বাহাত্তরের সংবিধানে জনবিরুদ্ধতার বীজ

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৫, ০৪:০৮ এএম

একাত্তরের রক্তাক্ত মুক্তিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে উদ্ভূত জনঅভিপ্রায়ে গঠিত হয় বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্র। কিন্তু নতুন এই রাষ্ট্রটি কীভাবে, কোন পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে সেটি ঠিক করতে জাতীয় মতৈক্যের ধার ধারেনি যুদ্ধ-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার। এমন কি মুক্তিযুদ্ধের একক নেতৃত্বের দাবিদার হিসেবে আওয়ামী লীগ অস্বীকার করে যুদ্ধে অংশ নেওয়া অন্য দল ও সংগঠনগুলোর অবস্থান। ১৯৭১ সালের শুরুর দিকেই সত্তরের নির্বাচনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়া দল হিসেবে পাকিস্তানের নতুন শাসনতন্ত্র রচনার উদ্যোগ নেয় আওয়ামী লীগ। পরে দেশ স্বাধীন হলে সত্তরের নির্বাচনে বিজয়ী জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিয়েই গঠন করা হয় গণপরিষদ তথা সংবিধান সভা ও সংবিধান প্রণয়ন কমিটি। যদিও সে সময় পাকিস্তানের জন্য একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত প্রতিনিধিরা স্বাধীন বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র রচনা করতে পারেন কি না, সে নিয়ে ওঠে জোরালো আপত্তি ও প্রশ্ন। স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম রূপকার মওলানা ভাসানীসহ অন্যরা এতে তীব্র আপত্তি তোলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগ সরকার এসব বিরুদ্ধতা নাকচ করে দেন।

আওয়ামী লীগের উদ্যোগে পাকিস্তানের সংবিধান : পাকিস্তানের সেনাশাসক ইয়াহিয়া খানের ‘লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক’-এর অধীনে সত্তর সালের শেষভাগে অনুষ্ঠিত হয় সাধারণ নির্বাচন। যা কিনা একই সঙ্গে ছিল একটি নতুন শাসনতন্ত্র প্রণয়নের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত সংবিধান সভার নির্বাচন। এই ভোটে জাতীয় ও প্রাদেশিক উভয় পরিষদেই বেশিরভাগ আসনে জয় পায় আওয়ামী লীগ। দলটির প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান সাফ জানিয়ে দেন, তিনি এবং তার দলই পাকিস্তানের দুই অংশের জনগণের নির্বাচিত ও বৈধ প্রতিনিধি।

১৯৭১ সালের ১৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের জন্য নতুন সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে একটি উপ-কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের বর্ণনা মতে, ‘ফেব্রুয়ারি মাসে আমাদের দ্বিতীয় দফা ও শেষ প্রচেষ্টা ছিল, পাকিস্তানের জন্য একটি সংবিধান রচনা। পয়লা মার্চ সকালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে রচনাকারী কমিটির পক্ষ থেকে খসড়া সংবিধান পেশ করা হয়। এই বৈঠকে পাঞ্জাব আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি জেনারেল মালিক হামিদ সরফরাজসহ পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন। আমার প্রণীত খসড়া সংবিধান কমিটির অনুমোদন লাভ করে। এ ব্যাপারে পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের দায়িত্ব বঙ্গবন্ধু সংসদীয় দলের ওপর ন্যস্ত করেন।’ (ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, কাগজ প্রকাশন/১৯৯১, পৃষ্ঠা ১২)।

স্বাধীন বাংলাদেশের ‘প্রথম সংবিধান’ : নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাইয়ে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় অনিবার্য হয়ে পড়ে পাকিস্তানের বিভক্তি।

পাকিস্তানের সেনাশাসক ইয়াহিয়া খানের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ মোকবিলায় পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ স্বাধীনতা ঘোষণা করে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ। ভারতের মাটিতে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীন দেশ বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হয়। সাম্য, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকে মৌলভিত্তি ধরে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ঘোষিত হয় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। যা ছিল মূলত বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্রের ভিত্তিভূমি।

গণপরিষদ গঠনের আগেই সংবিধানের খসড়া : মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস পাকিস্তানে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফেরার এক দিন পর ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি ‘বাংলাদেশের অস্থায়ী সংবিধান আদেশ’ জারি করেন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান। রাষ্ট্রশাসনের মৌলিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা থাকবে। রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মতো তার সমস্ত কার্য সম্পাদন করবেন।’ একই দিনে অর্থাৎ ১১ জানুয়ারিতেই প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত হয় এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান সাংবিধানিক নির্দেশের বলে সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে পা রাখে বাংলাদেশ। পরদিন ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে দিয়ে নিজেকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন শেখ মুজিবুর রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ‘একচ্ছত্র ক্ষমতা’ নেওয়ার দশ দিনের মাথায় ২০ মার্চ একটি স্থায়ী সংবিধান প্রণয়নের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ’ জারি করেন শেখ মুজিবুর রহমান। এই আদেশের ভিত্তিতে সত্তর সালে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ ও পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে গঠন করা হয় গণপরিষদ। শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে গঠিত এই পরিষদের ওপর বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়। গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল। মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে শাহ আবদুল হামিদ স্পিকার ও মোহাম্মদ উল্লাহ ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। অথচ এর অনেক আগেই ১৮ জানুয়ারি, ১৯৭২ তারিখে আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী ড. কামাল হোসেন সংবাদমাধ্যমকে জানান, ‘বাংলাদেশের খসড়া শাসনতন্ত্র প্রণয়ন হচ্ছে এবং এর চূড়ান্ত রূপ দিতে বেশি সময় লাগবে না। প্রস্তাবিত শাসনতন্ত্রে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা এবং আওয়ামী লীগের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি প্রতিফলিত হবে। (দৈনিক বাংলা, ১৯ জানুয়ারি, ১৯৭২)। একই মাসের ২৯ তারিখে আবারও আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনের বয়ানে ঢাকার গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ‘খসড়া শাসনতন্ত্র প্রণয়নের কাজ সমাপ্ত। খসড়া শাসনতন্ত্রের মুখবন্ধে বলা হয়েছে : গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের মৌলনীতির ভিত্তিতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হিসেবে এই দেশকে গড়ে তোলা হবে।’

নিয়ম রক্ষার সংবিধান প্রণয়ন কমিটি : শুধু নিয়ম রক্ষার জন্য ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত গণপরিষদের বৈঠকের সিদ্ধান্ত মতো ১১ এপ্রিল সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠিত হয়। ড. কামাল হোসেনের বয়ান মতোÑ ‘সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠনের আগেই প্রণয়ন করা হয় সংবিধানের খসড়া।’ ৩৪ সদস্যের এই কমিটির সভাপতি করা হয় আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনকে।

খসড়া সংবিধান নিয়ে গণপরিষদে বিতর্ক : সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সভাপতি হিসেবে ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর ড. কামাল হোসেন খসড়া সংবিধান বিল আকারে গণপরিষদে উত্থাপন করেন। বিলের ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হয় ১৯ অক্টোবর। গণপরিষদের ৪৫ জন সদস্য আলোচনায় অংশ নেন। গণপরিষদ বিতর্কে খসড়া সংবিধানে বিধৃত রাষ্ট্রের ধর্মীয়, জাতিগত, ফ্লোর ক্রসিং তথা ৭০ অনুচ্ছেদ, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সম্পদ ও উৎপাদন পদ্ধতির যৌথ মালিকানাকে সংবিধানের অন্যতম মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা, সম্পত্তির অধিকার তথা শহর ও গ্রামে জনগণের ব্যক্তিগত সম্পত্তির সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ, সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের বিধান না রেখে জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমতা বিধান, মানুষের মৌলিক অধিকার চাহিদা তথা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকা, তফসিলি সম্প্রদায়সহ রাষ্ট্রের অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দেশের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর জাতিসত্তাকে অগ্রাহ্য করা এবং সর্বোপরি রাষ্ট্র কিংবা সরকারপ্রধানের হাতে একচ্ছত্র ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেশকে কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে নিয়ে যাবে কি না, এমন সব ইস্যু খুবই গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পায় এবং এগুলো নিয়ে প্রশ্ন বা আপত্তি তোলেন অনেকে। কিন্তু এসবের কোনো কিছুই আমলে নেননি শেখ মুজিবুর রহমান।  

সংবিধানে কর্তৃত্ববাদ : গণপরিষদ ও সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্যদের তর্ক-বিতর্কে যতই দ্বিমত-আপত্তি উঠুক না কেন, সেগুলো ধোপে টেকেনি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের কর্তৃত্বের কাছে। বরং পাকিস্তান শাসনের সব আইনি কাঠামো, বিচার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রায় সব বিধিবিধানই রেখে দেওয়া হয় স্বাধীন সংবিধানে। এমনকি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দমনমূলক আইনকানুন ও প্রতিষ্ঠানকে বাতিল বা সংস্কারের বিষয়েও কোনো প্রবিধান রাখা হয়নি। সংবিধানের জনবিরুদ্ধতা প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ মইনুল ইসলাম লিখেছেন, ‘... ১৯৭২ সালে যখন সংবিধান প্রণয়ন করা হয় তখন প্রধানমন্ত্রীর আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত সংবিধান প্রণয়ন কমিটি সংবিধানের খসড়া প্রণয়ন করে যখন সেটি বঙ্গবন্ধুর কাছে পেশ করেছিলেন, তখন খসড়ার যেখানেই প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার বিষয়গুলো বর্ণিত হয়েছে, সেখানেই বঙ্গবন্ধু নিজের হাতে কেটেছেঁটে ওগুলোতে পরিবর্তন করে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাকে রাষ্ট্রপতির তুলনায় একচ্ছত্র করার ব্যবস্থা করেছিলেন। ফলে রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতাহীন ‘শিখণ্ডী’ বানানো হয়েছিল।’ এভাবেই ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির তুলনায় প্রধানমন্ত্রীকে ভারসাম্যহীন ও পরম ক্ষমতাশালী করে সংবিধানটি পাস হয়েছিল।  

লেখক: সাংবাদিক ও সদস্য, রাষ্ট্রচিন্তা 

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত