‘মাস্টারমাইন্ডের’ দোষ স্বীকারে বাধা

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:০৩ এএম

যুক্তরাষ্ট্র সরকার আত্মসমর্পণের চুক্তি থেকে সরে আসায় সে দেশের মাটিতে ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার অভিযুক্ত মাস্টারমাইন্ড আর দোষী সাব্যস্ত হবেন না। গত বছর এই চুক্তিটি সম্পন্ন হয়েছিল। খালিদ শেখ মোহাম্মদের, যিনি কেএসএম নামেও পরিচিত, দক্ষিণ-পূর্ব কিউবার গুয়ানতানামো বে নৌ ঘাঁটিতে একটি যুদ্ধ আদালতে তার দোষ স্বীকারের আবেদন জানানোর কথা ছিল।

তিনি গুয়ানতানামোর সবচেয়ে কুখ্যাত বন্দি এবং ঘাঁটিতে সর্বশেষ বন্দিদের একজন, যেখানে তিনি প্রায় দুই দশক ধরে আটক আছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় একটি ফেডারেল আপিল আদালত খালিদ এবং দুই সহ-আসামির আবেদনের চুক্তি পরিত্যাগ করার জন্য সরকারের অনুরোধ বিবেচনা করতে নির্ধারিত কার্যক্রমকে স্থগিত করেছে। কারণ হিসেবে বলা হয়, ব্যাপারটি এই কার্যক্রম এবং জনসাধারণ উভয়ের জন্য ‘অপূরণীয়’ ক্ষতি হবে।

তিন বিচারকের একটি প্যানেল বলেছে যে, বিলম্বকে ‘কোনো উপায়ে যোগ্যতার ওপর একটি রায় হিসেবে বোঝানো উচিত নয়’, তবে এর উদ্দেশ্য ছিল আদালতকে একটি সম্পূর্ণ ব্রিফিং পাওয়ার জন্য সময় দেওয়া এবং ‘দ্রুত ভিত্তিতে’ যুক্তি শোনা। এই দেরির ফলে এখন ব্যাপারটি ট্রাম্প প্রশাসনের ঘাড়ে বর্তাবে।

শুক্রবার সকালে শুরু হওয়া একটি শুনানিতে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর হামলায় ভূমিকার জন্য খালিদের দোষ স্বীকার করার কথা ছিল। খালিদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও হত্যাসহ অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। হামলায় ২,৯৭৬ জন ভুক্তভোগীর কথা উল্লেখ আছে। খালিদ এর আগে বলেছিলেন, তিনি ‘৯/১১ অপারেশন ফ্রম এ-টু-জেড’-এর পরিকল্পনা করেছিলেন পাইলটদের বাণিজ্যিক বিমানগুলোকে ভবনে উড্ডয়ন করার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়ার ধারণার ছক করেছিলেন এবং সেই পরিকল্পনাগুলো ১৯৯০ দশকের মাঝামাঝি ওসামা বিন লাদেনের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন।

নৌ ঘাঁটিতে একটি সামরিক আদালতে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অনুষ্ঠিত প্রাক-বিচার শুনানি চলছে, মার্কিন হেফাজতে থাকাকালীন মোহাম্মদ এবং অন্য আসামিরা যে নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছিল তার ফলে বিচারকার্য জটিল হয়েছিল।

পাকিস্তানে ২০০৩ সালে গ্রেপ্তারের পর, মোহাম্মদ ‘ব্ল্যাক সাইট’ নামে পরিচিত গোপন সিআইএ কারাগারে তিন বছর বন্দি ছিলেন। যেখানে তাকে ১৮৩ বার জোরপূর্বক ‘ওয়াটারবোর্ডিং’-এর শিকার হতে হয়েছিল। এ ছাড়াও অন্যান্য তথাকথিত ‘উন্নত জিজ্ঞাসাবাদ কৌশল’ ছিল, যাদের মধ্যে ছিল ঘুমের বঞ্চনা এবং জোরপূর্বক নগ্নতা।

হাউ গুয়ানতানামো বিকেম দি ওয়ার্ল্ডস মোস্ট নটোরিয়াস প্রিজনের লেখিকা ক্যারেন গ্রিনবার্গ বলেছেন যে, নির্যাতনের ব্যবহার ‘এই মামলাগুলোকে এমনভাবে বিচারে আনা কার্যত অসম্ভব করে তুলেছে, যা আইনের শাসন এবং আমেরিকান আইনশাস্ত্রকে সম্মান করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসব মামলায় নির্যাতনের মাধ্যমে প্রাপ্ত প্রমাণের ব্যতিরেকে প্রমাণ হাজির করা অসম্ভব বলে প্রতীয়মান হয়। এ ছাড়াও এসব ব্যক্তিরা নির্যাতিত হয়েছিলেন এই ব্যাপারটি বিচারে আরও এক স্তরের জটিলতা যোগ করে।’ 

মামলাটি সামরিক কমিশনের আওতায় পড়ে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত ফৌজদারি বিচারের ধারার বাইরে এবং প্রক্রিয়াটিকে স্লথ করে দেয়। দুই বছরের দরকষাকষির পর গত গ্রীষ্মে আত্মসমর্পণের চুক্তিটি সম্পাদিত হয়। 

বুধবার একটি আদালতের শুনানিতে, খালিদের আইনি দল নিশ্চিত করেছে যে, তিনি সব অভিযোগের জন্য দোষ স্বীকার করতে সম্মত হয়েছেন। খালিদ ব্যক্তিগতভাবে আদালতের সঙ্গে আলাপ করেননি, তবে তার আইনি দল যখন চুক্তিটি নিয়ে অগ্রসর হয় তখন তিনি সেই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন।

এই চুক্তির পুরোটা প্রকাশিত হয়নি, তবে আমরা জানি এই চুক্তির মানে হচ্ছে খালিদের মৃত্যুদন্ড হবে না। চুক্তি বজায় থাকলে পরবর্তী সময় প্যানেল নামে পরিচিত মিলিটারি জুরিতে শুনানি হতো। শর্তানুসারে, ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারও খালিদকে প্রশ্ন করতে পারতেন এবং আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তাকে সেগুলোর ‘সম্পূর্ণ এবং সত্য’ জবাব দিতে হতো।  চুক্তি অনুসারে আগালেও বিচারকার্য শুরু হতে এবং রায় পেতে অনেক সময় লাগত।

গত সপ্তাহে, চুক্তিটি আটকানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার ফেডারেল আদালতের শরণাপন্ন হয়। সেই প্রার্থনায় খালিদ এবং অন্য দুজনকে দোষী হিসেবে দেখিয়ে বলা হয়, ‘আধুনিক ইতিহাসে আমেরিকার মাটিতে সবচেয়ে জঘন্য অপরাধমূলক কাজ করা’ এবং চুক্তিগুলো কার্যকর করা ‘সরকার এবং আমেরিকান জনগণকে উত্তরদাতাদের অপরাধ এবং মৃত্যুদণ্ডের সম্ভাবনা হিসেবে একটি পাবলিক ট্রায়াল থেকে বঞ্চিত করবে, এই সত্য সত্ত্বেও প্রতিরক্ষা সচিব আইনত সেই চুক্তিগুলো প্রত্যাহার করেছেন।’

গত গ্রীষ্মে চুক্তি ঘোষণার পর, রিপাবলিকান সিনেটর মিচ ম্যাককনে এটিকে ‘আমেরিকা রক্ষা এবং ন্যায়বিচার প্রদানের জন্য সরকারের দায়িত্বের বিদ্রোহমূলক ত্যাগ’ হিসেবে বর্ণনা করে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছিলেন। হামলায় নিহতদের কিছু পরিবারও এই চুক্তির সমালোচনা করে। গত গ্রীষ্মে বিবিসির টুডে প্রোগ্রামের সঙ্গে কথা বলার সময়, টেরি স্ট্রাডা, যার স্বামী টম হামলায় নিহত হয়েছিল, এই চুক্তিটিকে ‘গুয়ানতানামো বেতে বন্দিদের তারা যা চায় তা দেওয়ার’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।

প্রচারাভিযান গ্রুপ ৯/১১ ফ্যামিলিস ইউনাইটেডের জাতীয় চেয়ার মিসেস স্ট্রাডা বলেছেন : ‘এটি খালিদ শেখ মোহাম্মদ এবং অন্য দুজনের জন্য একটি বিজয়, এটি তাদের জন্য একটি বিজয়।’ অন্যান্য পরিবারগুলো চুক্তিগুলোকে জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যধারায় দোষী সাব্যস্ত করার পথ হিসেবে দেখে এবং সরকারের সর্বশেষ হস্তক্ষেপে হতাশ হয়েছিল।

২০০৬ সাল থেকে গুয়ানতানামো বে-এর সামরিক কারাগারে বন্দি রয়েছেন খালিদ। কারাগারটি ২৩ বছর আগে, ২০০২ সালের ১১ জানুয়ারি, ৯-১১ হামলার পরে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ চলাকালীন, সন্ত্রাসবাদী সন্দেহভাজন এবং ‘অবৈধ শত্রু যোদ্ধাদের’ রাখার জায়গা হিসেবে খোলা হয়েছিল। এখানে বন্দিদের বেশিরভাগের বিরুদ্ধে কখনো অভিযোগ আনা হয়নি এবং সামরিক কারাগারটি বন্দিদের সঙ্গে আচরণের জন্য অধিকার গোষ্ঠী এবং জাতিসংঘের সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ বন্দি এখন প্রত্যাবাসন বা অন্য দেশে পুনর্বাসিত হয়েছে। কারাগারে বর্তমানে ১৫ জন বন্দি রয়েছে এটির ইতিহাসের যেকোনো সময়ে সবচেয়ে ছোট সংখ্যা। তাদের ছয়জন ছাড়া বাকি সবাই যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত বা দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।

বিবিসি থেকে ভাষান্তর সৈয়দ ফায়েজ আহমেদ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত