সাংবাদিকদের কার্ড নিয়ে তোলপাড়

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৮:২০ এএম

অগ্নিকান্ডের পর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতিপত্র বা অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিলের ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। একে অগণতান্ত্রিক হিসেবে দেখছেন সাংবাদিকরা। তবে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গতকাল শনিবার সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত সাময়িক। দ্রুতই পেশাদার সাংবাদিকরা তাদের অধিকার ফেরত পাবেন। পেশাগত সাংবাদিকদের এতে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।

গত বুধবার রাতে সচিবালয়ে আগুন লাগলে পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ফাইলসহ আসবাবপত্র পুড়ে যায়। এরপর শুক্রবার রাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মো. খোদা বখস চৌধুরীর সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘বাংলাদেশ সচিবালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা বৃদ্ধির স্বার্থে সচিবালয়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুকূলে ইস্যুকৃত স্থায়ী প্রবেশ পাস (ডিজিটাল অ্যাকসেস কন্ট্রোল সিস্টেম) এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ইস্যুকৃত অস্থায়ী প্রবেশ পাস ছাড়া সব ধরনের অস্থায়ী (বেসরকারি ব্যক্তিদের জন্য) সচিবালয় প্রবেশ পাস বাতিল করা হলো। সাংবাদিকদের অনুকূলে ইস্যুকৃত অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড দিয়ে সচিবালয়ে প্রবেশাধিকার-পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে।’

এই সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক নয় দাবি করে দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢালাওভাবে প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল অগণতান্ত্রিক। এভাবে প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল ভালো লক্ষণ না। তদন্তের স্বার্থে এক দিন বা দুদিনের জন্য সীমিত করলেও এমন করে বাতিল করাটা উচিত হয়নি। সরকারের কাছে সবার ফাইল সংরক্ষিত আছে, যাদের কর্মকা- প্রশ্নবিদ্ধ, তাদের চিহ্নিত করাটা মোটেও কঠিন কাজ ছিল না। এটিকে সবার জন্য আরোপিত করা ও নতুন করে বাছাই করে কার্ড দেওয়ার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হবে। “পছন্দের লোক হলে কার্ড পাবেন, না হলে পাবেন না” এমনটি হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।’

সচিবালয়ে অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিলের ঘটনা নজিরবিহীন। বিভিন্ন সময় সরকার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত কেউ তা বাতিল করেনি। ২০০৩ সালে বিএনপি সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশ সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সে সময় সচিবালয় বিটে কর্মরত সাংবাদিকরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। সাংবাদিকরা ছুটে যান বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব ও সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মান্নান ভূঁইয়ার কাছে। তিনি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। মান্নান ভূঁইয়া স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে টেলিফোনে বলেছিলেন, অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করলে বহির্বিশ্বে ভুলবার্তা যাবে। তা ছাড়া বিষয়টি গণতান্ত্রিক নয়। তিনি অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিলের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান। সেদিনই তা বাতিল করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ ঘটনাটি জানিয়ে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএসআরএফ) একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওইদিনই আমরা পেশাগত নিরাপত্তার জন্য বিএসআরএফ গঠন করেছিলাম।’

গত বছর সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিকদের প্রবেশে কড়াকড়ি করে। এর আগে দুর্নীতি দমন কমিশনে বেলা ৩টার আগে সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সোহেল সাংবাদিকদের প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিলের প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড হচ্ছে একজন পেশাদার সাংবাদিকের জন্য সরকারের স্বীকৃতির সনদ। এ কার্ড দেখিয়েই সচিবালয়ে ঢোকা যেত, এ কথা সত্য। তবে এটা একটা রীতি বা রেওয়াজ। আসলে অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড সচিবালয়ের প্রবেশপত্র নয়। এর জন্য আলাদা পাস বা অনুমোদনপত্র নেওয়া বিধিসম্মত। ব্যাপারটা সচিবালয়ের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িতরাও জানেন বলে মনে হয় না। নিরাপত্তার অজুহাতে সচিবালয়ে প্রবেশাধিকারে কড়াকড়ি আরোপ করতে গিয়ে অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিলকে সংশ্লিষ্ট করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। এই কার্ড বাতিল করে নতুন করে ইস্যুর সিদ্ধান্তটা আলাদা প্রসঙ্গ। দুটিকে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে যে নোটিফিকেশন জারি করা হয়েছে, সেটার ভাষাও রীতিমতো আপত্তিকর। এই মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মো. খোদা বখস চৌধুরী স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তির শেষ লাইনে বলা হয়েছে, এই আদেশ জারি করা হলো। আদেশ মানে? এসব আমলা ও ভূতপূর্ব আমলাদের মাইন্ডসেট একটুও বদলায়নি। পাবলিক সার্ভেন্ট হয়েও ওরা এখনো হুকুম দিয়েই যাচ্ছে। জামানা যে বদলে গেছে, সেটা ওরা এখনো বুঝতেই পারেনি। মানসিকতা না বদলানো পর্যন্ত এদের দিয়ে রাষ্ট্রকাঠামো বদলানো সত্যিই অসম্ভব।’

সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং। প্রেস উইং জানিয়েছে, মূলত সচিবালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই সাংবাদিকদের প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের পর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার (কেপিআই) সুরক্ষা নিশ্চিতের খাতিরেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সরকার বিদ্যমান প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড পর্যালোচনা করে নতুন কার্ড ইস্যুর জন্য শিগগিরই স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছ থেকে আবেদন গ্রহণ করবে। এ সময়ের মধ্যে সাংবাদিকদের জন্য প্রতিটি মন্ত্রণালয় তাদের নিজস্ব অনুষ্ঠান অনুযায়ী দৈনিক অস্থায়ী অ্যাক্সেস কার্ড বা প্রবেশ পাস ইস্যু করবে। সাময়িক অসুবিধার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং সহযোগিতা কামনা করেছে প্রেস উইং। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম তার ভেরিভায়েড ফেসবুক পেজেও একই বার্তা দিয়েছেন।

গতকাল শনিবার এক ফেসবুক পোস্টে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আজাদ মজুমদার বলেছেন, ‘কোনো সাংবাদিকের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বাতিল করা হয়নি। শুধু সচিবালয়ের ক্ষেত্রে এর ব্যবহার সীমিত করা হয়েছে। তা-ও খুবই অল্প সময়ের জন্য। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অস্থায়ী পাস ইস্যু করা হবে। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিগগিরই বিদ্যমান সব প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড পর্যালোচনা করা হবে এবং নতুন অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড ইস্যু করার জন্য সমস্ত স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কাছে আবেদন চাওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘কিছু লোক সরকারকে কঠোর হতে বলে আবার সামান্যতম কঠোর হলে গেল গেল রব তোলে। এই দ্বিচারিতা বন্ধ হওয়া জরুরি। সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করা নিয়ে যথারীতি এই দ্বিচারিতা আবার শুরু হয়েছে। প্রবেশাধিকার সীমিত করার এই সিদ্ধান্তটি খুবই সাময়িক।’ তিনি বলেন, এটা এখন ওপেন সিক্রেট, বাংলাদেশ সচিবালয়কে দালালদের হাটবাজার বানিয়ে ফেলা হয়েছিল। সরকারের সর্বশেষ এই সিদ্ধান্তে দালাল ছাড়া কারও শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা মনে করি, এটা সাংবাদিকদের কাজ আরও সহজ করবে। এখন সাময়িক অসুবিধা হলেও চূড়ান্ত বিচারে এটা সবাইকে সহযোগিতা করবে। এজন্যই সবার সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে।’

‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার স্বচ্ছতায় বিশ্বাসী বলেই এ ধরনের কমিটি করা হয়েছে। সাংবাদিকদের দূরে রেখে তদন্তকাজ চালানো হবে বলে যারা আবোলতাবোল বকছেন, এরা মারাত্মক ভুলে আছেন। আমাদের বিশ্বাস, সাংবাদিকরাও বিষয়টি উপলব্ধি করবেন এবং চলমান পরিস্থিতিতে সরকারকে সহযোগিতা করবেন’ যোগ করেন তিনি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বার্তায় বলা হয়েছে, অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিলের এ সিদ্ধান্ত ‘সাময়িক’ এবং দ্রুতই এ ব্যাপারে ‘ইতিবাচক’ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আজ রবিবারই সাংবাদিক সংগঠন ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে সচিবালয়ে প্রবেশের জন্য অস্থায়ী প্রবেশ পাসের আবেদন গ্রহণের জন্য বিশেষ সেল গঠন করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের পরিচালক (জনসংযোগ) ফয়সল হাসান কয়েকটি বার্তায় এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব এফএম তৌহিদুল আলম এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মৃত্যুঞ্জয় বাড়ৈকে পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওই সেলে দায়িত্ব পালনের জন্য সংযুক্ত করা হয়েছে।

কার্ড বাতিল প্রসঙ্গে বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলছেন, সাংবাদিকদের সব কার্ড একসঙ্গে বাতিলের ঘটনার মধ্য দিয়ে জনগণ ও গণমাধ্যম ভুল বার্তা পেয়েছে, যা অনেকের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করেছে।

এর আগে গত মাসেই তিন দফায় ১৬৭ সাংবাদিকের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিলের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সম্পাদক পরিষদ। একে ‘সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিতে অন্তরায়’ বলে উল্লেখ করেছিল সংগঠনটি।

বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হক দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, রবিবার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের কাজ যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেই দাবি জানাবেন তারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত