যথেষ্ট আধুনিক বাহাত্তরের সংবিধান

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৫, ০২:১৪ এএম

সংবিধান হলো কোনো রাষ্ট্রের মৌলিক কিছু আইন, নীতিমালা এবং ওই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত আদর্শের একটি সমাহার। যা দিয়ে দেশটি বা তার নানা সংস্থা পরিচালিত হয়ে থাকে। এটি সরকারের কাঠামো, কার্যাবলি, ক্ষমতা এবং নাগরিকদের অধিকার ও কর্তব্যের রূপরেখা রচনা করে। একটি সংবিধান লিখিত বা অলিখিত হতে পারে, কিন্তু এটিই ওই দেশের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক শাসন এবং ব্যক্তি স্বাধীনতা সুরক্ষার জন্য আইনি কাঠামো দেয়।

সংবিধান কেন দরকার : সংবিধান কোনো দেশের সরকারের কাঠামোর রূপরেখা দেয়, নির্বাহী, আইনসভা এবং বিচার বিভাগের ভূমিকা ও ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট করে। এটি সরকার কীভাবে পরিচালিত হবে এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে দেশকে সচল রাখে। সংবিধানের আরেকটি কাজ হলো, ক্ষমতা ও দায়িত্বের সংজ্ঞা প্রদান করা। এটি সরকার, সরকারি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন শাখার ক্ষমতা ও দায়িত্ব সংজ্ঞায়িত করে ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধ করে এবং প্রয়োজনীয় রাশ টেনে ধরার মাধ্যমে ভারসাম্য বজায় রেখে আধিপত্যের সুস্পষ্ট বিভাজন নিশ্চিত করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, সংবিধান নাগরিকদের মৌলিক অধিকার এবং স্বাধীনতাকে সংরক্ষিত করে। যখন রাষ্ট্র বা অন্যান্য সংস্থা কর্র্তৃক নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে, সংবিধান তার বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা দেয়।

সংবিধান নতুন করে লিখতে হবে : বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশেষত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নানা সময়ে ১৯৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কথা তুলেছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিভিন্ন সময়ে সংবিধানের কাটাছেঁড়া করে এর আদল বিনষ্ট করা হয়েছে। মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম (পিএইচডি ফেলো) এবং আইন গবেষক ও কলামিস্ট এক নিবন্ধে (সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ও প্রাসঙ্গিক বাস্তবতা) বলেছেন, ৫০ বছরে বাংলাদেশে ১৭ বার সংবিধানে কাটাছেঁড়া করা হয়েছে। সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থা পাল্টে দিয়ে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা যেমন প্রবর্তন করা হয়েছিল, অন্যদিকে দুবার সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। সংবিধান সংশোধন করে ১৯৮৮ সালে সামরিক শাসকের ছাতার নিচে ‘নির্বাচিত’ সংসদে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরে রাজনৈতিক সরকারগুলো বিভিন্ন সংশোধনী আনলেও তারা রাষ্ট্রধর্মের রদ চায়নি। সংবিধান নিয়ে বিস্তর কাজ করেছেন সাংবাদিক আমিন আল রশীদ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনে এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন : বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার তর্কটি আসলে ঘুরপাক খাচ্ছে সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘বিসমিল্লাহ’ এবং ‘রাষ্ট্রধর্ম’ ইস্যুতে। যারা বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কথা বলেন বা দাবি জানান, তারা এই দুটি বিষয়ের বাইরে অন্য অনুচ্ছেদগুলো বিবেচনায় নেন না।

সংশোধনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ : ১৯৭২ সালের সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার চারটি মূল মৌলিক রাষ্ট্রীয় নীতি পুনর্বহাল করা হয়। সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংখ্যা বর্তমান ৪৫ থেকে ৫০টিতে উন্নীত করা হয়। অনুচ্ছেদ ৭-এর মধ্যে সংবিধানবহির্ভূত উপায়ে ক্ষমতা দখল বন্ধ করার জন্য ৭(ক) এবং ৭(খ) অনুচ্ছেদ সন্নিবেশিত করা, ধারা ৭(খ) অনুযায়ী সংবিধানের মৌলিক বিধানগুলোকে ‘অসংশোধনযোগ্য’ ঘোষণা করা হয়। অসাংবিধানিক পন্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলকারীদের রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করার এবং শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ দণ্ডের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়। এই সংশোধনী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে, যা ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট কর্র্তৃক তা বাতিল হয়েছিল। এতে শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে সেই সঙ্গে বাতিল হয়েছে গণভোট ব্যবস্থা। সংশোধনীতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্তদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়। বলা হয়, জরুরি অবস্থা ১২০ দিনের বেশি চলতে পারবে না। সংবিধানের শেষে তিনটি নতুন তফসিল সন্নিবেশিত করা হয়। যা হলো, শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ, ২৫ মার্চ ১৯৭১ মধ্যরাতে শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকার কর্র্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণা ইত্যাদি।

সংবিধান সংস্কার কমিশন : টানা ১৫ বছর স্বৈরাচারী পন্থায় শাসন করা প্রধানমন্ত্রীর একনায়কতন্ত্র হটাতে জুলাই মাসে যে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়, তারই ফল সংবিধান সংস্কার কমিশন। এটি বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কর্র্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি কমিশন, যার উদ্দেশ্য হলো, অতীতের সাংবিধানিক ব্যর্থতার কারণ নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা এবং একটি নতুন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের জন্য গণপরিষদ নির্বাচনের রোডম্যাপ তৈরি করা। কমিশনপ্রধান ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আলী রীয়াজ সম্প্রতি বলেছেন, গত পাঁচ দশকে সংবিধানের নানা কাটাছেঁড়ায় মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কিছু সংশোধনীর আওতায় এমন শর্ত আরোপ করা হয়েছে যে, তাতে করে ‘মানুষের অধিকারই থাকে না।’ তিনি বলেছেন, নির্বাচনের পদ্ধতি ধ্বংস হয়েছে, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে নির্বাহী বিভাগ এখন বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করে, যেটি হতে পারে না। এতে করে মানুষের অধিকার আর নেই। কমিশনের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ বন্ধ করতে হবে, নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি সন্দেহাতীত করতে হবে। তিনি বিভিন্ন সুবিধাভোগীর সঙ্গে আলোচনা করে সংবিধান সংস্কার নিয়ে কাজ করে চলেছেন। মনে রাখতে হবে, মানুষের জন্য সংবিধান, সংবিধানের জন্য মানুষ নয়। তাই সংবিধান প্রয়োজনে সংস্কার করা যেতে পারে।

সংবিধান লেখা, সংশোধন নিয়ে বিতর্ক : সংবিধান সংস্কার নয়, সম্পূর্ণ নতুন সংবিধান প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক কমিটি। তারা বলেছে, নতুন লিগ্যাল ফ্রেম-অর্ডারের অধীনে গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে। সংবিধান প্রণয়ন সম্পন্ন হলে এই গণপরিষদই আইনসভায় রূপ নেবে। সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। উচ্চকক্ষ রাষ্ট্রপতির অধীনে এবং নিম্নকক্ষ প্রধানমন্ত্রীর অধীনে থাকবে। সংবিধান সংস্কার কমিশনের কাছে নাগরিক কমিটির দেওয়া প্রস্তাবনায় এসব দাবি জানানো হয়েছে। অন্যদিকে ১৯৭২ সালের খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য সন্তানদের বিবৃতিতে সম্প্রতি বলা হয়েছে : বাহাত্তরের সংবিধানকে ‘ছুড়ে ফেলে দেওয়া’ বা ‘কবর দেওয়া’র মতো প্রস্তাব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। গত শনিবারের এই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সংবিধান ‘কবর দেওয়া’ ধরনের কথা মহান মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ও সংবিধান প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের এবং সর্বোপরি দেশের জনসাধারণকে অবজ্ঞা করার শামিল।

সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন, বাতিল নয় : বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নে কিছু কাঠামোগত ও কিছু নীতিগত ভুল ছিল। সে সময় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অনেক ক্ষমতাই নিজে কুক্ষিগত করতে সংবিধানের খসড়ায় নানা কাটছাঁট করেছিলেন। গণপরিষদের গঠন ও কার্যক্রমে বেশ কিছু অসংগতি ও বিধিবিধান পরিপন্থী বিষয় ছিল। সেখানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নেই বললেই চলে। দেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান (বাস্তবে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন) প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ। তিনি দুঃখ করে একবার বলেছিলেন, (প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর) কবর জিয়ারত করা ছাড়া রাষ্ট্রপতির আর কোনো কাজ নেই। তৎকালীন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারতে অসম্মতি জানানোর কারণে ২০০২ সালে সৃষ্ট এক বিতর্কিত ঘটনার জের ধরে (বিএনপি) রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান রচনায় যত ধরনের ভুল ও কাঠামোগত দুর্বলতা থাকুক না কেন, ওই সংবিধান তৎকালীন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যেমন রাশিয়া-আমেরিকার ঠান্ডা যুদ্ধ, আমেরিকা কর্র্তৃক নানা দেশে সমাজতন্ত্রের অজুহাতে নির্বিচার অপারেশন পরিচালনা, বিশ্ববাজার দখলের প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে ওটি একটি আধুনিক সংবিধান ছিল। সেখানে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের মূলনীতির মৌলনীতির ভিত্তিতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হিসেবে এই দেশকে গড়ে তোলার প্রতিজ্ঞা ছিল। আধুনিক যেকোনো সংবিধানে এই বিষয়গুলো পাওয়া যাবে। পরবর্তী সময় ক্ষমতালিপ্সু সরকারপ্রধানরা নিজেদের ক্ষমতাকে ‘সার্বভৌম’, নিজেকে আরও ক্ষমতাশালী করে জনগণকে দূরে ঠেলে দিয়ে, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কাছে টেনে নিয়ে বলতে গেলে সংবিধানের সতীত্ব নাশ করেন। এখন প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে, বাহাত্তরের সংবিধানকে পাশে রেখেই জনগণের ক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে হবে। পাশাপাশি স্বাধীন গণমাধ্যম গঠন করা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা, রাষ্ট্রপতির কর্মকা- বাড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা, রাষ্ট্রের তিনটি শাখার মধ্যে ভারসাম্য ও লাগাম টেনে ধরার ব্যবস্থা করা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় গণতান্ত্রিক সংস্কার সাধন করতে হবে।

লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

 [email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত