পণ্য ক্রয়ে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৫, ০২:৪০ এএম

বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলম। কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা। দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে। একইসঙ্গে করছেন অধ্যাপনা। সম্প্রতি ১০০ পণ্যের ওপর ভ্যাট ও শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান

দেশ রূপান্তর : প্রতি বছর বিভিন্ন পণ্যে ভ্যাট ও শুল্ক বাড়ছে। এই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি ১০০ পণ্যের ওপর ভ্যাট ও শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জনগণের ওপর কোনো ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?

ড. শামসুল আলম : বিগত বছরের ধারাবাহিকতায় পণ্যমূল্যের ওপর ভ্যাট ও শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এটা ধারাবাহিকভাবে চলছে। বিষয়টি যে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, তা পরিষ্কার। অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের যে সিন্ডিকেট রয়েছে, তা ভেঙে ফেলার জন্য তেমন কোনো উদ্যোগ এখন পর্যন্ত নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে অতীতে চাঁদাবাজি ছিল, এখনো আছে। শুধু হাতবদল হয়েছে। আবার সরকার বছরের শুরুতেই ভ্যাট এবং সম্পূরক কর বৃদ্ধি করেছে ১০০ পণ্যে। এর ফলে পণ্য মূল্যবৃদ্ধির যে ট্রাডিশন ছিল, সেটাই সুরক্ষিত হলো। এটা অবশ্যই গণস্বার্থবিরোধী হয়েছে।

এই কারণে সরকার নানান ধরনের সমালোচনার মুখোমুখি হবে। তাতে তারা অপ্রিয় হয়েছে সাধারণ মানুষের কাছে। অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। ভালো হতো, সরকার যদি এই পথে না গিয়ে বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করে চাঁদাবাজিমুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারত। তাহলে সেটা ছিল ভালো উপায়। যে সমস্ত পণ্য নিত্যপ্রয়োজনীয় তার কর কমিয়ে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সফল হতে পারত। কিন্তু সরকার সে পথে গেল না। ভ্যাট বাড়ার ফলে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে উসকে দেওয়া হলো। এটা কিন্তু সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। অন্তর্বর্তী সরকার এই ধরনের ঝুঁকি কেন নিল, তা আমাদের বোধগম্য নয়।

দেশ রূপান্তর : সামষ্টিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব কেমন হতে পারে?

ড. শামসুল আলম : এর প্রভাব ত্রিপাক্ষিক। প্রথমত ভোক্তাপক্ষ। এরপর সরকার মনে করছে, এই বৃদ্ধির ফলে রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যমাত্রার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তারপর ব্যবসায়ী পক্ষ। সাধারণভাবে মনে হতে পারে, পণ্য বিক্রি করে সরকার যেভাবে ভোক্তার কাছ থেকে তার মুনাফা অর্জন করে, সেটা অব্যাহত থাকবে। তারা ভেবেছেন ভ্যাট যতটুকু বেড়েছে, বর্ধিত ভ্যাট তুলে নিয়ে সেটা সরকারকে দেওয়া হবে। কিন্তু যে সমস্ত ভ্যাট ইনক্লুসিভ, সেই সমস্ত ভ্যাট কীভাবে পণ্যমূল্যকে প্রভাবিত করে, সেটা ভোক্তার পক্ষে জানা বা বোঝা সম্ভব নয়। এই ভ্যাট বৃদ্ধির ফলে অনেক ক্ষেত্রে সরকার প্রকৃত রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। বাড়তি অর্জিত অর্থ যে সরকারের ঘরেই যাবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

কর ফাঁকি, ভ্যাট ফাঁকির ফলে ভোক্তা যতটুকু দেবে, ততটুকুই যে সরকারের কোষাগারে যাবে তার নিশ্চয়তা নেই। এটা কিন্তু আশঙ্কার জায়গা। সরকার যতটুকু পাবে, ততটুকুই অর্জিত কি না, তা কীভাবে প্রকৃত ভ্যাট সংগ্রহ নির্ধারণ করবে? ব্যবসায়ীদের জন্য আশঙ্কার বিষয় যে, যখনই পণ্য বা সেবার মূল্য বেড়ে যায় তখনই চাহিদা কমে যায়। এর মানে হচ্ছে, ভোক্তা তার ব্যয় কমিয়ে দেয়। মানে পণ্য ক্রয় বা সেবা ক্রয় কমিয়ে সে তার ক্রয়ক্ষমতায় মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত মোকাবিলা করবে। এর ফলে পণ্য সরবরাহ কমে যাবে। পণ্য সরবরাহ কমার সঙ্গে সঙ্গে আয় কমে যাবে ব্যবসায়ীর। বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে উৎপাদনে ব্যাঘাত সৃষ্টি হবে। বিক্রি কম হবে। অর্থাৎ মুনাফা কমা বা লসে যাওয়ার মতো ঝুঁকি তৈরি হবে। পণ্য বিক্রি বা সেবার পরিমাণ কমে গেলে, ভ্যাট বৃদ্ধি করে সেই কাক্সিক্ষত লাভ থাকবে না।

কারণ তখন ভ্যাটের পরিমাণ কমে যাবে। ভ্যাট বৃদ্ধি করে যে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা স্থির করেছে সরকার, তা শেষ পর্যন্ত প্রকৃত সুফল না-ও আনতে পারে। এই আশঙ্কা কিন্তু রয়েছেই। এই অবস্থায় সরকার যদি মূল্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে মূল্যহ্রাস করতে পারত, পণ্য সরবরাহ চেইনের ব্যয় হ্রাস করতে পারত, তাহলে ভোগ্যপণ্য অনেক বেশি বিক্রি হতো। এর ফলে সরকারেরই লাভ হতো। কিন্তু সেদিকে না গিয়ে, ভোক্তার ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি করা হলো। ফলে পণ্য ক্রয়ে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তখন ভোক্তা পণ্য ক্রয় কমিয়ে দিয়ে এই ব্যয় বৃদ্ধি মোকাবিলা করার জন্য অগ্রসর হচ্ছে বা হবে।

দেশ রূপান্তর : এখানে কি আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থার চাপ কাজ করেছে?

ড. শামসুল আলম : যদি বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা এডিবির কথা বলা হয় তাহলে বলব, তারা হচ্ছে ব্যাংক। ব্যাংকের অর্থই হচ্ছে, ব্যবসার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করা। কার পণ্য কোন বাজার দখল করবে, কোন পণ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে, কোন দেশ তাদের কাছে গুরুত্ব পাবে সেটি পলিসিগত ব্যাপার। এটা সত্য, এসব করতে গিয়ে তারা বিভিন্ন দেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করে। রাষ্ট্রের পলিসি নিয়ন্ত্রণ করে। তবে এ বিষয়ে আমি জানি না। যদি থাকে, তাহলে সেটাকে মনে করি না, খুব গুরুত্বপূর্ণ। এমনিতেই ভোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে পণ্যমূল্যের অভিঘাতে নিপীড়িত হয়ে আসছে। তবে এই সরকারের কাছে মানুষ একটু স্বস্তি আশা করেছিল। তারা হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে চেয়েছিল। সেই ক্ষেত্রে অনেকটাই গণমানুুষের মধ্যে আচমকা বজ্রপাত হলো।

পূর্বের সরকার দফায় দফায় পণ্যমূল্য বাড়িয়েছে। জ্বালানিতে ভর্তুকি তুলে নিয়েছে। ঘাটতি পূরণের পরিবর্তে মূল্য বৃদ্ধি করেছে। বিদ্যুতের বাজার পরিণত হয়েছিল আমদানিনির্ভর। আমদানিকৃত পণ্যের দাম যদি অভ্যন্তরীণ বাজারের পণ্যের তুলনায় কম হয়, তাহলে সেখানে আমদানিকৃত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ হয়। চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে, দেশি পণ্য বাজার হারায়। সব বিদেশি শিল্পপণ্য যদি বাজার দখল করে, তাহলে কিন্তু সেটা উদ্বেগজনক।

দেশ রূপান্তর : সাধারণ মানুষ এই চক্র থেকে তাহলে কীভাবে মুক্তি পাবে?

ড. শামসুল আলম : এই যে আমরা কথা বলছি, চিন্তা করছি এটাই এক ধরনের নিষ্কৃতি। হয়তো আরও কথা হবে। কেউ না কেউ অব্যশই বলবেন। সরকারও তার নীতি জনবান্ধব করবে। এভাবেই তো নিষ্কৃতির পথ তৈরি হয়।

দেশ রূপান্তর : এ ব্যাপারে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কোনো কর্মসূচি নিয়েছে?

ড. শামসুল আলম : আমরা বিভিন্নভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছি। বড় আকারে বলতে, ওষুধের বিষয়ে একটি মামলার শুনানি চলছে হাইকোর্টে। ওষুধ আইনে মূল্যবৃদ্ধির যে ক্ষমতা, তা পরিবর্তন করে সরকার যে নিজেকে সুসংহত করেছে, তা বাতিলের জন্য আরেকটা মামলা করতে আমরা যাচ্ছি। এরপর কৃষিপণ্য, মাছখাদ্যসহ কিছু বিষয় হাইকোর্টে প্রসেসিংয়ে রয়েছে।

পাশাপাশি বিগত সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেসব দুর্নীতি হয়েছে, অলরেডি আমরা রেগুলেটরি কমিশনে সেই অভিযোগগুলো পেশ করেছি। এর সত্যতা প্রমাণে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে তা বিচার করার কথা আমরা বলেছি। যদি সুবিচার না পাওয়া যায়, তাহলে আমরা আদালতে যাব। এরই মধ্যে আমরা জেলা, উপজেলা পর্যায়ে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করছি। অচিরেই সেটা শেষ হবে। এরপর তা প্রধান উপদেষ্টার কাছে উপস্থাপন করব। এভাবেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা যে যে দাবিগুলো করছি, সেগুলো আলটিমেটলি গণদাবি হবে। বর্তমান সরকারের ওপর আমাদের যথেষ্ট আস্থা আছে। আমি বিশ্বাস করি, যে সমস্যা হতে পারে সে বিষয়ে সরকার যথেষ্ট সচেতন। কারণ এটা কোনো বেনিয়া সরকার নয়।

দেশ রূপান্তর : তাহলে কি সরকারের সঙ্গে ‘বার্গেনিং সেল’ হিসেবে আপনারাই কাজ করবেন?

ড. শামসুল আলম : এটা তো নির্ভর করছে জনগণের ওপর। যদি সেটাই মনে হয় যে, কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন ছাড়া আর কোনো সংস্থা বা রাজনৈতিক দল থেকে কেউ নেই কথা বলার, তাহলে তা দুর্ভাগ্যেও বিষয়। আমার মনে হয়, জনগণের দুর্ভোগের কথা বলার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো এগিয়ে আসবে। এখন তো আগের সরকারের পরিবেশ নেই। এখন প্রতিবাদের ভাষা কোনো ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করবে, এমন কোনো সম্ভাবনা নেই। বর্তমানে একেবারেই উন্মুক্ত, সুস্থ পরিবেশ রয়েছে।

দেশ রূপান্তর : নিম্নবিত্ত শ্রেণিকে মূল্যবৃদ্ধির চাপ থেকে মুক্ত করার উপায় কী?

ড. শামসুল আলম : আসলে যা করার তা মূলত ভোক্তা সাধারণকেই করতে হবে। আমাদের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৮-২০ লাখ মানুষ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। সাড়ে ৫ লাখের ওপরে ইনফরমাল, ননফরমাল লোক চাকরি করছে। এর বাইরে বিপুল সংখ্যক মানুষের কিন্তু এই ভোগ ব্যয় বা মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে জীবনযাত্রার কোনো সম্পর্ক নেই। একদিকে সরকার সম্পূরক কর এবং মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বাড়াচ্ছে, তাদের মহার্ঘ্য ভাতার প্রস্তাব করছে। মানুষ বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, রক্ত দিয়েছে, স্বৈরাচারকে তাড়িয়েছে। আন্দোলনে শহীদদের রক্ত এখনো শুকায়নি। তাহলে এ ধরনের অসমতা কেন তৈরি করা হচ্ছে, তা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। কেন সরকারকে এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে তা আমার কাছে পরিষ্কার নয়।

আপনার জানা থাকার কথা, ১৯৮২ সালে সেই সময়ের সরকার ব্যয় সংকোচনের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল। যা অল্প সময়ে মানুষকে স্বস্তি এনে দেয়। তখন কিন্তু সাময়িকভাবে সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কাটছাঁট করা হয়, সমস্ত বাজেট। বাজেট কার্টেল করে নেওয়া হয় বিভিন্ন কর্মসূচি। সেই কর্মসূচি কতটা সফল হয়েছিল, তা একটু খোঁজ করলেই জানা যাবে।

আসলে অসমতার বিষয়গুলো আমরা সামাজিকভাবে প্রতিরোধ করতে পারছি না। দুঃখজনক হচ্ছে, যে ছাত্র-জনতা রক্ত দিল, জীবন দিল তা আমরা ভুলে যাচ্ছি কেন? সেই বিষয়টি অনুসন্ধান করে সামনে নিয়ে আসতে হবে। জাতীয় ঐক্যবদ্ধ চেতনা প্রতিষ্ঠিত হলেই, সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আমরা পেয়েছি, সেটাকেই যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তাহলেই সমাজে অস্থিরতা তৈরি হবে না।

তারই ভিত্তিতে যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন কোনো সমস্যা হবে না। এই জাতীয় চেতনা যদি আমরা ভুলে না যাই, প্রতিষ্ঠিত করতে পারি তাহলেই সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের যে অঙ্গীকার, তা পূরণ হবে। তখন অন্য কিছুর দরকার নেই। ঐক্যের শক্তিতে শক্তিশালী হয়েই সমস্ত বৈষম্য দূর করা সম্ভব।

দেশ রূপান্তর : প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে দ্রব্যমূল্য সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর তা আর সম্ভব হয় না। উল্টো পণ্যমূল্য বেড়ে যায়। এর কারণ কী?

ড. শামসুল আলম : বড় কারণ হচ্ছে, ব্যবসায়। আলটিমেটলি রাজনৈতিক শক্তিতে শক্তিশালী হওয়া। রাজনৈতিক শক্তি যদি জনশক্তিতে শক্তিশালী হতো এবং জনস্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করত, তাহলে এই অবস্থা হতো না। সমস্ত উন্নয়ন কর্মকা- যদি প্রফেশনালদের মাধ্যমে হতো, তাদের কর্তৃত্বে বাস্তবায়ন করা হতো, তাহলে আজকের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। তাহলে ৫০০ টাকা খরচ হতো না, একটা বালিশ ওঠাতে।

বিভিন্ন অসংগতি লুণ্ঠনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে কাঠামোগতভাবে। এটা রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমেই হয়েছে। যে রাজনৈতিক শক্তি জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন করার কথা, ভাগ্য নির্মাণের শক্তি জনগণ যদি তৈরি করতে না পারে, তাহলে আজকের পরিণতি অব্যাহত থাকবে। একপর্যায়ে তা আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। আর যদি কাক্সিক্ষত রাজনীতি তৈরি করতে পারি, জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের রাজনীতি করতে পারি- তাহলে পরিস্থিতি পাল্টে যাবে।

দেশ রূপান্তর : সিপিডি বলছে, গত পাঁচ বছরে শুধু ভোগ্যপণ্যের মূল্য ৩১০ শতাংশ বেড়েছে। আরও বাড়তে পারে। উপায় কী?

ড. শামসুল আলম: এটা একদিকে অশনি সংকেত অন্যদিকে সতর্ক সংকেত। আমরা যতটুকু সতর্ক হতে পারব, প্রতিরোধ তত দুর্বার হবে। এই রকম পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য মূলত যারা দায়ী, আমরা তাদের আজও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারিনি। এসব অক্ষমতাগুলো যেন, আমাদের সক্ষমতার কাঠামোকে শক্তিশালী করে দেয়। যত দ্রুত আমরা এই সক্ষমতা অর্জন করব, যত সজাগ-সচেতন হব, আমাদের মুক্তি তত ত্বরান্বিত হবে। আমাদের নেতৃত্ব তত মজবুত হবে। নতুন নেতৃত্বের অভ্যুদয় হবে। রাজনৈতিক স্বার্থ এবং বিদ্বেষের বিষয়টি আমাদের বিপর্যয়ের মধ্যে নিয়ে গিয়েছিল বিগত সময়ে। এই সরকারের সময়ে সেই ধারাবাহিকতা তেমন নেই। তবু মাঝেমধ্যে স্মরণ করতে হচ্ছে। তবে এটা আমি কোনোভাবেই ভাবতে রাজি নই, এর মধ্যে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।

দেশ রূপান্তর : বছরের প্রথম দিকে মূল্যবৃদ্ধির এই ধাক্কার জন্য জনগণ কতটা প্রস্তুত ছিল?

ড. শামসুল আলম : পণ্যমূল্যের ওপর ভ্যাট ও শুল্ক বৃদ্ধি করার ফলে এটা যে এককভাবে শুধু ভোক্তাকে প্রভাবিত করবে তাই নয়। একটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি আরেকটি পণ্যকে মূল্যবৃদ্ধি করতে উসকে দেয়। অথবা একটি প্রেক্ষাপট তৈরি করে। আগেই বলেছি, মানুষ বাধ্য হয়ে ভোগ ব্যয় কমিয়ে দেবে। পণ্য ব্যবহার করা কমিয়ে দেবে। সেই যে, সরবরাহ কমবে। আয় কমবে। ব্যবসায়ীর আয় কমার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের ভ্যাট কমে যাবে। সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না। ব্যবসায়ীদের মুনাফার ওপর আঘাত আসবে। বিভিন্ন ধরনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এর ফলে ভ্যাট আহরণ প্রভাবিত হবে এবং ভোক্তার জীবনযাত্রার মান খর্ব হবে। বলতে গেলো ক্ষুন্ন হবে। ভোক্তা আলটিমেটলি পণ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হবে।

দেশ রূপান্তর : গ্যাস-বিদ্যুতের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। এটা মানুষের আয়ের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?

ড. শামসুল আলম : এই যে মূল্যবৃদ্ধি, তাতে আমি ধরে নিচ্ছি বিদ্যুতের বিল ৫০০ টাকার জায়গায় ৫৫০ হবে। ১০০০ টাকার বিল হবে ১৫০০। কিন্তু এই বিদ্যুৎ-গ্যাস ব্যবহার করে যে সমস্ত পণ্য উৎপাদন হচ্ছে, সেখানেও সবকিছুর উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। সেবার ক্ষেত্রেও তাই হবে। এর ফলে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা ভয়ংকর রকমের বাধাগ্রস্ত হবে।

দেশ রূপান্তর : এক্ষেত্রে আপনার কোনো প্রস্তাব রয়েছে?

ড. শামসুল আলম : আমি শুধু বলতে পারি, বিগত সরকার শুধু উন্নয়নে মত্ত ছিল। উন্নয়ন বলতে সে বোঝাতে চেয়েছিল যেভাবেই হোক, জিডিপি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে হবে। সেজন্য তারা বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নের কৌশল অবলম্বন করেছে। ব্যয় বাড়িয়েছে। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে গিয়ে বাজেটের আকার বাড়িয়েছে। ব্যয় বৃদ্ধি করেছে। ফলে ট্যাক্স বাড়িয়েছে। একটা চক্রের মধ্যে ফেলে দিয়ে মানুষের জীবনযাত্রাকে আটকে ফেলা হয়েছিল।

আমাদের কথা হচ্ছে, আমরা দরিদ্র জাতি। আমাদের মধ্যম আয়ের, উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হতে হবে, এই ধরনের উচ্চাভিলাষী হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। অবশ্য এই ধরনের কথা বলে, ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আর্থিকভাবে যথেষ্ট লাভবান হয়েছে। ফলে লুণ্ঠনের অর্থনীতির খাদে আমরা পড়ে গিয়েছিলাম। এখন এখান থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে। তাহলেই সমস্ত সমাধান হবে। বিগত সরকারের লুণ্ঠন করা টাকার পরিমাণ জানাতে হবে মানুষকে। তা উদ্ধারে তৎপর হতে হবে। মানুষকে আশ^স্ত করতে হবে। উন্নয়ন ব্যয় জিরোতে নিয়ে এসে, অন্তত আমরা যেন সুস্থমতো টিকে থাকতে পারি। মানুষ বাঁচুক।

দেশ রূপান্তর : দীর্ঘ সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

ড. শামসুল আলম : দেশ রূপান্তরকেও ধন্যবাদ। আপনারা ভালো থাকুন।

শ্রুতিলিখন : অরণ্য রহমান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত