জাতীয় সংসদ ‘নির্বাচন’, সিদ্ধান্ত গ্রহণের এমন একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে জনগণ প্রশাসনিক কাজের জন্য নির্মোহ, স্বাধীনভাবে একজন প্রতিনিধি বেছে নেন। জাতীয় সংসদ হচ্ছে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইনসভা। একাত্তরে স্বাধীনতার পর থেকে সর্বশেষ গত ৭ জানুয়ারি, ২০২৪ হয়েছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন হয় ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। যা ছিল পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যদিও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন সংবিধানের অংশ ছিল না, কিন্তু সব রাজনৈতিক দলের সম্মতির ভিত্তিতে সেটি করা হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য বিপুল সংখ্যক মানুষ ভোটকেন্দ্রে হাজির হয়েছিল। তখন সাড়ে ছয় কোটি ভোটারের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ভোট পড়ে। নির্বাচনে কোথাও তেমন বড় ধরনের সহিংসতা দেখা যায়নি। নির্বাচনে বিজয়ী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বিএনপি। এরপর অনেক ঘটনা ঘটেছে।
২০০৮ সালের নির্বাচনের পর, যেসব নির্বাচন হয়েছে তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে রীতিমতো ক্ষোভ ছিল। ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। ঠিক তখনই আমি-তুমি নির্বাচনের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে দেশবাসী। এর পরিণতি কী হয়েছে গত বছরের ৫ আগস্ট আমরা দেখেছি। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার হয়েছে। সেই সরকার কর্তৃক মনোনীত নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বৃহস্পতিবার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে হালনাগাদ খসড়া ভোটার তালিকার বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেছেন। এ বিষয়ে শুক্রবার দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে নির্বাচন কমিশনার জানিয়েছেন হালনাগাদ খসড়া ভোটার তালিকা অনুযায়ী, দেশে নতুন করে ভোটার হয়েছে ১৮ লাখ ৩৩ হাজার ৩৫২ জন। এ নিয়ে দেশে এখন মোট ভোটার ১২ কোটি ৩৬ লাখ ৮৩ হাজার ৫১২ জন। তালিকা অনুসারে পুরুষ ভোটার বেড়েছে। আর এবারই প্রথম প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে। হালনাগাদ খসড়া তালিকা অনুযায়ী, এখন দেশে মোট পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৩৩ লাখ ৩০ হাজার ১০৩ জন। নারী ভোটার ৬ কোটি ৩ লাখ ৫২ হাজার ৪১৫ জন। হিজড়া ভোটার সংখ্যা ৯৯৪ জন। নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন এবারই প্রথম প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রমের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। বিতর্কিত ভোটার তালিকা প্রসঙ্গে বলেন, একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে এ কমিশন দায়িত্ব নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে একটা শুদ্ধ ভোটার তালিকা ছাড়া কনফিডেন্স বোধ করছি না। তিনি আরও জানিয়েছেন এ ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক বা শুদ্ধতার অভাব বলছি মূলত ৩টি কারণে। একটা হচ্ছে মৃত ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ না পড়া, দ্বিতীয় হচ্ছে কোথাও কোথাও দ্বৈত ভোটার থাকার সম্ভাবনা, তৃতীয়ত হচ্ছে বিদেশি নাগরিক প্রতারণা করে ভোটার তালিকায় সংযুক্ত হওয়া। এর মানে তিনি দেশে শান্তি-স্থিতিশীলতার জন্য সর্বজনীন, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রতি জোর দিচ্ছেন।
ঠিক এই বিষয়টিই সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন। বলেছেন ‘দেশবাসী অবশ্যই একটা ভালো নির্বাচন চায়। সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচন চায়। অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান লক্ষ্যও সেটা। প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের সময়সীমা দিয়েছেন। সেটা ঠিক সময়। আমরা অন্তর্র্বর্তী সরকারের নির্বাচনের রূপরেখা বাস্তবায়নে সব সহযোগিতা করব।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘সবাইকে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্য জরুরি। তাহলেই গণতন্ত্র স্থায়ী হবে। আমরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চাই। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য এখন শান্তি ও স্থিতিশীলতা খুবই জরুরি।’ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক মহলের বিশেষ দৃষ্টি থাকবে তরুণ ভোটারদের ওপর। কারণ এবারই তারা প্রথম ভোটের লাইনে দাঁড়াবে। রাজনৈতিক চিন্তা ও বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটাবে। এর বাইরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং তাদের আদর্শে বিশ^াসী ভোটারদের সম্মিলিত দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দর্শনই দিতে পারে স্থিতিশীল দেশ। ভোটার তালিকার ত্রুটি দূর হোক। তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে শুদ্ধ ভোটার তালিকায় ভোটারের রায় নিয়ে এগিয়ে যাক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।
