মোড়ল হওয়ার বাহানা বাসনা

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ০২:৫৭ এএম

ফিলিস্তিনের গাজা ও পশ্চিম তীর, লেবানন ও সিরিয়ার পর এবার মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ ইয়েমেনে হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। গত সপ্তাহে ইয়েমেনের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানোর খবর জানিয়ে ইসরায়েল দাবি করে, তাদের দেশ অভিমুখে হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে ইয়েমেনে আনুষ্ঠানিকভাবে এ হামলা চালানো হয়েছে। হামলার পর হুতিদের আল মাসিরাহ টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিবেদনে নয়জন নিহত হওয়ার তথ্য দিয়ে বলা হয়, সানার দুটি কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা হয়েছে। এ ছাড়া হোদেইদাহর বন্দরে শত্রুপক্ষ অন্তত চারটি হামলা চালিয়েছে। জ্বালানি স্থাপনায় দুটি হামলা হয়েছে।

ফিলিস্তিন, লেবানন, ইরান কিংবা সিরিয়ার পর ইয়েমেনে হামলার ঘটনায় বিশ্ব জুড়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতায় মত্ত ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে অনন্ত যুদ্ধের দরজা খুলে দিয়েছে। দেশটি চায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে ফেলতে। মধ্যপ্রাচ্যের নেতা হতে যায় ইসরায়েল। এ কারণেই একের পর এক বেপরোয়া আচরণ করে যাচ্ছে দেশটি।

ইসরায়েলের বেপরোয়া আচরণের শিকার হয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রধান তেদ্রোস আধানম গ্যাব্রিয়াসুসও। গত বৃহস্পতিবার সানা বিমানবন্দরে ইসরায়েলি হামলার শিকার হয়েছে তাকে বহনকারী উড়োজাহাজ। এমন ঘটনার পরও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইয়েমেনে হামলা অব্যাহত রাখার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী ইয়েমেনে হামলা চালিয়ে যাবে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রতিরোধ অক্ষের অংশ হুতি বিদ্রোহীরা। নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের শয়তান অক্ষ থেকে এ সন্ত্রাসী শাখাকে (হুতি বিদ্রোহী) কেটে ফেলতে তারা বদ্ধপরিকর। নেতানিয়াহু আরও বলেন, আমাদের সেনাদের হুতি অবকাঠামো ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়েছি। কারণ, যারা আমাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা পূর্ণ শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ব।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ইসরায়েল ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, সানা বিমানবন্দরে হামলা বিশেষ উদ্বেগের। একজন প্রত্যক্ষদর্শী এএফপিকে বলেন, সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ছয়টির মতো হামলা চালানো হয়েছে। হামলা হয়েছে পার্শ্ববর্তী আল-দাইলামি বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করেও।

এর আগে গত সপ্তাহে ইসরায়েলে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেন হুতি বিদ্রোহীরা। গাজায় ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞের প্রতিক্রিয়ায় এ হামলার কথা জানান তারা। গাজায় ইসরায়েল যুদ্ধ বন্ধ না করা পর্যন্ত তারা দেশটিকে লক্ষ্য করে এ ধরনের হামলা অব্যাহত রাখারও ঘোষণা দিয়েছেন। ওই হামলায় অন্তত ১২ ইসরায়েলি আহত হন। তেল আবিবের একটি পার্কে ওই ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। ইসরায়েলে সেটি ভূপাতিত করতে ব্যর্থ হয়। ওই ঘটনার পর থেকে ইয়েমেনকে লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। তবে এ হামলা যতটা না প্রতিশোধমূলক তার চাইতে বেশি প্রভাব বিস্তারের। হামাস বা হিজবুল্লাহর সঙ্গে কার লড়াইয়ে ইসরায়েলের অবস্থা এক রকম থাকলে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের নাটকীয় পতনের পরিস্থিতি বদলে যায়। বাশার আল-আসাদের পতনের পরপরই দেশটিতে ব্যাপক হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এ হামলার সঙ্গে নিজেদের সুরক্ষা জড়িত বলেও দাবি করেছে তারা। বাশার আল-আসাদের পতনের পর কয়েক দিনে সিরিয়া জুড়ে পাঁচ শতাধিক হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। একই সময়ে তারা সিরিয়া-ইসরায়েল সীমান্তে গোলান মালভূমির বাফার জোন বা নিরস্ত্রীকরণ অঞ্চলের দখল নিয়েছে। ইসরায়েলের ভাষ্য, ১৯৭৪ সালে যে চুক্তির ভিত্তিতে এই বাফার জোন গড়ে তোলা হয়েছিল, তা ব্যর্থ হয়েছে। এখানে তারা এখন সুরক্ষিত প্রতিরক্ষা অঞ্চল সৃষ্টি করতে চায়। সিরিয়ায় বাশারের ক্ষমতা হারানোর কৃতিত্বও নিয়েছেন ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার দাবি, ইসরায়েলের হামলার কারণে হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরান দুর্বল হয়েছে। বাশারের পতনের পেছনে এর সরাসরি প্রভাব রয়েছে। অবশ্য সিরিয়ায় ইসরায়েল যে হামলা চালাচ্ছে, তার পেছনে দেশটির সুযোগসন্ধানী মনোভাব ও কৌশল রয়েছে বলে মনে করেন ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মাইরাখ জোনসজেইন। তিনি বলেন, আমি মনে করি, বাস্তবে আমরা ইসরায়েলে এমন একটি কৌশল দেখতে পাচ্ছি, যা তারা গত বছরের অক্টোবরের ৭ তারিখ থেকে বাস্তবায়ন করছে। সেটি হলো একটি হুমকি বা সুযোগ শনাক্ত করা, তারপর সেখানে সেনা মোতায়েন করা এবং হুমকি নির্মূল করা বা সুযোগের সদ্ব্যবহার করা।

তবে ইসরায়েলের কৌশলের বিষয়ে দ্বিমত রয়েছে ইসরায়েলি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ওরি গোল্ডবার্গের। তেল আবিব থেকে তিনি বলেন, সিরিয়ায় ইসরায়েল যে হামলা চালাচ্ছে, তা দেশটির নতুন নিরাপত্তা নীতি অনুযায়ী হচ্ছে। মানুষজন বৃহত্তর ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন। তবে এমন কিছু দেখছেন না তিনি। তার মতে, সিরিয়ায় ইসরায়েলের হামলার পেছনের বড় কারণ দেশটিতে চলমান বিশৃঙ্খলা।

তবে গাজায় ও লেবাননে তাদের কর্মকাণ্ড সাক্ষ্য দেওয়া অন্য বিষয়। গত ১৪ মাসে ইসরায়েল লেবানন ও গাজায় অন্তত ৪৮ হাজার ৮৩৩ জনকে হত্যা করেছে। কোথাও কোথাও ইসরায়েলি বাহিনী জাতিগত নিধনে জড়িয়েছে বলে অভিযোগ আছে। এ বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু নিয়ে কোনো অনুতাপ নেই বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর; বরং মধ্যপ্রাচ্যের রূপ বদলে দেওয়ার যে কথা তিনি বলেছেন, তা ইসরায়েলের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশ করা হচ্ছে। দ্য জেরুজালেম পোস্টের এক মতামতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, গত বছরে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল যে স্থিতিশীলতা এনেছে, তা দশকের পর দশক ধরে চেষ্টা করেও জাতিসংঘের সংস্থাগুলো ও পশ্চিমা কূটনীতিকরা আনতে পারেননি। সিরিয়া-ইসরায়েল সীমান্তের বাফার জোনের দেখভাল করার দায়িত্ব জাতিসংঘের। ইসরায়েল এই অঞ্চল দখলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। এ বিষয়ে ওরি গোল্ডবার্গ বলেন, জাতিসংঘের প্রতিবাদের কোনো অর্থ নেই। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ও অপরাধ আদালতকে বলতে চাই, তাদের আমরা তোয়াক্কা করি না। আমরা যা চাই, তাই করব।

দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের কলাম লেখক জেফরি লেভিন বলেছেন, গাজায় অভিযান শুরুর পর থেকে শান্তিও সমৃদ্ধির নতুন একটি মধ্যপ্রাচ্যের দিকে অগ্রগতি হয়েছে। গত বছর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যে পরিবর্তন এসেছে, তার ভিত্তিতে লেভিনের ভবিষ্যদ্বাণী হলো আসাদ পরিবারের ভূরাজনৈতিক কৌশল থেকে মুক্তি পাবে সিরিয়া; ধর্মতান্ত্রিক শাসন থেকে মুক্তি পাবে ইরান, কুর্দিরা নিজেদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে পারবে এবং জর্ডানে নিজেদের একটি নতুন দেশ গড়ে তোলার স্বাধীনতা পাবেন ফিলিস্তিনিরা।

তবে সবকিছু যে ইসরায়েলের চাওয়া মতো হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। মিডল ইস্ট আইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান সম্পাদক ডেভিড হার্স্ট বিষয়টিকে দেখছেন একটু ভিন্নভাবে। তার ভাষ্য, হামাস, হিজবুল্লাহ, হুতিদের ওপর হামলা চালিয়ে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি দেশকে নিজেদের বিরুদ্ধে দাঁড় করাচ্ছে। অসলো চুক্তির পর থেকে গত তিন দশকে আরব বিশ্বে ফিলিস্তিনের সমস্যা গুরুত্ব হারিয়েছিল। এই সময়টাতে ফিলিস্তিন ইস্যু আরব বিশ্বে অনেকটাই ফিকে হয়ে গিয়েছিল। আরব বসন্তের পর পাল্টা বিপ্লবে আরব বিশ্বের মধ্যে যে বিভক্তি তৈরি হয়েছিল, ইসরায়েলের এই অবাধ আক্রমণ সেই বিভক্তি সারিয়ে তুলছে।  তিনি বলেন, আপনি যখন নাসরুল্লাহকে হত্যার জন্য ৮০ টন বোমা ফেলেন এবং এরপর নির্বিচার ৩০০ জনকে হত্যা করেন, তখন আপনি তাকে প্রতিরোধের প্রতীক থেকে এক কিংবদন্তিতে পরিণত করে ফেলেন।

তার ভাষ্য, প্রতীক চলে গেলে কিংবদন্তি জন্ম নেয় এবং প্রতিরোধ চলতে থাকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত