয়ে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে পথচলার বিষয়। এই বিষয়টিই ২০২৪ সালে মুখ্য আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। গণ-আন্দোলনের মুখে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্বৈরাচার পতনের ইতিহাস নতুন নয়। কিন্তু সরকারের পতনের পর সরকারপ্রধানসহ একসঙ্গে ৩০০ সংসদ সদস্য পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বে বিরল। শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তিরাই নন, যারা গত ১৬ বছর শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচার হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে, এমন ব্যক্তিও আন্দোলনের মুখে পালিয়ে গেছেন, যা ছিল ২০২৪ সালের আলোচিত ঘটনা। আধুনিক যুগে স্বৈরশাসকদের ক্ষমতায় আসার কৌশলে পরিবর্তন এসেছে, পরিবর্তন এসেছে টিকে থাকার কৌশলে। অতীতে স্বৈরশাসকরা রাজাকে হত্যা করে, যুদ্ধ জয় করে ক্ষমতায় আসতেন। আধুনিক যুগে স্বৈরশাসকরা ক্ষমতায় আসছেন সামরিক বাহিনী থেকে, কিছু দেশে রয়েছে একদলীয় স্বৈরশাসন। আবার অনেক দেশেই গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত শাসক ক্ষমতায় এসে হয়েছেন স্বৈরাচার। তবু ইতিহাসে বারবার আবির্ভাব হয়েছে মুক্তিকামী মানুষের। স্বৈরশাসকের অত্যাচার আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে স্লোগান ধরেছে স্বাধীনচেতারা।
দার্শনিক অ্যারিস্টটলের মতে, রাজনৈতিক বিপ্লব দুই ধরনের উদ্দেশ্য সামনে রেখে হতে পারে। প্রথমত, পুরোপুরি বদল নিয়ে আসা রাজনৈতিক কাঠামোতে। যেমন- অর্থনৈতিক সংস্কার করা, যার উদ্দেশ্য থাকে সামাজিক কাঠামো সংস্কারেরও। দ্বিতীয়ত, বর্তমান কাঠামোর সংস্কার করে তা জনবান্ধব করা। স্বৈরশাসক যখন ক্ষমতায় থাকেন, তখন সে কাঠামো থেকে সরিয়ে দেয় নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ করার মতো সব যোগ্য মানুষকে, নিষ্ক্রিয় করে দেয় স্বাধীনচেতা আর বুদ্ধিজীবীদের। আবার অনেকে বিক্রি হতে পছন্দ করেন। সিভিল সোসাইটিকে পরিণত করেন অকার্যকর অংশ হিসেবে। তখন সমাজ পরিবর্তনে তাদের ভূমিকা হয়ে যায় সীমাবদ্ধ। ফলে যখন একজন স্বৈরশাসকের পতন হয়, তখন নেতৃত্ব গ্রহণ করার মতো উপযুক্ত ব্যক্তিত্ব দেশে থাকে না, দেশের রাজনৈতিক অবস্থা হয়ে পড়ে টালমাটাল। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার অনেকটাই পরিস্থিতি সামলে নিয়েছে। কিন্তু বছরের শেষে এসে হঠাৎ করে, প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ে ভয়ংকর অগ্নিকান্ড অনেক প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে আমাদের রাজনীতি যে পর্যায়ে এসেছে, তা রীতিমতো বিভিন্ন প্রশ্ন তৈরি করেছে। যার উত্তর আপাতত নেই। হয়তো নতুন বছরে এ রহস্যের উন্মোচন হতে পারে।
প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক সময় পর্যন্ত যারা স্বৈরাচারী মনোভাব নিয়ে সরকার পরিচালনা করেছেন তাদের সবার পতন হয়েছে। যারা রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন করেছে সবারই পতন হয়েছে। এটা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের শিক্ষা। ২০২৪ সালের বর্ষসেরা দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে নির্বাচিত করেছে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য উন্নতির জন্য এই স্বীকৃতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। উজ্জ্বল আগামী আর পরিবর্তনের স্বপ্নে জেগে ওঠা তরুণরা হয়তো এক সময় সফল হবে, আদায় করে নেবে নিজের অধিকার। বাংলাদেশ জেগে থাক সম্মিলিত শুভ শক্তিতে, বছর শেষে এই কামনা।
লেখক : সাংবাদিক
