আমন মৌসুমে কেন বাড়ছে চালের দাম

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২৫, ০১:৩০ এএম

চাল বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য। আউশ, আমন ও বোরো এই তিন মৌসুম মিলে দেশে বছরে ১ কোটি ১৬ লাখ হেক্টর জমি থেকে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ টনের মতো চাল উৎপাদিত হয়। মোট উৎপাদিত চালের শতকরা ৫৩ ভাগ আসে বোরো, ৪০ ভাগ আসে আমন এবং বাকি ৭ ভাগ চাল আসে আউস মৌসুম থেকে। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে আমন মৌসুমে প্রায় ১ কোটি ৫৪ থেকে ১ কোটি ৫৫ লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদিত হয়, যা দেশের টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতি রোধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।  আমন ধান উৎপাদনের সুবিধা হলো বোরোর মতো বেশি সেচের প্রয়োজন হয় না। সময়মতো বৃষ্টি না হলে দু-একটি সম্পূরক সেচই যথেষ্ট। এ ছাড়া আমন ধান কাটার পর বোরো ধান রোপণের মধ্যবর্তী সময়ে ওই জমিতে স্বল্পকালীন ফসল যেমন আলু, গম, ডাল, তেল, মসলা ও নানা রকম সুস্বাদু-পুষ্টিকর শীতকালীন শাকসবজি উৎপাদন করে কৃষক অতিরিক্ত অর্থ উপার্জন করতে পারেন। আমন মাড়াই মৌসুমে যেহেতু শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করে, তাই ধান কাটা ও মাড়াই নিয়ে কৃষককে কোনো দুশ্চিন্তা করতে হয় না। খরচ করতে হয় না কৃষিশ্রমিকের পেছনে অতিরিক্ত অর্থ। আমন ধানের খড় ঘর ছাওয়া ও গরু-মহিষের উৎকৃষ্ট খাদ্য। ফলে খড় বিক্রি করেও কৃষক অনেক অর্থ আয় করতে পারেন।

অন্যদিকে আমন চাষের বড় অসুবিধা হলো কখনো কখনো অতিবৃষ্টি ও বন্যায় ফসলহানি ঘটে। কৃষক আর্থিকভাবে ভীষণ ক্ষতির শিকার হন এবং সরকারকে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করে ঘাটতি পূরণ করতে হয়। এবার আমন উৎপাদন মৌসুমে দেশের কোনো কোনো এলাকায় কয়েকবার বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে ফসলটির ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়, উৎপাদন হ্রাস পায়। কারও কারও মতে, এই ক্ষতির পরিমাণ কম করে হলেও হবে আট লাখ থেকে সাড়ে আট লাখ মেট্রিক টন এবং ঘাটতি পূরণে কমপক্ষে ১০ লাখ টন চাল আমদানি করতে হবে। হঠাৎ প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমনের ক্ষতি না হলে নভেম্বর মাসে আমন ধান কাটা শুরু হলে সাধারণত চালের দাম কমতে থাকে। কিন্তু এবার ঘটেছে তার ঠিক উল্টো ঘটনা। আমনের ভরা মৌসুমে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে চালের দাম। দেশের গরির শ্রেণির মানুষেরা তাদের আয়ের সিংহভাগ অর্থ ব্যয় করেন চাল কেনার পেছনে। তাই চালের দাম বেশি হলে গরিব ও স্বল্প আয়ের মানুষের কষ্টের সীমা থাকে না। তাদের পক্ষে অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ, রোগের ওষুধ কেনার অর্থ জোগানোও সম্ভব হয় না। সম্ভব হয় না শীতের কাপড় কেনার মতো অত্যাবশ্যকীয় কাজ করা। চালের দামের ওপর দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, সরকারের স্থায়িত্ব, সুনাম এবং ব্যবসা-বাণিজ্য বহুলাংশে নির্ভর করে।

বর্তমানে ময়মনসিংহ নগরের বিভিন্ন খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মোটা স্বর্ণা ও গুটি স্বর্ণা চাল ৫৫ থেকে ৫৮, মাঝারি ব্রি-২৮ ও ব্রি- ২৯ ৬০ থেকে ৬৮ এবং চিকন (তথা কথিত) নাজিরশাইল, মিনিকেট ও কাটারিভোগ চাল ৮০ থেকে ৮৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ভাবতে অবাক লাগে মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজি চালের দাম মানভেদে বেড়েছে ৫ থেকে ১০ টাকা। আমনের এই ভরা মৌসুমে চালের মূল্য বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা দায়ী করছেন মিল মালিকদের আর মিল মালিকরা দায়ী করছেন ধানের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিকে। সরকার এ বছর প্রতি কেজি ধানের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করেছে ৩৩ টাকা, আতপ চালের দাম ৪৬ এবং সেদ্ধ চালের দাম ৪৭ টাকা। সে হিসেবে ৪০ কেজির এক মণ ধানের দাম দাঁড়ায় ১৩২০ টাকা। কিন্তু সারা দেশের হাট-বাজারগুলোতে বর্তমানে আমন ধান বিক্রি হচ্ছে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে। দেশের বিভিন্ন জেলার হাটবাজারে অনুসন্ধান করে দেখা যায়, মাঝারি ব্রি-৪৯ জাতের ধান প্রতি মণ ১ হাজার ৬০০, ব্রি- ৫১ ও ব্রি-৫২ জাতের ধান ১ হাজার ৫০০, ব্রি-২২ জাতের ধান ১ হাজার ৪০০ এবং মোটা হাইব্রিড হীরা ধান বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৩০০ টাকা মণ দরে। চালের রাজধানী খ্যাত নওগাঁ, দিনাজপুর ও কুষ্টিয়াতেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। মিলমালিকদের ধানের মূল্য বৃদ্ধির অজুহাত চালের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে কতটা অসংগতিপূর্ণ তা একটি সহজ হিসাব থেকেই বোঝা যায়। ৪০ কেজির এক মণ আমন ধান থেকে কমপক্ষে ২৯ কেজি চাল পাওয়া যায়। আরও পাওয়া যায় প্রায় ১০ কেজি তুষ ও খুদ, যার আনুমানিক মূল্য ১০০ টাকা। প্রতি মণ ধানের দামের সঙ্গে ধান ভাঙা, বস্তাভর্তি ও পরিবহন খরচ ৫০ টাকা যোগ করে এবং খুদ ও তুষের মূল্য ১০০ টাকা বাদ দিলে প্রতি কেজি চালের মিলগেটে উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৫৩ টাকা। মিল মালিক, পাইকারি ব্যবসায়ী ও খুচরা ব্যবসায়ীদের লাভ প্রতি কেজিতে ১ টাকা করে মোট ৩ টাকা যোগ করলেও প্রতি কেজি ব্রি-৪৯ চালের খুচরা মূল্য ৫৬ টাকার বেশি হওয়ার কোনো যুক্তি নেই। অথচ অতিলোভী মিল মালিক, মজুদদার ও অসৎ ব্যসায়ীদের কারসাজিতে সেই ৫৬ টাকা কেজির চাল বর্তমানে খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৬৮ টাকায়, যা কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত