গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পর দেশের মানুষ একটি টেকসই, অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিকব্যবস্থা দেখতে চায়। চায় এমন ব্যবস্থা, যেখানে কোনো দল বা দলীয় প্রধান স্বৈরাচারী হয়ে উঠবেন না। যেখানে জনগণের দেওয়া রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভাগাভাগি থাকবে। কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করলে অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রিত হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ তৈরি হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার সংস্কার। এ জন্য বেশ কয়েকটি কমিশন গঠন করা হয়েছে। সংবিধান সংস্কারের দাবি দিন-দিন প্রবল হয়ে উঠেছে। সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনের প্রস্তাব এ মুহূর্তে একটি নতুন দিক বা অভিমুখ উন্মোচন করেছে।
আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) হচ্ছে সেন্ট্রাল রিপ্রেজেন্টেশন বা কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিত্ব। এই ব্যবস্থায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এমনভাবে তৈরি হতে হবে, যারা নাগরিকদের স্থানীয় চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। এটা ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদ শক্তিশালী করে হবে না বরং এমন স্থানীয় সরকার লাগবে, যারা তার বাজেট নিজে তৈরি করতে পারবে। যাদের কর বা রাজস্ব কাঠামো আছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসের মতো রাষ্ট্রের সব ধরনের নাগরিক সেবা স্বাধীনভাবে দেবে এবং সেবা ব্যবস্থাপনার জন্য দায়বদ্ধ থাকবে। কেন্দ্র থেকে শুধু সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করবে এবং রেগুলেটরি গাইডলাইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে কাঠামো সহজতর করবে। বাংলাদেশে আসলে সেই অর্থে কোনো স্থানীয় সরকার নেই। দেশের সংসদীয় নির্বাচনী আসনের ভোটাররা এমপিকে রাষ্ট্রের আইন করার জন্য ভোট দেন না, মূলত ভোট দেন তাদের সেবা করার জন্য। স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবন, অর্থনীতি, বিভিন্ন অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তার সমস্যা মোকাবিলায় সক্ষম স্থানীয় সরকার গড়তে পারলেই তখন কেন্দ্রের জন্য সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নির্বাচন প্রাসঙ্গিক হবে, এর আগে নয়। আনুপাতিক নির্বাচনে জয়ী সংসদ সদস্যের নির্দিষ্ট এলাকার মানুষকে সেবা করার দায় তৈরি হয় না, অনেক ক্ষেত্রেই তার সে জ্ঞান, লেজিটেমেসি ও এখতিয়ার থাকে না। কারণ তিনি নির্দিষ্ট কোনো স্থানীয় মানুষের প্রতিনিধি নন। এর ফলে দলের অঞ্চলভিত্তিক তথা তৃণমূলে কার্যক্রম দুর্বল হবে। বর্তমান ব্যবস্থায় এলাকাভিত্তিক প্রার্থী আছে বলেই দলগুলোর এলাকাভিত্তিক বরাদ্দ এবং ব্যক্তি মনোনয়নের দায় আছে। অপরিপক্ব আনুপাতিক নির্বাচনে এ দায় উঠে গেলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী উন্নয়ন ও সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হবে।
আনুপাতিক নির্বাচনীব্যবস্থায় জনগণের সরাসরি ভোটে কোনো প্রার্থী নির্বাচিত হবে না। কোনো একটি দল যদি ৪০ শতাংশ ভোট পায় তাহলে সেই দলের আসন সংখ্যা হবে ১০০ আসনের মধ্যে ৪০টি। এই হিসাব ধরে আগামী নির্বাচনে বিএনপির আসন কমবে। আনুপাতিক ভোট পদ্ধতির দাবি প্রথম তোলে সিপিবি, এরপর এই দাবিতে সুর মেলায় জাতীয় পার্টি। একই সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছে চরমোনাই। কোনো আসনে আলাদাভাবে যারা জিততে পারছে না, তারা যদি সারা দেশে ১ শতাংশ ভোটও পায় তাতেও তারা আসনের দাবিদার। ছোট দলগুলোর জন্য এটা সংসদে যাওয়ার এক বিশেষ সুযোগ। আনুপাতিক পদ্ধতিতে আপাতদৃষ্টিতে ছোট দলগুলোর লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
নেদারল্যান্ডসের ভোটাররা শুধু দলকে নয়, বরং সারা দেশের সব দলের প্রার্থীদের মধ্যে দলের প্যানেলের (দলের নামের নিচে প্রার্থীদের নাম থাকে ব্যালটে) শুধু একজন প্রার্থীকে ভোট দেন। একটি দলের সব প্রার্থীর প্রাপ্ত মোট জাতীয় ভোটের শতাংশের বিপরীতে ঐ দলের সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থীরা মনোনীত হন। এর মাধ্যমে দলের বা দলীয় প্রধানের স্বৈরতন্ত্র প্রতিহত করা যায়। দলকে ভোট দিলে দল বা তার প্রধান একক সিদ্ধান্তে সব সংসদ সদস্য নির্বাচন করে বিপর্যয় তৈরির বহু উদাহরণ বিশ্বে রয়েছে। অপরিপক্ব সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনব্যবস্থার দেশগুলো তাই পিআর নিয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিপদে আছেন। এ ধরনের নির্বাচনব্যবস্থায় বাংলাদেশে নিম্নকক্ষে সংসদের মতো ৩০০ আসন রাখা যাবে না। এতে ব্যালট পেপারে আসন সংখ্যার আনুমানিক দ্বিগুণ প্রার্থীর তালিকা থাকবে, যা থেকে সারা দেশের প্রার্থীরা একজনকে ভোট দিতে পারবেন। ভোটার একাধিক ব্যক্তিকে ভোট দিলে ভোট বাতিল হবে। এমন ব্যালট ছোটখাটো পুস্তকের রূপ নেয়। ইউরোপের ভোট লক্ষ করলে দেখা যাবে, পুস্তিকার মতো ব্যালট পেপার বক্সে ফেলা হয়। বাংলাদেশ এ রকম ব্যালট প্রবর্তন করা সম্ভব নয়।
অনেক সময় আনুপাতিক নির্বাচনে একক দলের আসন সংখ্যা নিরঙ্কুশ হয় না বলে সরকারব্যবস্থা স্থিতিশীল হয় না। অধিকাংশ দেশেই পিআর ব্যবস্থায় কোয়ালিশনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়, যা যখন তখন সরকার পতনের আশঙ্কায় তুলনামূলক দুর্বল সরকার গঠিত হয়। তারা বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তবে সেসব দেশে শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ও নগর সরকার থাকে বলে নাগরিক সেবা ব্যাহত হয় না। বাংলাদেশে সে ধরনের স্থানীয় সরকারব্যবস্থা না থাকায় পিআর এখানে বিপর্যয় তৈরি করবে। গণ-অভ্যুত্থানের পরে যেহেতু জনপরিসরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব অনুপস্থিত, লীগপন্থি বুদ্ধিজীবীরা এতদিন বিরোধিতা করলেও এখন পিআর ব্যবস্থা চাচ্ছেন। কেন চাচ্ছেন, সেটাই প্রশ্ন।
জার্মানি, বেলজিয়াম, সুইডেনের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা যথার্থ নয়। এসব দেশে শিক্ষার হার শতভাগ। তাদের রাষ্ট্রভাবনা অনেক পরিণত। পলিটিক্যাল লিটারেসি সুউচ্চ পর্যায়ের। তাদের নির্বাচনী আচরণ ব্যক্তিগত দ্বেষ-বিদ্বেষ, রাগ-অনুরাগ দ্বারা প্রভাবিত হয় না। গণতন্ত্রও টলমল নয় বরং সুপ্রতিষ্ঠিত। তাদের শক্তিশালী ও স্বাধীন স্থানীয় সরকারব্যবস্থা রয়েছে। এ রকম উচ্চতর রাজনৈতিক সংস্কৃতি দূরে থাক বাংলাদেশ ন্যূনতম পলিটিক্যাল লিটারেসিও আয়ত্ত করেনি। বাংলাদেশের বর্তমান কাঠামোয় সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনব্যবস্থা কতটা উপযোগী তা নিয়ে চিন্তাভাবনার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। এ জন্য এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি উন্নত করার ওপর জোর দিতে হবে।
লেখক : প্রকৌশলী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
