পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা দাপ্তরিক কাজে

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৭:৪৩ এএম

খুলনা সিটি করপোরেশনে বহিরাগত শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ পান গাজী গিয়াস উদ্দিন। পরে স্মারক নম্বর দিয়ে অফিস আদেশের মাধ্যমে সম্পত্তি শাখায় ও সর্বশেষ করধার্য শাখায় ন্যস্ত করা হয়েছে তাকে। শুধুই গাজী গিয়াস উদ্দীন না; আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর করপোরেশনে দফায় দফায় নিয়োগ পেয়েছেন ৮৮ জন বহিরাগত শ্রমিক। অভিযোগ উঠেছে, অর্থের বিনিময়ে ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে বহিরাগত এসব শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়। তাছাড়া নিয়োগকৃতদের বাইরে শ্রমিক হিসেবে কাজ করার কথা থাকলেও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বেশিরভাগকে নগর ভবনে দাপ্তরিক কাজের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে অনিরাপদ হয়ে পড়েছে অফিসের গোপনীয় বিষয়সহ নথিপত্র।

করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে ৪ অক্টোবর করপোরেশনে বাজেট বরাদ্দ সাপেক্ষে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কাজে শর্ত সাপেক্ষ ৩০০ জন শ্রমিক নিয়োজিত করতে প্রশাসনিক অনুমোদন মেলে। তবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমোদনপত্রের এক নম্বর শর্তে উল্লেখ থাকে নিয়োজিত শ্রমিকদের পরিচ্ছন্ন বিভাগের কাজ ভিন্ন, অন্য কোনো কাজে নিয়োজিত করা যাবে না। সেই অনুযায়ী ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ২০৫ জন বহিরাগত শ্রমিক নিয়োগ দেয় সংস্থাটি। নিয়োজিত শ্রমিক দিয়ে সংস্থার কনজারভেন্সি বিভাগের ট্রাক শ্রমিক, মশক নিধন, সড়ক ঝাড়ু ও অফিস-বাংলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ পরিচালনা করে আসছে। তবে গত আগস্টের পর মাত্র পাঁচ মাসেই সেই অনুমোদনপত্রের শর্ত ভেঙে ৮৮ জন বহিরাগত শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অবশ্য এর মধ্যে সর্বশেষ ২৬ জন শ্রমিকের নিয়োগ স্থগিতও করা হয়েছে।

করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, বহিরাগত শ্রমিক হিসেবে ঢুকলেও পরে স্থায়ী ও ভালো পদে যাওয়ার সুযোগ আছে, এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থের মাধ্যমে করপোরেশন বহিরাগত শ্রমিক নিয়োগে হিড়িক পড়েছে। তবে বহিরাগত শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ পেলেও করপোরেশনে গুরুত্বপূর্ণ শাখার রুমে রুমে চেয়ারে বসে দাপ্তরিক কাজ করছেন। সড়ক পরিচ্ছন্নতা বা শ্রমিকের কাজে তাদের দেখা মিলছে কম।

এ প্রসঙ্গে করপোরেশনের কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি উজ্জ্বল কুমার সাহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে করপোরেশনে বহিরাগত শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এসব অর্থ হাতবদল ও ভাগবাটোয়ারা হচ্ছে। এ ছাড়া নিযোগে স্বজনপ্রীতিও হচ্ছে।

তিনি বলেন, কোনো শাখায় যদি লোক নিয়োগ খুব প্রয়োজন হয়, সে ক্ষেত্রে সেই শাখা চাহিদা জানিয়ে বলবে, এই কয়দিনের জন্য তার শাখায় এত জন লোক প্রয়োজন। তখন প্রশাসন বিবেচনা করে অনুমোদন দেবে। কিন্তু সেটি তো হচ্ছে না। নিয়োগকৃতরা সারা মাসের বেতন পাচ্ছেন। তাই প্রশাসনের স্বচ্ছতার ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।

খুলনার নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই জনবল নিয়োগ প্রচালিত আইন ও নিয়ম-কানুন এবং স্বচ্ছতার ব্যত্যয়। বহিরাগত শ্রমিকদের দাপ্তরিক কাজের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকার কথা না। কাগজে-কলমেও তারা দাপ্তরিক দায়িত্বশীল না। দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল বা গোপনীয় বিষয় থাকে। সেগুলো গায়েব বা অপ্রত্যাশিত অনেক কিছু করতে পারে, ধ্বংসাত্মক কাজও করতে পারে।

খুলনা বিভাগীয় কমিশনার ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ফিরোজ সরকার বলেন, আগে কী হয়েছে, সে ব্যাপারে বলা সম্ভব না। তবে আমি যোগদানের পর ২৬ জন বহিরাগত শ্রমিকের তালিকা আসে। যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সেই ২৬ জন স্থগিত করেছি। আমার সময়ে কোনো বহিরাগত ও মাস্টাররোল নিয়োগ হবে না। কারও বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ও প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত