নিরাপত্তা জোরদারে বারবার সতর্কতার পরও খ্রিস্টীয় বর্ষবরণ উদযাপন হয়েছে অনেকটা অরাজকতায়। ঘটেছে মৃত্যুর মতো ঘটনাও। গত মঙ্গলবার শেষ রাতে ফানুস ওড়ানো, আতশবাজি ও পটকা ফোটানোতে ছিল নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু জাতীয় জরুরি সেবায় অভিযোগ পড়েছে সহস্রাধিক।
উদযাপনের সময় ফানুসের আগুন থেকে অগ্নিকাণ্ডে ঢাকায় তিন শিশুসহ পাঁচজন দগ্ধ হয়েছে। নাটোরের বড়াইগ্রামে উদযাপন করতে গিয়ে তিনতলার ছাদ থেকে পড়ে প্রাণ হারিয়েছে এক স্কুলছাত্র। তার নাম ইসতিয়াক হোসেন (১৬)। উৎসবের রাত পরিণত হয় শোকে। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা বাবা ইকবাল হোসেন বাবু। বনপাড়া সেন্ট যোসেফস স্কুল অ্যান্ড কলেজের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল ইসতিয়াক।
বাবা ইকবাল হোসেন বাবু বলেন, ‘ইসতিয়াক এক ছাদ থেকে পাশের ছাদে যাওয়ার জন্য লাফ দিলে পা পিছলে নিচে পড়ে যায়।’
মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার পরই শুরু হয় নগরীর সড়কগুলোয় নিয়ন্ত্রিত যান চলাচল। হাতিরঝিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, গুলশান, বনানী ও বারিধারার মতো অভিজাত এলাকাগুলোর বাসিন্দা বাদে সর্বসাধারণের চলাচলও নিরুৎসাহিত করা হয়। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় নগরীর সড়ক ও নির্ধারিত স্থানগুলো স্বাভাবিক থাকলেও বাড়ির ছাদগুলোয় হয় বেপরোয়া উদযাপন। ফলে মাটিতে জোরদার শৃঙ্খলা থাকলেও, বিশৃঙ্খল ছিল আকাশ। অসহনীয় শব্দদূষণ ও অগ্নিকাণ্ডের মতো ভয়ানক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয় নগরবাসীকে।
আতশবাজির বিকট শব্দে আট বছর বয়সী এক বাচ্চা ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থার হৃদয়বিদারক বর্ণনা দিয়েছেন ইউসুফ রায়হান নামে এক বাবা। রাজধানীর মোহাম্মপুর এলাকার এই বাসিন্দা মঙ্গলবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট করেছেন। তাতে লেখেন, ‘বড় ছেলেটাকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে আছি। আর বাইরে চলছে দানবীয় উল্লাস!...’ এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান তার। সেই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতেও জোর দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
দেশ রূপান্তরকে তিনি আরও বলেন, ‘থার্টিফার্স্টের রাতে প্রতিবছরই আতশবাজি ও ফানুস আর উচ্চ শব্দযন্ত্রের কারণে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়। এটা কোনোভাবেই নির্মূল করা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শুধু বলে নিরাপত্তার চাদরে ঠেকে দেওয়া হয়েছে নগরী। তাতে তো কোনো লাভ হয় না। তাদের আরও কঠোর হতে হবে। এ ধরনের কাজে যারা লিপ্ত, তাদের শাস্তি দিতে হবে। তাদের এমন একটা ব্যবস্থা করতে হবে, যেন এটা একেবারে নির্মূল করা যায় কিংবা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। সেই সঙ্গে অবশ্যই জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।’
২০২২ সালে ইউসুফ রায়হানের ছোট আরও এক সন্তান থার্টিফার্স্টের রাতে আতশবাজির শব্দ সইতে না পেরে কাঁপতে কাঁপতে প্রাণ হারায়। সেই থেকেই এ ব্যাপারে তিনি আইনি ও সামাজিকভাবে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। তার ভাষ্যমতে, এতে খুব বেশি একটা লাভ হয়নি।
যদিও উদযাপন নির্বিঘœ আর সাবলীল করতে পুলিশ সদর দপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তরও সারা দেশে বেশ তৎপর ছিল। নগরীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিয়োজিত ছিল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত তিন হাজার সদস্য। গত মঙ্গলবার সকালে ডিএমপি অর্ডিন্যান্স নং-ওওও/৭৬-এর ২৮ ও ২৯ ধারা অনুযায়ী একগুচ্ছ নির্দেশনা জানিয়ে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে।
এসব নির্দেশনা অমান্য করা আইনত দ-নীয় অপরাধ বলে জানালেন ডিএমপি মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গণবিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া নির্দেশনা অমান্য করা আইনত দ-নীয় অপরাধ। যেসব নির্দেশনা আমরা দিয়েছিলাম, সেগুলো না মানার কারণে বিস্ফোরক আইন ও গণ-উপদ্রব সৃষ্টির অপরাধে শাস্তি দেওয়া যায়।’
মঙ্গলবার রাতে বেপরোয়া আতশবাজি, ফানুস ও উচ্চ শব্দযন্ত্রে গান বাজানোর ঘটনায় বিস্ফোরক আইন বা গণ-উপদ্রব সৃষ্টির জন্য কাউকে আইনের আওতায় আনা হয়েছি কি না এমনটা জানতে চাইলে তিনি সুনির্দিষ্ট করে উত্তর দিতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘গতরাতে আমাদের ১৫০টি অভিযান (নিয়মিত) পরিচালিত হয়েছে। সেখানে বেশ কিছু মামলা হয়েছে। আমাদের মূল লক্ষ ছিল কোনো দুর্ঘটনা যেন না ঘটে। আসলে মানুষের বাসার ছাদগুলো তো আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। এসব কমানোর জন্য বা সহনীয় মাত্রায় আনার জন্য গণসচেতনতাই একমাত্র পথ।’
তিন শিশুসহ দগ্ধ ৫ : আতশবাজি পোড়ানো ও ফানুস ওড়াতে গিয়ে রাজধানীর কয়েক জায়গা থেকে তিন শিশুসহ পাঁচজন দগ্ধ হয়েছে। তারা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিয়েছে। দগ্ধরা হলো তাফসির (৩), ফারহান (৮), সিফান মল্লিক (১২), সম্রাট (২০) ও সেন্টু (৪৫)। তাদের মধ্যে ফারহানের শরীরের ১৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। এ ছাড়া বাকি চারজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান বলেন, ‘মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গা থেকে শিশুসহ এই পাঁচজন দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে এসেছিল। তাদের মধ্যে এক শিশুকে ভর্তি দেওয়া হয়েছে। বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।’
মিরপুর-ধানমন্ডিতে অগ্নিকাণ্ড : ফানুস ও আতশবাজির আগুনে রাজধানীর মিরপুর ও ধানমন্ডি ল্যাবএইডের পেছনে আগুনের সংবাদ পেয়েছে ফায়ার সার্ভিস। মিরপুরে ডাস্টবিনের ময়লায় ও ধানম-িতে একটি দোকানে অগ্নিকাণ্ডের এ ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মিরপুরে ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। অন্যদিকে ধানমন্ডিতে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যাচ্ছে। গতকাল সকালে ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ডিউটি অফিসার রাফি আল ফারুক বিষয়টি জানান।
মেট্রোরেলের তারে ফানুস : ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে মেট্রোরেলের লাইন ও এর আশপাশের এলাকায় ফানুস না ওড়ানোর অনুরোধ করা হয়েছিল। তবে আটকানো যায়নি। এবারও মেট্রোরেলের বৈদ্যুতিক লাইনের ওপর একাধিক ফানুস এসে পড়েছে। তবে মেট্রোরেল চালু করার আগেই তা অপসারণ করা হয়েছে। তাই প্রথম শিডিউল থেকে স্বাভাবিকভাবেই চলেছে মেট্রোরেল।
মধ্যরাতে হোটেল ওয়েস্টিন ও রিজেন্সিতে অভিযান : থার্টিফার্স্ট নাইটে ঢাকার অভিজাত এলাকাসহ দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান চালিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। ঢাকা মহানগরীতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আটটি টিম অভিজাত এলাকায় বিশেষ অভিযান চালায়। এ সময় হোটেল ওয়েস্টিনে ১৩৬ বোতল বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিদেশি মদ, ৩২৬ ক্যান বিয়ার, হোটেল রেনেসাঁয় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিদেশি ৩২ বোতল মদ, হোটেল রিজেন্সিতে ৯১ বোতল মদ ও ৩৬৭ ক্যান বিয়ার এবং ঢাকার শেরাটন, বনানী থেকে ছয় বোতল বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া উত্তরার কিং ফিশার রেস্টুরেন্টে অভিযান চালিয়ে ৬৭ বোতল বিদেশি মদ এবং ১৬ ক্যান বিয়ার উদ্ধার করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে।
শব্দদূষণের ‘৯৯৯’ হাজারের বেশি কল : গতকাল জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এর গণমাধ্যম ও জনসংযোগ কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক আনোয়ার সাত্তার বলেন, ইংরেজি বর্ষবরণের প্রাক্কালে উচ্চ শব্দে গান-বাজনা, হইহুল্লোড়, আতশবাজি ইত্যাদি শব্দদূষণ প্রতিকারে ৯৯৯ নম্বরে ১ হাজার ১৮৫টি কল গৃহীত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর থেকে ৩৮৭টি কল এবং দেশের অন্যান্য স্থান থেকে ৭৯৮টি কল গৃহীত হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে ‘জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯’-এর পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট থানা-পুলিশকে বিষয়টি জানিয়ে প্রতিকারের চেষ্টা করা হয়।
ইংরেজি নববর্ষ উদযাপনকে কেন্দ্র করে আতশবাজি পোড়ানো ও ফানুস ওড়ানোর কারণে রাজধানী ঢাকায় গত সাত বছরে আগের দিনের (৩১ ডিসেম্বর) তুলনায় পরদিন (১ জানুয়ারি) বায়ুদূষণ বাড়ে গড়ে ১৯ শতাংশ।
অন্যদিকে গত সাত বছরে একই কারণে এক দিনের ব্যবধানে শব্দদূষণ বাড়ে গড়ে ৭৪ শতাংশ। শব্দদূষণের ক্ষেত্রে ৩০ ডিসেম্বরের (রাত ১১টা থেকে ১টা) সঙ্গে পরদিন ৩১ ডিসেম্বরের (রাত ১১টা থেকে ১টা) তুলনা করে এক গবেষণায় পাওয়া এসব তথ্য তুলে ধরেছে বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়নকেন্দ্র (ক্যাপস)।
