বাংলা আমার বাংলা আমার

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২৫, ০৩:৩১ এএম

খ্রিস্টীয় বছরের প্রথম দিন। কলেজ বন্ধ। হাড় কাঁপানো শীতের সকাল। শহরের একটু বাইরে ফাঁকা থাকে। সেখানে মনে হয়, শীত বেশি লাগে। লোকটি মাফলার পেঁচিয়ে, চাদর পরে সাতসকালে এলেন চা খেতে। পানির বাষ্প বের হচ্ছে কেটলির মুখ থেকে। কখনো কেটলি থেকে উপচে পড়ছে চাপাতাসহ পানি। একটু জোরেই বললেন কী সবুর মিয়া, দিনকাল কেমন? সবুর মিয়া মুচকি হাসেন। বললেন আতিক স্যার, আফনেই জানেন। অনেক পড়াশোনা করা প-িত মানুষ। মাইনষেরে পড়ান। সবাই ‘পন্ডিত স্যার’ কয়। আফনারে কমু আমি? স্যার, হ্যাপি নিউ ইয়ার! আতিক স্যার একটু অবাক হলেন। সবুর মিয়া বললেন স্যার, এই কাগজটা পড়েন আর নতুন বিস্কিট আনছি। চা দিয়া খান। মজা লাগব। সবুর মিয়া একটি লিফলেট এগিয়ে দিলেন। সেখানে অনেক কথা লেখা। সেখানে বড় হরফে লেখা রয়েছে ‘যে জন বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সে জন কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’। হাল্কা স্বরে তিনি বললেন লাভ আর কী হলো! এরপর তার চোখ পড়ল, আরেকটি বাক্যে। সেটিও শেষে বড় হরফে লেখা। বাক্যটি হচ্ছে ‘জোর, জবরদস্তি করে ফায়দা হয় না।’

তিনি কষ্টভরা মুচকি হাসলেন। ভাবলেন আমরা বলতে, লিখতে সত্যিকার অর্থে কী ধরনের ‘বাংলা’ শব্দ ব্যবহার করি! সেগুলো কি আসলেই ‘বাংলা’! তিনি ভাবছেন এই যে আমি ‘চা’ খাচ্ছি বিস্কিট দিয়ে এখানে কয়টা শব্দ বাংলা? ‘চা’ হচ্ছে চীনা শব্দ। ‘বিস্কিট’ হচ্ছে ইংরেজি শব্দ। একটু আগে সবুর মিয়া যা বললেন সেখানেও তো বিদেশি শব্দ। আর ‘সবুর’ নামটাই তো আরবি। আবার ‘জোর’ শব্দটি হচ্ছে ফার্সি, জবরদস্তিও তাই। আর ‘ফায়দা’ হচ্ছে আরবি শব্দ। তার মাথা ভনভন করতে থাকল। আবার ভাবলেন এই যে আমি সাতসকালে স্যান্ডেল পায়ে এলাম, এটাই বা কোনো ভাষার শব্দ? মনে মনে বললেন এই ‘স্যান্ডেল’ শব্দটা অনেকে ইংরেজি মনে করেন। আসলে এটা ল্যাটিন। আবার ল্যাটিন ভাষা শব্দটা ধার করেছে, গ্রিক ভাষা থেকে। তার মাথা আরও ঘুরতে থাকল। তিনি উঠলেন। সবুর মিয়াকে বললেন লেইখা রাখো। দাম পড়ে দিমু। এই ‘দাম’ আবার গ্রিক শব্দ। তিনি এবার ঘামছেন। পন্ডিত স্যার উচ্চকণ্ঠে বললেন, তাইলে আমাদের বাংলা শব্দ কই? সবুর মিয়া অবাক হলেন। বললেন, কী হইছে? স্যার, তাড়াতাড়ি বাড়ি যান। তুফান আসতেছে। স্যার বললেন ধুর মিয়া, আবার আরবি শব্দ বলল। সবুর মিয়া কিছু বুঝলেন না। তিনি ‘হা’ করে তাকিয়ে থাকলেন।

তিনি হাঁটতে থাকলেন। বৃষ্টিতে ভিজে শার্ট শরীরের সঙ্গে লেপ্টে গেছে। তিনি শার্টের দিকে তাকালেন। কী যেন ভাবলেন। মনে মনে বললেন শার্ট ভিজে গেল। আবার না জ¦র আসে? পরক্ষণেই মনে হলো ভীষণ মুশকিল এখানেও তো বিদেশি শব্দ। ‘শার্র্ট’ হচ্ছে ইংরেজি। আবার ‘মুশকিল’ হচ্ছে আরবি শব্দ। কিন্তু ‘ভীষণ’ বিশেষণ নিয়ে ভেজা শরীরেই তিনি ভাবছেন। নিশ্চিত নন। এটা কি প্রকৃত বাংলা শব্দ? কিন্তু ‘ইংরেজি’ শব্দটিই তো পর্তুগিজ থেকে নেওয়া! তার শরীর এবার আরও দুর্বল লাগছে। হাঁটতে হাঁটতে লক্ষ করলেন বাড়ি দেখা যাচ্ছে। একটু দূর থেকে ছেলেকে ডাকলেন। বললেন ছাতা নিয়ে আয়। ছেলে অবাক হলো। ভাবল, ভেজা শরীরে আব্বু ছাতা দিয়ে কী করবেন? এবার পন্ডিত প্রায় মূর্র্ছা যাবেন। ভাবলেন আর উপায় নেই। এই ‘ছাতা’ শব্দ এসেছে সংস্কৃত থেকে। তাহলে আমাদের বাংলা ভাষা কোথায়? আমরা কি একটি বাক্যও শতভাগ বাংলা শব্দে লিখতে পারব না? ঠিক তখনই আরবি, ফার্সি ও উর্দু পন্ডিত আবদুল হাকিমের কথা মনে পড়ল তার। মনে হলো ‘নূরনামা’ কাব্যের কথা। যিনি অনেক ফার্সি কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেছেন। তিনিই তো লিখেছেন ‘যে জন বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সে জন কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি/ দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়/ নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়।/  মাতা পিতামহ ক্রমে বঙ্গেত বসতি/ দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি।’ অতঃপর পন্ডিত স্যার ভাবলেন এই কবিতায় তো অনেক বিদেশি ভাষার শব্দ রয়েছে। তাহলে! কোথায়, আমার বাংলা ভাষা কোথায়?

না, তিনি আর ভাবতে পারলেন না। এবার সম্ভবত সেন্সলেস হবেনই। তার মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে। শরীর কাঁপছে। দৌড়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরল ছেলে। চিৎকার করে বিদেশ থেকে আসা বড় ভাইবোনকে ডাকল। এবার বৃষ্টির জোর বেড়েছে। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। পন্ডিতের সেন্স এসেছে। তিনি মৃদুকণ্ঠে ছেলেমেয়েদের উদ্দেশে বললেন তবু তোরা বাংলা ভাষাতেই কথা বলবি। এর মধ্যে বিদেশি যে সমস্ত ভাষা এসেছে তা ঠিক না হলেও ঠিক। এখন এসব নিপাতনে সিদ্ধ। আমরা শুনতে-বলতে-লিখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। নিজের বলে গ্রহণ করেছি। ভালোবেসে ফেলেছি। তোরা যেমন আমার আত্মা (দুজনই পালিত সন্তান)। ছেলেমেয়ে একজন আরেকজনের দিকে তাকাল। বাবার কথার মাথা-মুন্ডু কিছুই বুঝল না। তারা বাবাকে কোলে করে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলেন।

শরীর মুছিয়ে কাপড় পরিবর্তন করিয়ে মেয়ে বাবাকে বলল বাবা, আপনি কী বলছিলেন তখন? বাবা বললেন কখন? ও, ওইটা! তিনি মুচকি হাসলেন। শুধু বললেন সময়ে অনেক কিছুই ‘আমার’ হয়ে যায়। সেই বিষয়ে কোনো প্রশ্ন না তোলাই ভালো। আত্মার সঙ্গে যেসব বিষয় মিশে যায়, সেগুলো নিয়ে বিতর্ক করতে নেই। শুধু সতর্ক থাকতে হয়, নিজেকে না হারিয়ে ফেলি। এবারও মেয়ে কিছুই বুঝল না। বোকার মতো তাকিয়ে থাকল বাবার মুখের দিকে। বিড়বিড় করে আতিক সাহেব শুধু বললেন বাংলা আমার, বাংলা আমার। 

লেখক : সাংবাদিক

[email protected]  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত