চালের মূল্যবৃদ্ধি অযৌক্তিক বললেন উপদেষ্টা

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৫, ০৭:০৪ এএম

বাজার স্বাভাবিক রাখতে সরকার চাল আমদানিতে শুল্কছাড় দিয়েছে। কিন্তু বাজারে প্রভাব পড়েনি। ভর মৌসুমে বাড়ছে চালের দাম। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কৃত্রিম সংকটের অজুহাতে সব ধরনের চালের দামে রেকর্ড গড়েছে। এ পরিস্থিতিতে গতকাল বুধবার বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন বলেছেন, বাজারে চালের ঘাটতি নেই। ফলে চালের যে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে, তা অযৌক্তিক। দাম বাড়ার পেছনে সাময়িক মজুদদারি হয়েছে। চালের দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যাপকভাবে আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।

বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, চালের মূল্যবৃদ্ধির সমস্যা স্বীকার করতে হবে। ভোক্তা পর্যায়ে বিশেষ করে নাজিরশাইল ও মিনিকেট এ দুটি চালের দাম বেশ খানিকটা বেড়েছে। পাইকারি পর্যায়ে যে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে, তার চেয়ে খুচরা পর্যায়ে অনেক বেশি দাম বেড়েছে। এর কারণ খোঁজার চেষ্টা চলছে। সার্বিকভাবে এ মূল্যবৃদ্ধি অযৌক্তিক মনে হয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী বাজারে চালের ঘাটতি নেই। সরকারের চালের মজুদ, স্থানীয় উৎপাদন ও সংগ্রহে ঘাটতি নেই। আমনের ভরা মৌসুম চলছে; এখন চালের দাম বেড়ে যাওয়ার যৌক্তিক কারণ নেই। এটা সাময়িক মজুদদারি বলে মনে করেন তিনি।

আমনের ভরা মৌসুম চলছে। অন্যান্য বছরে এ সময়ে বাজারে চালের দাম কমলেও এবার ভিন্ন চিত্র দেখা গিয়েছে। মোটা চাল কিনতে ও ভোক্তাকে গুনতে হচ্ছে ৫৮ থেকে ৬০ টাকায়। আর চড়া দামে প্রতি কেজি সরু চাল কিনছেন ৮৫ থেকে ৮৬ টাকায়। এ পরিস্থিতিতে বাজার অস্থির হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন খুচরা ও পাইকারি চাল ব্যবসায়ীরা।

খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, প্রতি বছর আমনের মৌসুমে চালের দাম কম থাকে। কিন্তু চলতি বছর দামে রেকর্ড গড়েছে। আমনের পাশাপাশি বাজারে আমদানিকৃত চাল এসেছে। সব মিলিয়ে বাজারে চালের ঘাটতি নেই। কিন্তু গুটিকয়েক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ও করপোরেট ব্যবসায়ীদের কারসাজির জন্য চালের বাজার অস্থির হয়েছে। সরকারি সংস্থাগুলো যথাযথ পদক্ষেপ না নিতে পারলে আগামী এক মাসের মাধ্যে প্রতি কেজি চালের দাম ১০০ টাকায় পৌঁছাবে! বিশেষ করে মিলগুলোতে সাঁড়াশি অভিযান করলে বাজার স্বাভাবিক হবে।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গেল এক মাসেই সব ধরনের চালের গড় দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ৯ থেকে ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। এর মধ্যে মোটা জাতের চালের কেজি প্রতি ৪ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৮ থেকে ৬০ টাকায় এবং ৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৮৬ টাকায়।

চালের পাইকারি ব্যবসায়ীদের দাবি, তিন মাসে কয়েক দফার কারসাজিতে প্রতি বস্তা সরু জাতের চালের দাম বেড়েছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। এ বিষয়ে কারওয়ান বাজারের চালের পাইকারি ব্যবসায়ী ও নোয়াখালী রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী শাওন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমানে বাজারে চালের সংকট নেই। আমন ও আমদানি করা চালের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। তবে করপোরেট চাল ব্যবসায়ীদের মজুদকান্ড না ঠেকানো গেলে আগামী এক মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজি সরু চাল ১০০ টাকায় কিনে খেতে হবে। সেই ক্ষেত্রে কোটা চালের দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

গতকাল খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে জানান, আড়াই লাখ টন আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এবং এক লাখ টন বার্মা থেকে জিটুজি ভিত্তিতে কনফার্ম হয়ে গেছে। আর ৫০ হাজার টন পাকিস্তান থেকে আনতে আমাদের আলোচনা কনক্লুড হয়েছে। পারচেজ কমিটি যেটা আছে সেটা আগামী মিটিংয়ে আমরা এটা তুলব।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণের সরকারি সংস্থাগুলো যে স্তরে অভিযান পরিচালনা করার কথা সে স্তরে তারা অভিযান পরিচালনা করছে না। দায়সারাভাবে নামমাত্র খুচরা বাজারগুলোতে অভিযান করে সংস্থাগুলো। ফলে কারসাজি করা ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফা লুটে ফুলেফেঁপে উঠছে। অন্যদিকে বরাবর দেশের কৃষক ও ভোক্তা উভয় ঠকে আসছেন। দ্রুতই এ সংস্কৃতির প্রতিকার করা জরুরি।

এ বিষয়ে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিযোগিতামূলক বাজার গড়ার দায়িত্ব মূলত প্রতিযোগিতা কমিশনের। কিন্তু তাদের কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে তারা নিজেরাই বাজার থেকে হারিয়ে গেছে। সরকারের বাজার মনিটরিং সংস্থাগুলোর তদারকি নিয়ে সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, বাজারে একাধিক সংস্থা তদারকি করে। কিন্তু ভোক্তা এ থেকে কোনো সুফল পাচ্ছে না। পণ্যের দাম বাড়লেই কর্মকর্তারা অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু যে স্তরে কারসাজি হয়েছে সেই স্তরে মনিটরিং হয় না। ফলে অসাধুরা এ সুযোগে ভোক্তাকে বেশি করে নাজেহাল করে তোলে। তার ভাষ্য, আর কয়েক মাস পরই রোজা শুরু হবে। এখন থেকেই যদি বাজার ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানো না হয়, ক্রেতারা আরও ভোগান্তিতে পড়বে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত