নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি মানুষের সাংবিধানিক অধিকার এবং এটি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অন্যতম অনুষঙ্গ। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে খাদ্য নিশ্চিতকরণের বিষয়টি উল্লেখ আছে, এমনকি জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি ১৮ অনুচ্ছেদে পুষ্টি ও নিরাপদ খাদ্যের সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের বিষয় সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে নিরাপদ খাদ্যের প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, চিকিৎসা সংক্রান্ত সব সুবিধা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে উন্নত জাতি বিনির্মিত হবে। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই ভেজাল মানহীন পুষ্টিহীন খাবার অস্বাস্থ্যকর ও অনিরাপদ। খাদ্যের নিরাপত্তায় উৎপাদন আমদানি প্রক্রিয়াজাতকরণ মজুদ, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ, বিপণন প্রতিটি ধাপের সঠিক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়েই খাদ্যে পুষ্টিমান ঠিক থাকে। এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক তথা রাষ্ট্রীয় সব পর্যায়ে সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তি হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার নিমিত্তে হরহামেশা চালে মেশাচ্ছে বিষাক্ত ক্যাডমিয়াম, পোলট্রি ফার্মের ডিমে ট্যানারি বর্জ্যরে বিষাক্ত ক্রোমিয়াম, আটায় চক পাউডার বা ক্যালসিয়াম কার্বনেট। সয়াবিন তেলে মেশানো হচ্ছে পাম ওয়েল, সাবান তৈরির ক্যাস্টর অয়েল ও কেমিক্যাল ঝাঁজ। মরিচের গুঁড়ার সঙ্গে মেশানো হয় ইটের গুঁড়া। ধনে গুঁড়ার সঙ্গে মেশানো হয় কাঠের গুঁড়া, ধানের ভুসি। হলুদের রঙ উজ্জ্বল করতে মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত কেমিক্যাল। আম-জাম-লিচুর মুকুল ধরা থেকে বিভিন্ন স্তরে রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। ফল পাকানোর জন্য ব্যবহার করা হয় ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ। সংরক্ষণ ও পচনের হাত থেকে রক্ষা পেতে ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। মিষ্টি জাতীয় খাবারে ব্যবহার হয় বিষাক্ত কৃত্রিম রঙ, সোডা, স্যাকারিন, মোম, টেস্টিং সল্ট। কলা দ্রুত পাকাতে এবং রঙিন বানাতে কার্বাইড ইথোফেন, ইথালিন ব্যবহার করা হয়। দ্রুত সময়ের মধ্যে অধিক মাংস ও দুধ উৎপাদনের জন্য কেমিক্যাল বা গ্রোথ হরমোন প্রয়োগ করা হচ্ছে গরু, মুরগি, ছাগল, ভেড়া ইত্যাদি প্রাণীর ওপর। ফলে এশীয় অঞ্চলের মাংসভোজীরা শুধু ২০২২ সালেই প্রায় ৩৭ শতাংশের বেশি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছে।
পরিবেশ দূষণের মাধ্যমে নানা জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। এক্ষেত্রে ভৌগোলিক অবস্থা, জলবায়ু পরিবর্তন, বয়স-শ্রেণি-পেশা-লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন তৈরি হচ্ছে। সমাজে বসবাসরত আবালবৃদ্ধ-বনিতা সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কৃষক শ্রেণি, নারী-শিশু, সমুদ্র তীরবর্তী, নদী তীরবর্তী, পাহাড়ি দুর্গম এলাকার জনগোষ্ঠীর ওপর শারীরিক-মানসিক-অর্থনৈতিক নানা নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রায় ৪০ শতাংশ নারী পুষ্টিকর খাদ্য ও রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুবক, কৃষক শ্রেণি, ক্রেতা-বিক্রেতা, বহনকারী সবাই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে। একই ফসল বারবার ফলনে অতিমাত্রায় রাসায়নিক ব্যবহারে মাটির গুণাগুণ তথা উর্বরাশক্তি বিনষ্ট হচ্ছে।
জমিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সারের ব্যবহারের কারণে উর্বরতা শক্তি কমে যাচ্ছে, পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে ইউরোপের বিশেষ করে ডেনমার্কের রাসায়নিক সারের ব্যবহার বহুলাংশে কমিয়ে সেখানে জৈব সারের ব্যবহার বৃদ্ধি করা হয়েছে। এতে করে, ফসলের উর্বরতা শক্তি যেমন ঠিক থাকছে, তেমনি উৎপাদনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সেই সঙ্গে আশাব্যঞ্জক বিষয় হচ্ছে, জনগণ বিষমুক্ত শস্য খেতে পারছে। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ক্ষতিসাধন না করে, ফুল-ফল-ফলাদি, শস্য, ফসল, মৎস্য, গবাদিপশু উৎপাদন লালন-পালন বাণিজ্যিকীকরণ, জীবনচক্র সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করলেই নিরাপদ ও পুষ্টিগণসম্পন্ন খাবারের মান বজায় থাকবে।
বাজারে প্যাকেটজাত গাভীর দুধে অ্যান্টিবায়োটিক ও সিসা পাওয়া গেছে মাত্রাতিরিক্ত। এসব অ্যান্টিবায়োটিক প্রচুর মাংস ও দুধের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে সুপারবাগ রোগে রূপান্তরিত হচ্ছে। হচ্ছে অকাল মৃত্যু এবং প্রাণঘাতী রোগ। দীর্ঘদিন স্টেরয়েড দ্বারা মোটাতাজাকরণ মাংস খেয়ে মানবদেহ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারাচ্ছে। বাংলাদেশে প্রায় ১৩০ রকমের খাবার রাস্তায় পাওয়া যায়। এসব খাবারের পুষ্টির মাত্রা খুবই নগণ্য, কিন্তু ক্ষতিকর প্রভাব অনেক বেশি। ২০১৫ সালে প্রকাশিত একটি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, রাজধানী ঢাকার প্রায় ৫৫ শতাংশ পথ-খাবারে জীবাণু রয়েছে। বলা হয়েছে, বিক্রেতাদের হাতেই থাকে প্রায় ৪৪ শতাংশ জীবাণু।
খাদ্যের উৎপাদন থেকে ভোক্তা প্রতিটি ধাপে ভেজাল, মানহীন, পুষ্টিহীন, অস্বাস্থ্যকর, অনিরাপদ নানা বিষয় সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। রাসায়নিক সারের পরিবর্তে কম্পোস্ট গোবর এবং কীটনাশকের পরিবর্তে প্রাকৃতিক জৈব সার ব্যবহার করতে হবে। কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণে জৈবিক পদ্ধতি যেমন, প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করা দরকার। জমিতে মৌমাছি ও বিভিন্ন উপকারী পোকামাকড়ের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ফসলের সঙ্গে গাছ লাগিয়ে এগ্রোফরেস্টি পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। আবহমান গ্রামবাংলার সনাতনী পরিবেশবান্ধব ফসল উৎপাদনে কাজে লাগাতে হবে কৃষকের অভিজ্ঞতা। ন্যায্যমূল্যের ভিত্তিতে কৃষককে প্রণোদনা তথা সব প্রকার সাহায্য-সহযোগিতা নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। বিভাগ, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, গ্রামপর্যায়ে দোরগড়ায় সব প্রকার সুবিধাপ্রাপ্তিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বিএসটিআই, ভোক্তা অধিদপ্তর, কৃষি ও শিক্ষা অধিদপ্তর, খাদ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সহযোগী সব প্রতিষ্ঠানকে দেশপ্রেমের মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে কাজ করতে হবে। আমাদের চিন্তাচেতনায় ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে এসে বহুপক্ষীয় কার্যক্রম অব্যাহত রাখা জরুরি।
খাদ্য উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত কৃষক থেকে শুরু করে ভোক্তার খাবার পর্যন্ত খাবরের গুণগতমান নিশ্চিত করতে জনসচেতনতা সৃষ্টিকল্পে সারাদেশে কর্মশালা, সেমিনার, পাবলিক মিটিং আয়োজন, পথনাটক, মাইকিং, লিফলেট, গণবিজ্ঞপ্তি, উঠান বৈঠক, টিভি স্ক্রল, প্যাম্পরেট পোস্টার, স্টিকার বিতরণ, চলচ্চিত্র প্রচার, ডকুমেন্টারি তৈরি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা, বিভিন্ন মিডিয়ায় আলোচনা-টকশো এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকেই উদ্যোগী হতে হবে। মনে রাখতে হবে, অনিরাপদ ও ভেজাল খাবার পরিবেশন হত্যাযোগ্য অপরাধের শামিল। তারা নৃশংস অপরাধী।
লেখক : শিক্ষক, গবেষক ও কলাম লেখক
mamun86cu@gmail .com