যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে ‘হরমুজ প্রাণালি’ কে নিজেদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে ইরান। যুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ে যেখানে এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হতো, যুদ্ধকালীন সময়ে তা শূন্যের কোটায় নেমে আসে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি খাত অস্থিতিশীল হওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ব্যাপক চাপে পড়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত সপ্তাহ থেকে দুপক্ষের মধ্যে শুরু হওয়া পাল্টাপাল্টি হামলা পশ্চিম এশিয়ার তেল সমৃদ্ধ অঞ্চলটিতে আবারও পুরোদমে যুদ্ধের শঙ্কা বাড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে হরমুজের বিকল্প খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র। আর সেক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য হয়ে উঠেছে ইরাক। আলজাজিরা জানিয়েছে, ইতিমধ্যে ইরাক সরকারের সঙ্গে ৪৮টি চুক্তি ও অংশীদারিত্ব ঘোষণাপত্র সই করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কোম্পানি। এসব চুক্তির মধ্যে পারস্য উপসাগরে হরমুজ প্রণালির বিকল্প পথে ইরাক-সিরিয়া তেল পাইপলাইন পুনর্নির্মাণের মতো বড় প্রকল্পও রয়েছে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদির যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে এসব চুক্তি সই হয়।
এসব চুক্তির মধ্যে ইরাকের তেল ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সনমোবিল, কেবিআর, জিই ভার্নোভা, শেল এবং হ্যালিবার্টনের সহযোগিতা ও অংশীদারত্ব রয়েছে। এ ছাড়া, ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যে একটি বড় অপরিশোধিত তেল পাইপলাইন নির্মাণ সংক্রান্ত একাধিক চুক্তিও হয়েছে। ইরাকের তেলমন্ত্রী বাসিম মোহাম্মদ খুদাইর জানিয়েছেন, পারস্য উপসাগরের কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এড়াতে বসরা থেকে কিরকুক হয়ে তুরস্কের সিহান বন্দর এবং সিরিয়ার বানিয়াস পর্যন্ত একটি নতুন তেল পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে সরকার। গত শনিবার ওয়াশিংটন থেকে ইরাকি নিউজ এজেন্সি (আইএনএ)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খুদাইর বলেন, ইরাকি তেল রপ্তানি রুটগুলোর বহুমুখীকরণ এবং কেবল হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল না থাকার বিষয়ে আমাদের একটি স্পষ্ট রূপরেখা ও কৌশল রয়েছে। তিনি জানান, এ লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি শেভরন ও টিই ক্যাপিটাল এবং কাতারের ইউসিসি নিয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করা হয়েছে।
খুদাইর বলেন, মন্ত্রণালয় বর্তমানে বসরা থেকে কিরকুক এবং সেখান থেকে তুরস্কের সিহান বন্দর পর্যন্ত একটি কৌশলগত পাইপলাইন কীভাবে তৈরি করা যায় সে বিষয়ে একটি সমীক্ষা চালাচ্ছে। তিনি আরও যোগ করেন, এই প্রকল্পের আওতায় সিরিয়ার বানিয়াস পর্যন্ত পাইপলাইনের একটি শাখা সম্প্রসারণের বিষয়েও সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর বানিয়াসে দেশটির অন্যতম প্রধান তেল পরিশোধনাগার এবং ভূমধ্যসাগরে একটি তেল রপ্তানি টার্মিনাল রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে কিরকুক থেকে স্থলপথে ইরাকি অপরিশোধিত তেল বহনের জন্য এই পাইপলাইনটি ব্যবহৃত হতো। তবে কয়েক দশকের যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে বর্তমানে এই পাইপলাইনটি অকার্যকর অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংস্থা ওপেক-এর দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদক দেশ ইরাক। দেশটি তার অপরিশোধিত তেল রপ্তানির জন্য দীর্ঘ বছর ধরে মূলত হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালি বারবার বন্ধ হওয়া এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে এই বিকল্প রুট তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বাগদাদ। ইরাকের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানায়, চুক্তি অনুযায়ী এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে শেভরন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রদপ্তর জানিয়েছে, তারা ইরাক ও সিরিয়ার পাইপলাইন পুনর্বাসন পরিকল্পনাকে স্বাগত জানায়। দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একটি আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়াম এই প্রকল্পের কারিগরি ও আর্থিক দিকগুলো বাস্তবায়ন করবে। পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পাইপলাইন পুনর্বাসন সম্পন্ন হলে প্রাথমিকভাবে প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহনের সক্ষমতা তৈরি হবে। তারা এই পাইপলাইনকে ইরাকের তেল উৎপাদনে ভূমধ্যসাগরীয় রপ্তানি বাজার এবং এর বাইরের অন্য বাজারের সঙ্গে সংযুক্তকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হিসেবে বর্ণনা করেছে। তুরস্কে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত টম বারাক বলেছেন ইরাকের সর্বশেষ তেল পাইপলাইন চুক্তিগুলো এমন এক কর্মসূচির পথ তৈরি করবে, যা ‘হরমুজ প্রণালিকে গুরুত্বহীন করবে’। সিরিয়া পাইপলাইন প্রকল্পের পাশাপাশি শেভরন ইরাকের সঙ্গে তেল উৎপাদন বাড়াতে আরও দুটি চুক্তি করেছে বলে জানিয়েছেন কোম্পানিটির করপোরেট বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রেসিডেন্ট জেক স্পিয়ারিং। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্যানুযায়ী, জ¦ালানি, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রযুক্তি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইরাকের এই চুক্তিগুলোর মোট মূল্য ৬ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি।