বাদাম চাষি থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট, পেয়েছেন শান্তিতে নোবেল

  • মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘজীবী প্রেসিডেন্ট তিনি
  • চলতি বছরের অক্টোবরেই ১০০তম জন্মদিন উদযাপন করেছেন 
  • পরিবারের বাদাম চাষাবাদের ব্যবসা দেখভাল করতেন
  • ১৯৭৬ সালে ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান
আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪, ১২:৩৫ পিএম

১০০ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার। স্থানীয় সময় গতকাল রোববার বিকেলে জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের প্লেইনসে নিজ বাড়িতে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

জর্জিয়ার একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জিমি কার্টার। মার্কিন জনগণের কাছে কখনও মিথ্যা না বলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন তিনি। ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দেশটির ৩৯তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন জিমি কার্টার।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে জিমি কার্টারের দায়িত্ব পালন সুখকর ছিল না। অর্থনৈতিক দুরাবস্তা ও কূটনৈতিক সংকটের মধ্যেই তাঁকে কাজ করতে হয়েছিল। আর এই সংকট সামলাতে না পেরে এক মেয়াদের বেশি ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেননি তিনি।

হোয়াইট হাউজ ছাড়ার পর তিনি নিজের হারানো জনপ্রিয়তা ফিরে পেতে কাজ শুরু করেন। পরে শান্তি, পরিবেশ এবং মানবিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে নিজের সুনাম পুনরুদ্ধার করেন তিনি। যার স্বীকৃতি পান শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের মাধ্যমে।

মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘজীবী প্রেসিডেন্ট তিনি। চলতি বছরের অক্টোবরেই ১০০তম জন্মদিন উদযাপন করেছেন তিনি। তবে ক্যানসারের সাথে লড়াই করতে ধীর্ঘ সময় হাসপাতালে কাটাতে হয়েছে তাকে।  

বাদাম চাষি থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট

১৯২৪ সালের ১ অক্টোবর জর্জিয়ার প্লেইনসে জন্মগ্রহণ করেন জেমস আর্ল কার্টার জুনিয়র। শৈশবে তাকে জিম্মি নামে ডাকা হলেও পরে জিমি কার্টার হিসেবেই পরিচিতি পান। তার বাবা ছিলেন একজন চিনাবাদাম কৃষক ও দোকাদার এবং মা লিলিয়ান ছিলেন একজন নিবন্ধিত নার্স। তাদের চার সন্তানের একজন ছিলেন জিমি।

হাইস্কুলে তারকা বাস্কেটবল খেলোয়াড় ছিলেন জিমি। যুক্তরাষ্ট্রের নেভাল একাডেমি থেকে ১৯৪৬ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন জিমি কার্টার। আস্ত বছর কাজ করেছেন মার্কিন নৌবাহিনীতেও। সে সময় পারমাণবিক সাবমেরিন কর্মসূচিতে অফিসার হিসেবে কাজ করেন।

তবে ১৯৫৩ সালে পিতার মৃত্যুর পর সাবমেরিনের চাকরি ছেড়ে পরিবারের বাদাম চাষাবাদের ব্যবসা দেখভালের দায়িত্ব নেন। তবে খরার কারণে প্রথম বছরে কৃষক হিসেবে ব্যর্থ হলেও কার্টার ব্যবসার দিকে ঘুরে দাঁড়ান এবং এক পর্যায়ে নিজেকে কোটিপতি করে তোলেন।

১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জর্জিয়ার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জিমি কার্টার। ১৯৭৬ সালে ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান। ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডকে হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৯তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

কিশোর বয়স থেকেই সাউদার্ন ব্যাপ্টিস্ট সানডে স্কুলের শিক্ষক ছিলেন জিমি কার্টার। প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনেও শক্তিশালী নৈতিকতার চেতনা নিয়ে আসেন তিনি। কোনো রাখঢাক ছাড়াই নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয়টি প্রকাশ করতেন জিমি কার্টার।

দীর্ঘ দাম্পত্য জীবন

১৯৪৬ সালে মার্কিন নৌবাহিনীতে কাজ করার সময় বোনের বন্ধু রোজালিন স্মিথের সাথে প্রনয় এবং বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন জিমি কার্টার। এই দম্পতির চার সন্তান। রোসালিনের সঙ্গে জিমি কার্টারের দাম্পত্য জীবন ছিল দীর্ঘ ৭৭ বছরের। 

গত বছরের নভেম্বরে ৯৬ বছর বয়সে মারা যান রোসালিন। তাঁদের সংসারে ৪ সন্তান, ১১ নাতি-নাতনি এবং ১৪ জন প্রপৌত্র ও প্রপৌত্রী রয়েছে।

জিমি কার্টার কয়েক বছর ধরে ত্বকের ক্যানসার মেলানোমাসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। তার যকৃৎ ও মস্তিষ্কেও ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ে। গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে বাকি জীবন কাটিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর থেকে নিজ বাসভবনে নিবিড় সেবাযত্নে ছিলেন সাবেক এই প্রেসিডেন্ট।

গত ১ অক্টোবরে জিমি কার্টার তার ১০০তম জন্মদিন উদ্‌যাপন করেন।

মানবিক কাজে পুনরায় সুনাম অর্জন

১৯৭৭-এর জানুয়ারি থেকে ১৯৮১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পদে দায়িত্ব পালন করেন জিমি কার্টার। তবে অর্থনৈতিক দুরাবস্থা ও রাজনৈতিক সংকটের কারণে ১৯৮০ সালে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী রোনাল্ড রিগ্যানের কাছে পরাজিত হয়ে হোয়াইট হাউস ছাড়েন তিনি।

জিমি কার্টার প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় থাকাকালে যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক দুর্দশা চলছিল। তার শাসনকালেই ইরানে মার্কিন দূতাবাসে যুক্তরাষ্ট্রের ৫২ জন কূটনীতিক ও নাগরিককে জিম্মি করা হয়েছিল। তিনি ক্ষমতা ছাড়ার পর এই জিম্মিদশার অবসান হয়। অবশ্য ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে কার্টারের ভূমিকা ছিল। এর মধ্য দিয়ে মিসর ও ইসরায়েলের মধ্যে শান্তিচুক্তি সম্ভব হয়।

হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর দশকের পর দশক ধরে বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন জিমি কার্টার। এর মধ্যে রয়েছে মানবাধিকার রক্ষা, দেশে দেশে দারিদ্র্য হ্রাসে কর্মসূচিও। আন্তর্জাতিক সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে পেতে নিরলস প্রচেষ্টা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতিসাধন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখার স্বীকৃতি হিসেবে ২০০২ সালে তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়।

জিমি কার্টারের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে চিপ কার্টার এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আমার বাবা একজন নায়ক ছিলেন। শুধু আমার কাছেই নন, যাঁরা শান্তি, মানবাধিকার ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় বিশ্বাস করেন, এমন সবার কাছেই।’

প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের স্মৃতিকথা থেকে শুরু করে শিশুসাহিত্য— দুই ডজনেরও বেশি বই লিখেছেন জিমি কার্টার। ধর্মীয় বিশ্বাস ও কূটনীতি নিয়েও তিনি লেখালেখি করেছেন। ২০১৮ সালে তাঁর ‘ফেইথ: আ জার্নি ফর অল’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়।

সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত