দরবার-ই-জহুর

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:০৫ এএম

পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসন, স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা ছিল গৌরবোজ্জ্বল। ১৯৫৪ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি দৈনিক সংবাদে সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। জহুর হোসেন চৌধুরী ‘দরবার-ই-জহুর’ কলামে তৎকালীন সামরিক শাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন ও প্রেস ক্লাবের অন্যতম উপদেষ্টা এই সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব ১৯৮০ সালের ১১ ডিসেম্বর ৫৮ বছর বয়সে মারা যান। সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৮২ সালে মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতে ছাপা হলো তার লেখা উপসম্পাদকীয়

গত ১১ এপ্রিল বড় আপা বেগম শামসুন নাহার মাহমুদের দ্বাদশ মৃত্যুবার্ষিকী গেল। দেখলাম, একমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শামসুন নাহার হল’-এ একটা যেনতেন প্রকারের স্মৃতিসভা ভিন্ন দেশের মেয়েরা তাকে স্মরণ করেনি। ১৫ এপ্রিল ছিল বড় ভাই জনাব হবীবুল্লাহ বাহারের দশম মৃত্যুবার্ষিকী। নিছক আত্মীয়-স্বজন প্রতিবেশীদের নিয়ে তার শান্তিনগরের বাড়িতে অনুষ্ঠিত মিলাদে আমি স্বভাবতই উপস্থিত ছিলাম। দেশের আর কোথাও কোনো অনুষ্ঠান হয়েছে বলে আমার নজরে পড়েনি। কেবল ‘সংবাদ’-এ পরলোকগত প্রফেসর শ্রী অজিত কুমার গুহের লেখা একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। এমনকি তার নামে শান্তিনগরে যে একটি কলেজ চলছে, সেটাতেও একটি মামুলি সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। অথচ ‘জাতীয় ঐতিহ্য’ সম্বন্ধে চারদিকের শোরগোলে কর্ণপট বিদীর্ণ হওয়ার জোগাড়।

আমার পক্ষে এ মন্তব্যগুলো করা যে একান্ত অশোভন হচ্ছে, সে সম্বন্ধে সচেতন। ওয়াদুদ সাহেব তো বলেছেনই, আমি একটু বেশি পরিবার-সচেতন। কিন্তু আমি নিরুপায়। এ দুজনের আম্মাকে আমিও আম্মা ডাকতাম। কারণ, দুবছর বয়সেই আমার মাতৃ-বিয়োগ হয় এবং এদের আম্মা, অর্থাৎ আমার বড় খালার হাতেই আমি মানুষ হই। আমার চরিত্রে এ দুই ভাই-বোনেরই প্রভাব পড়েছে সবচেয়ে বেশি। এদের দুজনের মৃত্যুদিবসগুলো এভাবে একরূপ অলক্ষ্যে চলে যাওয়াতে আমি বিন্দুমাত্র আশ্চর্য হইনি। আর যাই হোক, আমাদের মধ্যবিত্তের মনের সঙ্গে কিছুটা পরিচয় আছে বলে আমার ধারণা। নানা বড় বড় কথার অন্তরালে আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজের বিপুল অংশের মন একান্তভাবেই কেবল নিজের হালুয়া-রুটি, দবরবা বৃদ্ধিতেই এত ব্যস্ত যে, অন্যদিকে একটু মনোযোগ দেওয়ারই অবসর নেই কথাটি অপ্রিয় হলেও একান্ত বাস্তব।

আমৃত্যু এ দুই ভাই-বোনের ঘনিষ্ঠ সংসর্গে থেকে উপলব্ধি করেছি যে, নজরুলের মন্তব্যগুলো সার্থক হয়েছিল এদের জীবনে। প্রায় তিন যুগ ধরে বাহার সাহেব সাহিত্য, রাজনীতি, খেলার মাঠে ও মজলিসি আড্ডায় বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের জীবনে ‘সবুজ প্রাণের প্রতীক’ ছিলেন। আর মিসেস রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে মিলিতভাবে এবং তার মৃত্যুর পর নিজে বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত মেয়েদের জন্য ‘রাত্রি চিরে জ্যোতির অভিযান’ পরিচালনা করে গেছেন তিন যুগেরও বেশিকাল যাবৎ বেগম শামসুন নাহার মাহমুদ। এদেরই সাধনা ও পরিশ্রমের ফলে আজ জীবনের প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ক্রমবর্ধমান হারে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন আমাদের মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েরা পেতে শুরু করেছেন নিজেদের অধিকারের স্বীকৃতি। আর মশার কামড় খেলেই ঢাকার জনসাধারণ যারা তারের জালি দিয়ে ঘেরা বাড়িতে বাস করেন না, তারা বাহার সাহেবকে স্মরণ করেন দেখতে পাই। সুতরাং এ দুই ভাইবোনের স্মৃতি দিবস যথাযোগ্যভাবে পালিত না হলেও আমার মনে কোনো ক্ষোভ নেই। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে স্মৃতিসভা অনুষ্ঠানের বিরোধী। কারণ অনেক স্মৃতিসভার অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে দেখেছি, সেগুলোতে এমন সব কথা বলা হয়, যাতে যার উপলক্ষে সভা, তাকে একরূপ বিদ্রুপই করা হয়।

পূর্বসূরিদের যে এখনো সাধারণ মানুষ মাঝে মাঝে মনে করে, এটাই তাদের প্রতি সত্যিকার শ্রদ্ধা নিবেদন। সুতরাং দুঃখ করার কিছুই নেই। এ ছাড়াও ইতিহাসের গতিপথ কত লোকের স্বেদে ও রক্তে পিচ্ছিল হওয়াতেই এর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে এবং যাদের নামও আমরা জানি না, তাদের স্মৃতি দিবস করে কে? মধ্যবিত্ত চরিত্র স্ববিরোধিতায় ভরা। আমিও মধ্যবিত্ত সন্তান।

সুতরাং আমার কথায়-কাজেও স্ববিরোধিতা যথেষ্ট পরিমাণেই হাজির রয়েছে। স্মৃতিসভা, স্মৃতিরক্ষার ব্যাপারে দার্শনিকসুলভ ঔদাসীন্য থাকলেও বড় ভাইয়ের মৃত্যুবার্ষিকীর সময়েই স্থির করেছিলাম, তার স্মৃতিরক্ষার ব্যাপারে কিছু একটা করার জন্য উদ্যোগী হতে তার ভ্রাতৃপ্রতিম বন্ধু বর্তমানে রাষ্ট্রপতির শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা প্রফেসর আবুল ফজল সাহেবকে অনুরোধ করব।

এর দুতিন দিন পরে তাকে টেলিফোন করে পিএর কাছে নিজের নাম বললাম। কয়েক সেকেন্ড পরে ভারী গলায় আওয়াজ ভেসে এলো, ‘হ্যাঁ, বলুন’। আমি রীতিমতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম, ‘আপনি আমাকে আপনি বলছেন ফজল ভাই?’ একেবারে গালে সজোরে চপেটাঘাত পেলাম। ‘তুমি ক’বছর পরে আমার খোঁজ করছ বলত? তোমাকে আপনি বলব না ত কী বলব?’ তিরস্কারটার যৌক্তিকতা সম্বন্ধে কিছু বলার কোনো উপায় নেই। ছেলেবেলা থেকে তার সঙ্গে যে নিবিড় পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সম্বন্ধ, তাতে এ তিরস্কার আমার নিঃসন্দেহে প্রাপ্য। কিন্তু গত আট বছর যাবৎই আমি সকল প্রকার সামাজিক সম্পর্ক কমিয়ে আনতে আনতে প্রায় শূন্যে এনে ফেলেছি। শরীরের ও কিছুটা মনের অবস্থা এর জন্য প্রধানত দায়ী। সুতরাং বিনা দ্বিধায় ফজল ভাইয়ের কাছে মাফ চেয়ে নিলাম। যে অল্প কয়জন বুদ্ধিজীবী সম্বন্ধে এখনো শ্রদ্ধা রাখি, তিনি তার একজন। তিনি যে কথাই বলেন লেখেন, তা নির্ভীকভাবেই বলেন ও লেখেন এবং এগুলোর পেছনে কোনো প্রকার স্বার্থের বিন্দুমাত্র তাগিদ আছে বলে মনে করার কোনো কারণ কখনো ঘটেনি। দূর থেকে তাকে শ্রদ্ধাই করে এসেছি। বিনা সঙ্কোচে বড় ভাইয়ের ও অন্য দুটো বিষয়ের উল্লেখ করে তার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি চাইলাম ও সম্মতি পেলাম। এরপর একটু সঙ্কোচের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আমার লেখা আপনি পড়েন?’ ‘সময় পেলে মাঝে মাঝে পড়ি।’ ‘কেমন হচ্ছে?’ ‘লেখা যেমনই হোক, এর শিরোনামটা আমার পছন্দ নয়। দরবার ত রাজা-বাদশাদের ব্যাপার এবং এটা আমি আহমদুল কবিরকে বলেছি।’ একেবারে চুপসে গেলাম। তবু ভয়ে ভয়ে বললাম, ‘দরবার’ কথাটা রাজা-বাদশাদের কাছ থেকে এসেছে ঠিক, কিন্তু সাধারণ লোককেও দরবারি, মজলিসী বলা হয়। আমার ইচ্ছা ছিল মজলিস বা বৈঠক ব্যবহার করি, কিন্তু আমার এক শ্রদ্ধেয় বন্ধু শেষ পর্যন্ত ‘দরবার’ শব্দটা পছন্দ করতেই এটা দেওয়া হয়েছে। এখন নামটা তো প্রচলিত হয়ে গিয়েছে। তা ছাড়া আমার আবার দরবার! এর একটা বিদ্রুপাত্মক আবেদন আছে, যেটা আমারও মন্দ লাগে না। ‘আচ্ছা একদিন টেলিফোন করে এসো’ বলে আবুল ফজল সাহেব রেখে দিলেন। তার কথাগুলো কিন্তু কদিন ধরে আমাকে একটু বিচলিত রেখেছে। তার সম্বন্ধে যতটুকু জানি, তাতে তার আপত্তিটা যে কেবল ‘দরবার’ শব্দটির অপপ্রয়োগে নয়, সে সম্বন্ধে আমি প্রায় নিশ্চিত। ‘দরবার-ই-জহুর’ এই পুরো শিরোনামায় তিনি যে অহম-ভাবের প্রকাশ অনুভব করেছেন, সেটাই তার মনে লেগেছে। হায়রে আল্লাহ! অহমভাবই যে এদেশের সকল দুর্গতির মূল কারণ বলে আমি এতদিন যাবৎ কলম ও তার চেয়ে বেশি জিহ্বা পরিচালনা নিরলসভাবেই করে এসেছি, শেষ পর্যন্ত বন্ধুবর ওয়াদুদ সাহেবের সলায় পড়ে আমার কপালেই এ অপবাদ জুটল। বন্ধু-বান্ধব অবশ্য ‘দরবার-ই-জহুর’ শিরোনামাটা বিদ্রুপাত্মক অর্থেই নিয়েছেন। ইচ্ছা ছিল, এ কলামটিতে প্রধানত সকলকে এবং সবকিছুকে বিদ্রুপই করে যাব। এ ব্যাপারে যে আমি বেশ একটু পটু, আমার জানাশোনা সকলেই অতীতের আমি সম্বন্ধে বিনা দ্বিধায় এ প্রশংসা বা নিন্দাপত্র দিবেন।

বন্ধু-বান্ধবের কথা স্বতন্ত্র। কিন্তু আবুল ফজল সাহেব মুরুব্বি লোক। তার কথাগুলো সত্যিই আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। তবে আমার এটুকু ঝুটা কৈফিয়ত আছে যে, নিজের নামে ও ছবি ছাপিয়ে লেখার রেওয়াজ পৃথিবীর সর্বত্রই আছে। তবে অহম-ভাবের বিষক্রিয়া সম্বন্ধে আমি অতি সচেতন। এতদসত্ত্বেও আমার লেখায় মধ্যবিত্তসুলভ অহমভাবের যদি প্রকাশ হয়, তবে আমার বিনীত নিবেদন এই যে, পাঠকগণ নিজ গুণে আমার ত্রুটি মার্জনা করবেন এবং শুধু তাই নয়, আবুল ফজল ভাইয়ের ন্যায় আমাকে তিরস্কার করবেন, অবশ্য চিঠি লিখে, টেলিফোনে নয়। শিরোনামটা দিয়ে ফেলেছি, এখন কী আর করি? আমি হলফ করে বলতে পারি যে, অহমভাবকে আমি যতটা ঘৃণা করি, আর কিছুকেই ততটা নয়। পূর্বেই বলেছি, অহম-ভাবই আমাদের সকল সর্বনাশের মূল কারণ বলে আমি অন্তর থেকে বিশ্বাস করি। প্রতিজ্ঞাটি পুরোপুরি রাখতে পারিনি বলেই মাঝে মাঝে বিপদে ফেলে খোদা আমাকে সাবধান করেছেন বলে বিশ্বাস করি। এখন এই ‘দরবার-ই-জহুর’ শুরু করে যদি অহম-ভাবের পরিচয় দিয়ে থাকি, রহমানুর রহিম খোদা যেন মাফ করেন।

এটার দ্বারা কারও, দেশের তো নয়ই, কোনো উপকার হবে, এ বিশ্বাসে লেখাটা শুরু করিনি। করেছি নেহাত জীবিকার প্রয়োজনে। দেশটার কেউ কিছু করতে পারবে না, এর ভার আল্লাহর হাতে, এটাই আমার দৃঢ়বিশ্বাস। অবশ্য আল্লাহ আবার মানুষকে নিজ ভাগ্য গড়ার চেষ্টা করার অধিকার দিয়েছেন। যুগটা কী রকম বদলে গিয়েছে। আগে শ’য়ে হাজারে দু’চারজন অহঙ্কারী লোক দেখতে পাওয়া যেত। গত ত্রিশ বছরে গোটা দেশটাই অহঙ্কারে অহঙ্কারময় হয়ে গেছে। অবশ্য দেশটা বলতে আমি উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তকেই বোঝাচ্ছি। কারণ, বিত্তহীন ও নিম্নবিত্তের লোকদের জীবিকার তাড়নায় অহঙ্কার প্রদর্শনের সুযোগ ও অবসর কই? তাদের মনে যেদিন নিজেদের সত্তা সম্বন্ধে সচেতনতা আসবে, সেদিনই দেশের সকল সমস্যার সমাধান সুগম হবে। কিন্তু চারপাশের লোকের অহঙ্কারের যন্ত্রণাই ঘর থেকে বার না হওয়ার অন্যতম কারণ। বিত্তের, ক্ষমতার, বিদ্যার, বুদ্ধির, ধার্মিকতার, গণতান্ত্রিকতার, বিপ্লবিতার, দেশপ্রেমের, সমাজতান্ত্রিকতার কত রকমের অহমবোধের কত বিচিত্র ও ভয়াল খেলাই না গত ত্রিশ বছরে কেবল আমি নয়, সারাদেশের মানুষ দেখল। এসব খেলার ফলে সাধারণ মানুষের জীবন কতবার বিপর্যন্ত হয়ে চুরমার না হয়ে গেল! এ খেলা বন্ধ হোক, ‘আমি কি হনুরে’ এ মানসিকতা থেকে দেশ মুক্ত হোক, খোদার দরগাহে সাড়ে সাত কোটি মানুষের এটাই যে আরজ, সে সম্বন্ধে আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই। দেশের দন্ডমুন্ডের কর্তা হয়ে দেশবাসীর ঐহিক পারলৌকিক মঙ্গলের জন্য জীবন যৌবন উৎসর্গ অতীতে অনেকে করেছেন এবং এখনো করছেন। আমি তাদের সমীহ করি। আমি নিজে এখন নির্বাণের সাধনার সারমর্ম উপলব্ধির চেষ্টায় লিপ্ত।  (ঈষৎ সংক্ষেপিত)

লেখক: সম্পাদক, দৈনিক সংবাদ

৩০ এপ্রিল ১৯৭৬

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত