শীতের পাখি যেভাবে ওড়ে

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৩:১৪ এএম

মৌসুমভেদে পরিযায়ী পাখি এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যায়। কীভাবে তারা এ দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয় তা নিয়ে হয়েছে নানা গবেষণা। লিখেছেন তরু খান

উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, পাখি পরিযান বলতে নির্দিষ্ট প্রজাতির কিছু পাখির প্রতি বছর বা কয়েক বছর পর পর একটি নির্দিষ্ট ঋতুতে বা সময়ে কম করে দুটি অঞ্চলের মধ্যে আসা-যাওয়াকে বোঝায়। জীবজন্তুর ক্ষেত্রে মাইগ্রেশনের সঠিক পরিভাষা হচ্ছে সাংবাৎসরিক পরিযান। যেসব প্রজাতির পাখি পরিযানে অংশ নেয়, তাদের পরিযায়ী বলে। এসব পাখি প্রায় প্রতিবছর পৃথিবীর কোনো এক বা একাধিক দেশ বা অঞ্চল থেকে বিশ্বের অন্য অঞ্চলে চলে যায় বিশেষ ঋতুতে। সে ঋতু শেষে সেগুলো আবার ফিরে যায় যেখান থেকে এসেছিল সেখানে। এমন আসা-যাওয়া কখনো এক বছরে সীমিত থাকে না। এ ঘটনা ঘটতে থাকে প্রতিবছর এবং কমবেশি একই সময়ে। বিবিসি জানাচ্ছে, রাশিয়া ও সাইবেরিয়া থেকে অতিথি পাখি অর্থাৎ পরিযায়ী পাখিগুলো এ অঞ্চলে আসে কিন্তু এখন এর ভিন্নমত পাওয়া যাচ্ছে। এসব পাখি নিয়ে গবেষণা করেছেন পরিযায়ী পাখি বিশেষজ্ঞ সারোয়ার আলম দীপু। তিনি বলছেন রাশিয়া ও সাইবেরিয়া থেকে এসব পাখি আসে বলে যে তথ্য প্রচলিত আছে সেটি ঠিক নয়। বরং পাখিগুলো মূলত আসে উত্তর মঙ্গোলিয়া, তিব্বতের একটি অংশ, চীনের কিছু অঞ্চল, রাশিয়া ও সাইবেরিয়ার তুন্দ্রা অঞ্চল থেকে। অর্থাৎ উত্তর মেরু, ইউরোপ ও এশিয়ার কিছু এলাকা ও হিমালয় পর্বতমালার আশপাশের এলাকা থেকেই পাখিগুলো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ভারত ও বাংলাদেশে আসে যেখানে তুলনামূলক কম ঠাণ্ডা পড়ে ও খাবার পাওয়া যায়। আবার মার্চের শেষ দিকে যখন এ অঞ্চলে গরম পড়তে শুরু করে ও শীতপ্রধান এলাকায় বরফ গলা শুরু হয় তখন আবার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পাখিগুলো নিজ এলাকায় ফেরত চলে যায়। বাংলাদেশে ১৯৯৪ সালে অতিথি পাখি এসেছিল ৮ লাখের বেশি। ২০১৪ সালে এ সংখ্যা নেমে এসেছে দুই লাখের নিচে। অর্থাৎ গত ২০ বছরে প্রায় ছয় লাখ পাখি আসা কমে গেছে। তবে এখন এ সংখ্যা সাড়ে তিন লাখের মতো বলে বলছেন গবেষকরা।

প্রস্তুতি

তবে সবসময় যে অতি শীত থেকে কম শীতের দিকে পাখি উড়াল দেয় তা না। অনেক সময় কম শীত থেকে বেশি শীতের দিকেও অনেকে উড়াল দেয়। নিউ ইয়র্ক টাইমসে বিজ্ঞানবিষয়ক প্রতিবেদক এমিলি এনথেস লিখেছেন, শরৎকাল থেকে শীতকালীন জলবায়ুতে পৌঁছানোর জন্য অনেক পাখিকে শত শত বা হাজার হাজার মাইল উড়তে হয়। যার জন্য প্রচুর পরিমাণে শক্তি ব্যয় করতে হয় এবং ঝড়, আকাশচুম্বী ভবন এবং অন্যান্য সম্ভাব্য হুমকি সফলভাবে এড়াতে হয়। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘকাল ধরে ভেবে আসছিলেন, পরিযায়ী পাখিরা শীতের এলাকায় পৌঁছে গেলেও যথেষ্ট পরিমাণ শক্তি তাদের শরীরে সঞ্চিত থাকে, যা তাদের উষ্ণ রাখে। নেচার ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশনে প্রকাশিত এই গবেষণায় আরও জানা গেছে, অভিবাসনে ইচ্ছুক পাখি তাদের যাত্রার জন্য বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। রাতে তারা খুব ধীরে ওড়ে যেন খাবার হজম ধীরে হয় এবং শক্তি সঞ্চিত থাকে। গবেষকরা বলছেন, তাদের ফলাফলে অনেক চমক ছিল। গবেষকরা জানাচ্ছেন, সাধারণ ব্ল্যাকবার্ড গ্রীষ্মকাল দক্ষিণ জার্মানির বনে কাটায়। বেশিরভাগ পাখি শীতের জন্য সেখানেই অপেক্ষায় থাকে। তবে তাদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ অক্টোবর এবং নভেম্বরে দক্ষিণে উড়ে যায়। এই অভিবাসীরা শীতকাল দক্ষিণ ইউরোপ বা উত্তর আফ্রিকায় কাটায়। এপ্রিলের প্রথম দিকে তারা আবার জার্মানিতে ফিরে আসে।

বাংলাদেশে

কয়েক বছর আগে গবেষক দিলীপ দাস বিসর্গ ডয়চে ভেলেতে এক লেখায় জানান, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলকে তিনভাগে ভাগ করা যায় দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল। পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে পড়েছে সুন্দরবন, পূর্বে কক্সবাজার, আর দক্ষিণে আছে নিঝুম দ্বীপ। শীতকালে, বিশেষত অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত আমাদের উপকূলে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখির আনাগোনা থাকে। উপকূলের উর্বর কাদাচরের প্রাণীরা এদের প্রধানতম খাবার। জোয়ারে সমস্ত কাদাচর পানিতে ডুবে গেলে জেগে থাকা বালুচর, ঘাস ও বনে এরা আশ্রয় ও বিশ্রাম নেয়। ভাটায় যখন পানি নেমে যায় আর কাদাচর উন্মুক্ত হয়ে পড়ে, তখন এরা খাবার সংগ্রহে ব্যস্ত হয়। পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার সংগ্রহের বিষয়টি এদের জীবন সংগ্রামের অংশ এবং বেঁচে থাকার জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। হাজার মাইল উড়াল দিয়ে পরিযায়ী পাখি বাংলাদেশের উপকূলে আসে, তারপর আবার প্রজনন ক্ষেত্রে ফিরে যায়। আর এই উড়ালের শক্তি জোগায় শরীরের চর্বি। তাই উড়ালের আগে এদের পর্যাপ্ত পরিমাণ চর্বি জমাতে হয়। তিনি জানাচ্ছেন, বছর জুড়ে বাংলাদেশে ২৩৪ প্রজাতির পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে। এদের মধ্যে ২০৮ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি শীতকালে ও ১২ প্রজাতির গ্রীষ্মকালে দেখা মেলে। এছাড়া আরও ১৪ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি তাদের গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন আবাসস্থলে আসা-যাওয়ার পথে বাংলাদেশকে স্বল্প সময়ের জন্য ব্যবহার করে।

সঙ্গী

পাঁচটি মাইগ্রেশন সাইট থেকে সংগৃহীত অর্ধ মিলিয়নেরও বেশি রেকর্ড ব্যবহার করে, বিজ্ঞানীরা জেনেছেন যে, বিভিন্ন প্রজাতির পাখিরা স্থানান্তরের সময় বন্ধুত্ব পাতায়। গবেষকরা বলছেন, পাখির এ স্থানান্তর অধ্যয়ন করার জন্য তারা প্রায়ই জালে পাখি ধরেন এবং সংখ্যাযুক্ত লেগ ব্যান্ড দিয়ে চিহ্নিত করেন তাদের। এভাবে পরিচালিত কিছু গবেষণায় পাখিদের সামাজিক সংযোগের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গবেষক জোইলি ডিসিমোন বলেন, চিন্তা করুন লাখ লাখ পাখি একটানা উড়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তারা এমন আবাসস্থলে পৌঁছায়, যা তারা আগে কখনো দেখেনি। তখন তারা থাকে ক্ষুধার্ত এবং তাদের শক্তির দরকার হয়, তাদের শরীরে চর্বির সঞ্চয় ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন হয়। তখন এক পাখি অন্য পাখিকে প্রতিযোগী হিসেবে ভাবাই স্বভাবিক। তবে এটাও দেখা গেছে যে, তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠছে। ডিসিমোন বলেছেন, দ্রুত খাবার খুঁজে বের করতে অন্যান্য পাখির উপস্থিতি নতুনদের কাছে সংকেত দেয় যে, এ আবাসস্থলটি ভালো। কানাডার পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীববিজ্ঞানী জ্যানেট এনজি বলেন, এখানে প্রচুর গবেষণায় দেখা গেছে, পাখিদের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। এনজি এবং তার কিছু সহকর্মী আগস্ট মাসে ম্যাসাচুসেটসের একটি সৈকতে এক জোড়া সেমিপালমেটেড স্যান্ডপাইপারকে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। সেমিপালমেটেড স্যান্ডপাইপার আর্কটিক থেকে দক্ষিণ আমেরিকা পর্যন্ত অভিবাসনের জন্য প্রতি বছর হাজার হাজার মাইল ভ্রমণ করে। এনজি বলেন, যা মন ছুঁয়ে গিয়েছিল তা হলো এই বিশেষ জুটির পায়ের ট্যাগগুলো। যা জানান দিচ্ছিল যে দুই বছর আগে কানাডার নিউ ব্রান্সউইকে তাদের পায়ে এ ব্যান্ড পরানো হয়েছিল। দুবছর পর দেখা গেল, এ পাখিরা আবার একসঙ্গে।

জলবায়ু পরিবর্তন

গবেষকরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন পাখিদের অভিবাসনের ক্ষেত্রে সংকট তৈরি করছে। বসন্তের আগমনে হেরফের ঘটছে। কখনো তা তাড়াতাড়ি আসছে, আবার দেরিতেও আসছে। গবেষকরা বলছেন, কয়েক দশক ধরে অধ্যয়ন করা ডেটা দেখায় যে, উষ্ণ তাপমাত্রা আগে আসছে। ওকলাহোমা রাজ্যের প্রাকৃতিক সম্পদ বাস্তুবিদ্যা ও ব্যবস্থাপনার অধ্যাপক এবং রবার্টসনের চার সহ-লেখকের একজন স্কট লস বলেছেন, এ বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অংশে বিশেষ করে পূর্বার্ধে, বসন্তের তাপমাত্রা গড় সময় থেকে ১০-১৫ দিন আগে দেখা গেছে। কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটির সহ-লেখক কাইল হর্টন বলেছেন, পাখিরা এই পরিবর্তনগুলোতে সাড়া দিচ্ছে।

এ বছরের শুরুর দিকে জাতিসংঘের কনভেনশন অন দ্য কনজারভেশন অব মাইগ্রেটরি স্পিসিস অব ওয়াইল্ড অ্যানিমেল দ্বারা প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক রিপোর্টে জলবায়ু পরিবর্তনকে পাখিদের জন্য শীর্ষ তিনটি হুমকির একটি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। শুধু পরিযায়ী পাখি নয়, বিশ্ব জুড়েই কমছে এর সংখ্যা। কয়েক বছর আগে  যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার আট বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী ও গবেষকরা দেখেছেন, প্রাকৃতিক আবাসস্থল কমে যাওয়ায় বা আবাসস্থল বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ায় পাখি কমে আসছে। পাখি কমে আসার নতুন কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে দেখা হচ্ছে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী ৪ হাজার ২৯৫ বা ২৯ শতাংশ প্রজাতির পাখির সংখ্যা অপরিবর্তিত দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ তাদের সংখ্যা বাড়ছে না বা কমছে না। অন্যদিকে ৬৭৬ প্রজাতির বা ৬ শতাংশ প্রজাতির পাখির সংখ্যা বাড়ছে। বাকি প্রজাতির পাখির সংখ্যা বাড়ছে নাকি কমছে, তা গবেষকরা অনুসন্ধান করেও বুঝতে পারেননি। ভারতীয় গবেষক ড. দেবাশিস ব্যানার্জি জানাচ্ছেন, জলাশয় সংস্কারের নামে যেভাবে পাখিদের থাকার জায়গা নষ্ট করে দেওয়া হয় শহরে ও গ্রামে, তাতে পরিযায়ী পাখিদের আবাসস্থল চেনার যে স্বাভাবিক ক্ষমতা, তাতে নষ্ট হয়ে যায়। মোবাইল টাওয়ারের বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ আর উপগ্রহ দূর-সঞ্চার ব্যবস্থার কারণে শুধু পরিযায়ী পাখি নয়, প্রতিদিন যে পাখিগুলোকে এক সময় দেখতে পাওয়া যেত, সেই শালিক, চড়ুইয়ের সংখ্যাও ক্রমশ কমে আসছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত